Logo

সড়কে থামছেই না মৃত্যুর মিছিল, বাস্তবায়ন হয়নি ১১১ সুপারিশ

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২২ অক্টোবর, ২০২৬, ১৭:২৫
সড়কে থামছেই না মৃত্যুর মিছিল, বাস্তবায়ন হয়নি ১১১ সুপারিশ
ছবি : জনবাণী গ্রাফিক্স

প্রতিদিন জীবিকার তাগিদে, জরুরি প্রয়োজনে কিংবা স্বজনদের কাছে ফিরতে সড়কে নামেন লাখো মানুষ। কিন্তু যাত্রা শেষে সবার ঘরে ফেরা হয় না। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান অনেকে, আবার কেউ কেউ গুরুতর আহত হয়ে বাকি জীবন কাটান পঙ্গুত্ব নিয়ে। বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা এই প্রাণহানির পেছনে রয়েছে নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা।

বিজ্ঞাপন

দেশে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম বাস, মিনিবাস, হিউম্যান হলার ও অটোরিকশা। এসব যানবাহনের অনেকগুলোরই বৈধ ফিটনেস সনদ নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি, অদক্ষ চালক ও ট্রাফিক আইন অমান্যের কারণে সড়কে যাত্রীদের নিরাপত্তা প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে পড়ছে। দুর্ঘটনায় কেউ প্রাণ হারাচ্ছেন, কেউবা গুরুতর আহত হয়ে স্থায়ী শারীরিক অক্ষমতার শিকার হচ্ছেন।

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০১৯ সালে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের মাধ্যমে সাতটি অগ্রাধিকার খাত নির্ধারণ করে ১১১টি সুপারিশ দেওয়া হয়েছিল। তবে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। সরকার বিদ্যমান আইন সংশোধন ও নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগের কথা বললেও মাঠপর্যায়ে কার্যকর প্রয়োগের ঘাটতি রয়ে গেছে।

প্রতি বছরের মতো এবারও আজ দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’। এ বছরের প্রতিপাদ্য—“নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ”। দিবসটি উপলক্ষে রাজধানী থেকে জেলা শহর পর্যন্ত বিভিন্ন সভা, সেমিনার ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজন করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি সড়কে প্রাণহানি কমানোর কার্যকর পদক্ষেপ কতটা নেওয়া হয়েছে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সড়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও প্রকৌশলীদের মতে, চালকদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, মহাসড়কে নিষিদ্ধ ধীরগতির যান চলাচল এবং সড়কের নকশাগত ত্রুটি দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এসব ঝুঁকি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবগত থাকলেও সমন্বিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়।

৯ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৪ হাজারের বেশি মানুষের

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ৪ হাজার ২৮৫টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪ হাজার ১৫৭ জন এবং আহত হয়েছেন ৫ হাজার ৩৯১ জন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১৫ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে সড়কে।

বিজ্ঞাপন

সাম্প্রতিক সময়ের ভয়াবহ দুর্ঘটনাগুলোর একটি ঘটে নাটোরের বড়াইগ্রামের বনপাড়ায়। গত মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সেখানে বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১২ জন নিহত হন। আহত হন অন্তত ২৫ জন।

পুলিশ ও আহত ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার শিকার আরপি স্পেশাল পরিবহনের বাসটি চালাচ্ছিলেন সুপারভাইজার সোহেল রানা। সে সময় বাসের মূল চালক ও সহকারী পেছনের আসনে ঘুমিয়ে ছিলেন।

দুর্ঘটনায় আহত চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাসিন্দা রমজান আলী জানান, রাত আনুমানিক ৩টার দিকে বাসটি পাবনার ঈশ্বরদীতে পৌঁছায়। সেখানে একটি হোটেলে বিরতির পর চালক নিজের আসন ছেড়ে গেলে সুপারভাইজার সোহেল বাস চালাতে শুরু করেন। প্রায় এক ঘণ্টা পর বনপাড়ায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ট্রাকের সঙ্গে বাসটির সংঘর্ষ হয়।

বিজ্ঞাপন

সড়ক নিরাপত্তায় আইনের পাশাপাশি প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

