অপুষ্টির অন্ধকার পেরিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে রোহিঙ্গা শিশু সুমি

একসময় অপুষ্টিতে দুর্বল হয়ে পড়েছিল পাঁচ বছরের রোহিঙ্গা শিশু সুমি। বয়স অনুযায়ী শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছিল, কমে গিয়েছিল স্বাভাবিক চঞ্চলতা। কিন্তু ধারাবাহিক পুষ্টি সহায়তা, চিকিৎসা ও পরিচর্যার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে বদলে গেছে তার জীবন। এখন সে হাসে, অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলা করে, ছুটে বেড়ায় চারপাশে। তার এই পরিবর্তন কেবল একটি শিশুর সুস্থ হয়ে ওঠার গল্প নয়, বরং সংকটের মধ্যেও যথাযথ সহায়তা পেলে শিশুদের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনার প্রতিচ্ছবি।
বিজ্ঞাপন
তবে সুমির সুস্থতার গল্পের পাশাপাশি রয়ে গেছে বড় এক বাস্তবতা। রোহিঙ্গা শিবিরে এখনো বহু শিশু অপুষ্টি, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। তাদের জন্য পর্যাপ্ত খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
অপুষ্টিতে থমকে গিয়েছিল স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা
পাঁচ বছর বয়সে যে শিশুর হাসি, খেলাধুলা ও শেখার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠার কথা, সেই সময়টাতেই অপুষ্টির কারণে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল সুমি। তার শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছিল, কমে গিয়েছিল শক্তি ও চঞ্চলতা। ফলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল তার সামগ্রিক বিকাশ নিয়ে।
বিজ্ঞাপন
শিশুদের দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টি শুধু শারীরিক বৃদ্ধিতেই প্রভাব ফেলে না, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, শেখার সক্ষমতা এবং মানসিক বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সুমির ক্ষেত্রে প্রয়োজন ছিল দ্রুত অপুষ্টি শনাক্ত করা, উপযুক্ত চিকিৎসা দেওয়া এবং নিয়মিত পুষ্টি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা।
মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া সুমির পরিবারকেও নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে জীবন কাটাতে হয়েছে। নিজস্ব বসতভিটা ও সম্পদ হারিয়ে শরণার্থী শিবিরে বসবাসের বাস্তবতায় পরিবারের পক্ষে শিশুর সব প্রয়োজন পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতি সুমির অপুষ্টির ঝুঁকিকে আরও জটিল করে তোলে।
ধারাবাহিক পরিচর্যায় ফিরতে শুরু করে প্রাণচাঞ্চল্য
বিজ্ঞাপন
সুমির অপুষ্টির বিষয়টি শনাক্ত হওয়ার পর প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনা হয় তাকে। ইউনিসেফসহ মানবিক সহায়তাকারী সংস্থাগুলোর পুষ্টি কার্যক্রমের মাধ্যমে তার সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া এগিয়ে চলে।
এই পরিবর্তন এক দিনে আসেনি। প্রয়োজন হয়েছে দীর্ঘ সময়ের পরিচর্যা, পুষ্টিকর খাবার, স্বাস্থ্যকর্মীদের পরামর্শ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের। পরিবারের অংশগ্রহণও ছিল এই যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা পরিচর্যার পর ধীরে ধীরে সুমির শারীরিক অবস্থার উন্নতি হতে থাকে। খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়ে, নড়াচড়া ও খেলাধুলার প্রবণতা ফিরে আসে। আশপাশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগও বাড়তে থাকে। একসময় যে শিশুকে দেখে উদ্বেগ তৈরি হতো, তার মুখেই এখন দেখা যাচ্ছে স্বস্তি ও আনন্দের ছাপ।
সুমির এই পরিবর্তন মনে করিয়ে দেয়, অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের সময়মতো শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পুষ্টি সহায়তা দেওয়া গেলে তাদের সুস্থতার পথ তৈরি করা সম্ভব।
বিজ্ঞাপন
রোহিঙ্গা শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে ইউনিসেফের উদ্যোগ
রোহিঙ্গা শিবিরে শিশুদের অপুষ্টি শনাক্তকরণ ও চিকিৎসায় ইউনিসেফসহ বিভিন্ন মানবিক সংস্থা কাজ করছে। কমিউনিটি পর্যায়ে শিশুদের পুষ্টির অবস্থা যাচাই করে ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের প্রয়োজন অনুযায়ী পুষ্টিকেন্দ্রে পাঠানো হয়। গুরুতর অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের বিশেষায়িত চিকিৎসা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হয়।
এ ক্ষেত্রে রেডি-টু-ইউজ থেরাপিউটিক ফুড (আরইউটিএফ)সহ বিশেষ পুষ্টি সহায়তা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১২ হাজার রোহিঙ্গা শিশু গুরুতর অপুষ্টির চিকিৎসা পেয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত কক্সবাজারে আরও ৬ হাজার ৬৮ শিশুকে গুরুতর তীব্র অপুষ্টির চিকিৎসা দেওয়া হয়। একই সময়ে ভাসানচরে চিকিৎসা পেয়েছে ২১৪ শিশু।
বিজ্ঞাপন
শিশুদের পাশাপাশি গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মা এবং পরিচর্যাকারীদের পুষ্টিবিষয়ক পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে। জন্মের পর প্রথম দুই বছরে বুকের দুধ ও বয়স অনুযায়ী পরিপূরক খাবারের গুরুত্ব সম্পর্কে পরিবারগুলোকে সচেতন করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ৬৭ হাজার ৫০৯ জন মা ও শিশুর পরিচর্যাকারী পুষ্টিবিষয়ক পরামর্শ পেয়েছেন। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো অপুষ্টি দ্রুত শনাক্ত করা, যথাসময়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং শিশুদের সুস্থ বৃদ্ধি ও বিকাশে সহায়তা করা।
সুস্থতার চিহ্ন শুধু ওজন নয়, ফিরে পাওয়া শৈশবও
বিজ্ঞাপন