মেয়াদোত্তীর্ণ ও জরাজীর্ণ যানবাহন, বৈধ লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো এবং চালকদের শারীরিক সক্ষমতা যাচাইয়ের ঘাটতি দেশের সড়ক নিরাপত্তাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন পারিবারিক বিপর্যয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর প্রভাব জাতীয় অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও পড়ে।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ এবং সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২ রয়েছে। কিন্তু শুধু আইন প্রণয়ন করলেই সড়ক নিরাপদ হয় না। প্রয়োজন আইনের কার্যকর প্রয়োগ, ঝুঁকিভিত্তিক পরিকল্পনা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, সড়কের নকশা ও নির্মাণ, যানবাহনের নিরাপত্তা, গতি নিয়ন্ত্রণ, চালকের যোগ্যতা, মানসম্মত হেলমেট ও সিটবেল্টের ব্যবহার, পথচারীর নিরাপত্তা এবং দুর্ঘটনার পর জরুরি চিকিৎসা—সব ক্ষেত্রকে সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনতে হবে।

সাইফুন নেওয়াজের মতে, সড়ক দুর্ঘটনার কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে সংশ্লিষ্টরা জানেন। কিন্তু ধারাবাহিক ও সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে কার্যকর প্রতিরোধ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

১৩ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত সোয়া লাখের বেশি

বিজ্ঞাপন

সড়ক দুর্ঘটনার দীর্ঘমেয়াদি চিত্র তুলে ধরেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংস্থাটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৩ সাল থেকে ২০২৫ সালের শেষভাগ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক, আঞ্চলিক সড়ক ও সংযোগ সড়কে ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় অন্তত ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন।

সংস্থাটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, স্বাধীনতার আগে দেশের যাতায়াতব্যবস্থা মূলত নদীপথ ও রেলপথকেন্দ্রিক ছিল। সে সময় মোট যাত্রীর প্রায় ৮০ শতাংশ নৌ ও রেলপথে যাতায়াত করতেন। পরে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা ছাড়াই পরিবহনব্যবস্থা সড়কনির্ভর হয়ে পড়ে।

তার ভাষ্য, সড়ক খাতের প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা, বিআরটিএর দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কারণে খাতটিতে কাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

সাত বছরে সড়কে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ৮ হাজার শিশু

সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুদের প্রাণহানির চিত্রও উদ্বেগজনক। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়কে ৭ হাজার ৯৬৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু নিহত হয়েছে।

প্রতিবেদনটির তথ্য অনুযায়ী, নিহত শিশুদের মধ্যে ২ হাজার ৯৫৮ জন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে। পথচারী হিসেবে বাস, ট্রাক কিংবা কাভার্ডভ্যানের ধাক্কায় মারা গেছে ২ হাজার ৮১২ জন। এ ছাড়া পরিবারের সঙ্গে বাস বা অন্যান্য গণপরিবহনে যাতায়াতের সময় সংঘর্ষ ও যানবাহন খাদে পড়ে ২ হাজার ১৯৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, দুর্ঘটনার কারণ ও পরিণতি সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের জানা থাকলেও কার্যকর প্রতিকার নেই। গ্রামীণ সড়কে শিশুদের হতাহতের ঘটনা বেশি ঘটছে। এসব সড়কের পাশে বসতবাড়ি থাকলেও যানবাহন চলাচলে নিয়ম মানার প্রবণতা কম এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিও সীমিত।

আরও পড়ুন

তিনি বলেন, শিশুদের বড় একটি অংশ সড়ক ব্যবহারের নিয়ম জানে না। এ বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির ঘাটতি রয়েছে। এর ফলে শিশুরা প্রাণ হারাচ্ছে কিংবা পঙ্গুত্ব বরণ করছে, যা দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

নিবন্ধিত যানবাহন ৬৭ লাখের বেশি, অধিকাংশ মোটরসাইকেল

বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ৬৭ লাখ ২৪ হাজার ৬৪৭টি। এর মধ্যে মোটরসাইকেল রয়েছে ৪৯ লাখ ৯৭ হাজার ৯০টি, যা মোট নিবন্ধিত যানবাহনের বড় অংশ।

নিবন্ধিত প্রাইভেটকারের সংখ্যা ৪ লাখ ৩২ হাজার ১১৪টি। সিএনজি ও পেট্রোলচালিত থ্রি-হুইলার অটোরিকশা রয়েছে ৩ লাখ ২৯ হাজার ৩৮৯টি। পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত বাণিজ্যিক পিকআপ ১ লাখ ৭২ হাজার ৩৮৩টি এবং ছোট মাইক্রোবাস ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৮৮টি।

এ ছাড়া নিবন্ধিত জিপের সংখ্যা ১ লাখ ১৩ হাজার ৯১৪টি। বাস ও মিনিবাস মিলিয়ে রয়েছে ৮৭ হাজার ২৮৫টি। এর মধ্যে বড় বাসের সংখ্যা ৫৮ হাজার ৫৮৯টি এবং মিনিবাস ২৮ হাজার ৬৯৬টি।

ভারী পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত ট্রাক্টর মিলিয়ে নিবন্ধিত যান রয়েছে ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৭৬১টি। ট্যাক্সিক্যাব, অ্যাম্বুলেন্স, ডেলিভারি ভ্যান ও বিশেষায়িত ট্যাঙ্কারসহ অন্যান্য যানবাহনের সংখ্যা ২ লাখ ৩৮ হাজার ৯৮২টি।

নিবন্ধন ও ফিটনেস ছাড়াই চলছে বিপুলসংখ্যক যান

বুয়েটের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রতিদিন ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ২০ শতাংশের জন্য দায়ী ফিটনেসবিহীন মোটরযান।

অন্যদিকে, বিআরটিএর নিবন্ধিত যানবাহনের হিসাবের বাইরে সারা দেশে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ যানবাহন নিবন্ধন, রুট পারমিট কিংবা ফিটনেস সনদ ছাড়াই চলাচল করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকার নির্ধারিত অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পেরিয়ে যাওয়ার পরও অনেক বাস ও ট্রাক সড়কে চলছে। বাসের ক্ষেত্রে নির্ধারিত আয়ুষ্কাল সর্বোচ্চ ২০ বছর এবং পণ্যবাহী ট্রাকের ক্ষেত্রে ২৫ বছর। অথচ সারা দেশে ৭৫ হাজারের বেশি পুরোনো ও জরাজীর্ণ বাস-ট্রাক নিয়মিত যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করছে বলে দাবি করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

রাজধানী ঢাকা ও প্রধান শহরগুলোতে চলাচলকারী বাস-মিনিবাসের প্রায় ৭০ শতাংশের হালনাগাদ বৈধ ফিটনেস সনদ নেই বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ৬০ লাখের বেশি

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক, নসিমন, করিমন, ভটভটি ও চান্দের গাড়ির চলাচল নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এসব যানবাহনের অনেকগুলোর যথাযথ যান্ত্রিক নিরাপত্তা ও চালকের প্রশিক্ষণ নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। মহাসড়কে এসব যান চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৬০ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার ও অটোরিকশা চলাচল করছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, দেশে ৫০ লাখ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার বা অটোরিকশা রয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকাতেই রয়েছে ১০ থেকে ১২ লাখ।

পেশাদার চালকের ঘাটতি প্রায় ৩০ শতাংশ

বিআরটিএর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশে অনুমোদিত ড্রাইভিং লাইসেন্সধারীর সংখ্যা ৫৯ লাখ ৪৬ হাজার ৫২৩ জন। তাঁদের মধ্যে আনুমানিক ২৩ থেকে ২৫ লাখ পেশাদার বা বাণিজ্যিক যানবাহনের চালক। অপেশাদার চালকের সংখ্যা প্রায় ৩৪ থেকে ৩৬ লাখ।

নিবন্ধিত যানবাহনের তুলনায় বিশেষ করে ভারী ও মাঝারি বাণিজ্যিক যান চালানোর উপযোগী দক্ষ ও প্রশিক্ষিত পেশাদার চালকের ঘাটতি প্রায় ৩০ শতাংশ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া সার্ভিস প্রোভাইডার ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আইনি ও কারিগরি জটিলতায় বিআরটিএর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও প্রায় ১১ থেকে ১২ লাখ চালক দীর্ঘদিন ধরে স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স হাতে পাচ্ছেন না বলে দাবি করা হয়েছে। তাঁদের অনেকে সাময়িক ই-লাইসেন্স কিংবা কাগজের অনুমোদনপত্র নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে মাঠপর্যায়ে ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে নানা জটিলতা ও হয়রানির অভিযোগও রয়েছে।