একটি শিশুর সুস্থতা কেবল তার ওজন বা শারীরিক গঠনের মাধ্যমে বিচার করা যায় না। খেলাধুলার আগ্রহ, অন্য শিশুদের সঙ্গে মিশতে পারা, চারপাশের বিষয়ে কৌতূহল এবং স্বাভাবিক আচরণও তার সামগ্রিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ দিক।
সুমি যখন অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলতে যায়, তখন তার এই স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড সুস্থতার পথে অগ্রগতির একটি ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরে। তবে দীর্ঘমেয়াদে তার বিকাশ ঠিকভাবে হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পুষ্টি পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
এই পরিবর্তন কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে ধারাবাহিক পরিচর্যা, স্বাস্থ্যকর্মীদের সহায়তা, পরিবারের অংশগ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়ার সুযোগ।
বিজ্ঞাপন
শুধু খাবার নয়, প্রয়োজন নিরাপদ পরিবেশও
অপুষ্টির চিকিৎসা শুধু শিশুকে খাবার দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পর্যাপ্ত পুষ্টির পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ, নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থাও জরুরি।
কোনো শিশু চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হওয়ার পরও যদি পর্যাপ্ত খাবার না পায়, বারবার অসুস্থ হয় কিংবা অনিরাপদ পরিবেশে বসবাস করে, তাহলে আবার অপুষ্টিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণে সুমির সুস্থ হয়ে ওঠাকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখার পরিবর্তে তার স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞাপন
রোহিঙ্গা শিবিরে বাস্তুচ্যুতির কারণে অনেক পরিবারের জীবন-জীবিকার সুযোগ সীমিত। খাবার, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণেও তাদের মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে শিশুদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সেবা নিশ্চিত করা বিশেষভাবে প্রয়োজন।
শিক্ষা ও শিশুর নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ
অপুষ্টি থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার পর সুমির সামনে রয়েছে বেড়ে ওঠার আরও অনেক ধাপ। তার প্রয়োজন শিক্ষা, খেলাধুলা, সামাজিক যোগাযোগ এবং মানসিক বিকাশের সুযোগ। নিরাপদ পরিবেশে বড় হওয়ার অধিকারও তার ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞাপন
রোহিঙ্গা শিশুদের জীবনে বাস্তুচ্যুতি ও অনিশ্চয়তার প্রভাব শুধু শারীরিক স্বাস্থ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। শিক্ষার ঘাটতি, মানসিক চাপ এবং বিভিন্ন ধরনের সুরক্ষাঝুঁকিও তাদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
তাই পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি শিশুদের জন্য নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ, সৃজনশীল কর্মকাণ্ড এবং মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। একটি শিশুকে সংকট থেকে ফিরিয়ে আনার অর্থ শুধু তার শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করা নয়; বরং তার সামনে স্বাভাবিক শৈশব ও ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করা।
মানবিক সহায়তা থেকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথে
সুমির গল্পে মানবিক সহায়তার গুরুত্ব স্পষ্ট হলেও তার মতো শিশুদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে আরও বিস্তৃত উদ্যোগ প্রয়োজন। নিয়মিত পুষ্টি পরীক্ষা, দ্রুত চিকিৎসা, মা ও শিশুর জন্য পুষ্টিবিষয়ক পরামর্শ এবং পরিবারের প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি।
আরও পড়ুন
পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং শিশু সুরক্ষা কার্যক্রমকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ধারাবাহিকতাও গুরুত্বপূর্ণ, যাতে জরুরি সহায়তার পাশাপাশি শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজনগুলো বিবেচনায় নেওয়া যায়।
রোহিঙ্গা শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যেকোনো পরিকল্পনায় তাদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে তাদের পরিবার যেন শিশুদের প্রয়োজনীয় খাবার ও পরিচর্যা নিশ্চিত করতে পারে, সে জন্য বাস্তবসম্মত সহায়তার ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
সুমির হাসি এখন নতুন আশার প্রতীক
একসময় অপুষ্টিতে দুর্বল হয়ে পড়া সুমি আজ আবার হাসছে, খেলছে এবং অন্য শিশুদের সঙ্গে মিশছে। তার এই পরিবর্তন আশার বার্তা দেয়। তবে তার সুস্থতা ধরে রাখা এবং স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক পরিচর্যা প্রয়োজন।
সুমির মতো আরও যেসব শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসা ও পুষ্টি সহায়তা পৌঁছে দেওয়াই এখন গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশু যেন খাবারের অভাব, চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা কিংবা নিরাপত্তাহীনতার কারণে স্বাভাবিক শৈশব থেকে বঞ্চিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে পরিবার, মানবিক সহায়তাকারী সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সুমির গল্প তাই কেবল অসুস্থতা থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার কাহিনি নয়। এটি এমন এক ভবিষ্যতের প্রত্যাশা, যেখানে প্রতিটি শিশু পাবে পুষ্টিকর খাবার, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, শিক্ষার সুযোগ এবং নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার অধিকার। তার মুখের হাসি সেই সম্ভাবনার কথাই মনে করিয়ে দেয়।