সাম্প্রতিক দুই বছরের পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল বড় একটি ঝুঁকির উৎস হয়ে উঠেছে। মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৪০ শতাংশ মোটরসাইকেলকেন্দ্রিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তরুণ চালকদের অতিরিক্ত গতি, হেলমেট না পরা, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং ও বেপরোয়া চালানোর কারণে চালক এবং পথচারী—উভয়েই প্রাণ হারাচ্ছেন।

মোটরসাইকেলের পাশাপাশি দূরপাল্লার বাস, অতিরিক্ত পণ্যবোঝাই ট্রাক, কাভার্ডভ্যান এবং মহাসড়কে চলাচলকারী নিষিদ্ধ থ্রি-হুইলারও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

বিআরটিএ জানিয়েছে, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে গত নয় মাসে সারা দেশে অভিযান চালানো হয়েছে। বিআরটিএর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ট্রাফিক পুলিশের যৌথ উদ্যোগে ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানো, অবৈধ লাইসেন্স, উল্টোপথে চলাচল এবং অতিরিক্ত গতির অপরাধে ১ লাখ ১০ হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। এ ছাড়া বিপজ্জনক ও জরাজীর্ণ বেশ কিছু যানবাহন জব্দ করে ডাম্পিং গ্রাউন্ডে পাঠানো হয়েছে।

সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার ঘটনায় বেপরোয়া চালকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা, গ্রেপ্তার এবং কারাগারে পাঠানোর মতো ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। বারবার ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারী চালকদের লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করার পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

৭৩ শতাংশ চালকের দৃষ্টিশক্তিতে সমস্যা

পেশাদার চালকদের চোখের সমস্যা সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম উপেক্ষিত কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হলে চালকের পক্ষে দূরের সাইনবোর্ড, রাস্তার বাঁক কিংবা বিভাজক সঠিকভাবে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে রাতে গাড়ি চালানোর সময় এ ধরনের সমস্যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

আরও পড়ুন

ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেওয়া চালকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যকের চোখের সমস্যা পাওয়া গেছে। বিআরটিএ ও ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের যৌথ উদ্যোগে ২০২৩ সালের ১১ থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন বাস ও ট্রাক টার্মিনাল, বিআরটিএ প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং কুমিল্লায় এ কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮২৪ জন চালকের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। তাঁদের মধ্যে ৫৪১ জন চোখ পরীক্ষা করান। পরীক্ষায় প্রায় ৭৩ শতাংশ চালকের দৃষ্টিশক্তিজনিত সমস্যা পাওয়া যায় এবং তাঁদের চশমা ব্যবহারের প্রয়োজন ছিল। এ ছাড়া ৪ শতাংশ চালকের ছানি এবং ২৩ শতাংশের শুষ্ক চোখ ও অ্যালার্জিসহ অন্যান্য সমস্যা শনাক্ত হয়।

পরীক্ষায় আরও দেখা যায়, ৮২৪ জন চালকের মধ্যে ৪০০ জনের রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক সীমার ওপরে ছিল, যা প্রায় ৪৯ শতাংশ। পাশাপাশি ২৫৮ জন চালক উচ্চ রক্তচাপে ভুগছিলেন।

ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের রোড সেফটি প্রকল্পের সমন্বয়কারী শারমিন রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, পরীক্ষায় গণপরিবহনের চালকদের মধ্যে চোখের বিভিন্ন সমস্যা পাওয়া গেছে। তাঁদের অনেকে দূরের সাইনবোর্ড, রাস্তার বাঁক ও বিভাজক স্পষ্ট দেখতে পান না। কারও ছানি রয়েছে, আবার কেউ রাতে আলোর প্রতিফলনজনিত সমস্যায় ভোগেন।

তিনি বলেন, এসব সমস্যা থাকা সত্ত্বেও অনেক চালক চশমা ব্যবহার কিংবা চিকিৎসা ছাড়াই দূরপাল্লার বাস ও ভারী ট্রাক চালিয়ে যাচ্ছেন। চালকদের জন্য নিয়মিত বিনামূল্যে চোখ ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা আয়োজনের পাশাপাশি পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া ও নবায়নের সময় নিবন্ধিত চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞের সনদ বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেন তিনি।

২০৩০ সালের মধ্যে সড়কে মৃত্যু অর্ধেকে নামানোর লক্ষ্য

জাতিসংঘের সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক দ্বিতীয় দশক ২০২১-২০৩০-এর মূল লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আঘাতের সংখ্যা অন্তত ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সড়ক দুর্ঘটনাকে প্রতিরোধযোগ্য জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদেও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন ও সুরক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ৩.৬ অর্জনের অংশ হিসেবে ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ২৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের উদ্যোগে নিরাপদ গণপরিবহন ও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, নিরাপদ যানবাহন, উন্নত সড়ক অবকাঠামো, দায়িত্বশীল সড়ক ব্যবহার এবং দুর্ঘটনার পর জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, ‘সেইফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ ও আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা অনুসরণ করে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে একটি সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন চূড়ান্ত, অনুমোদন ও প্রণয়ন করা হবে। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আহতের সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমানোর অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

সাত অগ্রাধিকার খাতে ১১১ সুপারিশ, বাস্তবায়নে অগ্রগতি নেই

সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন প্রণয়ন কিংবা জাতীয় দিবস পালন করে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন সুপারিশ বাস্তবায়নে ধারাবাহিক উদ্যোগ, নিয়মিত তদারকি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি।

বুয়েটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, সড়কে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি অব্যাহত থাকলেও প্রতিকারমূলক পদক্ষেপে ধারাবাহিকতা নেই। দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন কিংবা বিশেষ দিবস উপলক্ষে সভা-সেমিনার হলেও পরে এসব উদ্যোগের বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি অনেক সময় আর গুরুত্ব পায় না।

২০১৯ সালে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের মাধ্যমে সাতটি অগ্রাধিকার খাত নির্ধারণ করে দেওয়া ১১১টি সুপারিশের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এসব বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা বাস্তবায়নে উচ্চপর্যায়ে দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। সরকার বিদ্যমান আইন সংশোধনের কথা বললেও মাঠপর্যায়ে তা কার্যকর করার গতি ধীর।

সড়ক নিরাপত্তার মৌলিক সমস্যাগুলো তুলে ধরে সাইফুন নেওয়াজ বলেন, “মহাসড়কে দ্বিমুখী গাড়ি চলাচলের সময় দুর্ঘটনা এড়াতে অন্তত প্রয়োজনীয় সড়ক বিভাজক বা আইল্যান্ড নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। পরিবহন শ্রমিকরা কোনো নির্দিষ্ট নিয়োগপত্র বা নির্ধারিত কর্মঘণ্টা থেকে আজও বঞ্চিত। নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা না থাকায় ঈদ বা পূজার মতো ছুটির মৌসুমে যাত্রীর চাপে চালকরা না ঘুমিয়ে একটানা গাড়ি চালান, যা দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আরও পড়ুন

“অনেক মালিক ছুটির সময়ে অতিরিক্ত মুনাফার আশায় সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই বাস নামান। এছাড়া মহাসড়কে চলার অনুপযোগী, ফিটনেসবিহীন ও অবৈধ যানবাহন দীর্ঘদিন ধরে চলাচল করছে। ক্ষতিপূরণ ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা দুর্ঘটনায় নিহতদের স্বজন বা পঙ্গুত্ব বরণ কারীরা উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না। পাশাপাশি সাধারণ চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তিতে দুর্ভোগ ও দীর্ঘ লাইন, সড়কে মামলা সংক্রান্ত হয়রানি এবং হেলমেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক শিথিলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।”

২০২৭ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ

সড়ক পরিবহন, রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার ইতোমধ্যে ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন ২০২৬’-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে।

প্রস্তাবিত আইনে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের বাধ্যতামূলক বিনামূল্যে জরুরি চিকিৎসা, উদ্ধার ও চিকিৎসায় সহায়তাকারীদের আইনি সুরক্ষা দিতে ‘গুড সামারিটান’ নীতি, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারীদের জন্য ডিমেরিট পয়েন্ট এবং বারবার অপরাধ করলে দ্বিগুণ জরিমানার বিধান রাখার প্রস্তাব রয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন আইন প্রণয়নের পাশাপাশি ২০১৯ সালে দেওয়া ১১১টি সুপারিশের বাস্তবায়ন, ফিটনেসবিহীন যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, চালকদের কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, প্রশিক্ষণ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করা এবং সড়ক অবকাঠামোর ঝুঁকি দূর করাই হবে নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার বড় পরীক্ষা।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD