Logo

ডিপিডিসি'র বিদ্যুতের খুঁটিতে ঝুলছে একের পর এক লাশ

profile picture
বশির হোসেন বাবু
৪ নভেম্বর, ২০২৬, ১৪:১০
ডিপিডিসি'র বিদ্যুতের খুঁটিতে  ঝুলছে একের পর এক লাশ
ছবি এআই।

রাজধানীর বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) বিদ্যুতের খুঁটি যেন একেকটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

একের পর এক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন বিদ্যুৎকর্মীরা। কখনো বিদ্যুতের লাইন চালু রেখে কাজ, কখনো শাটডাউন নিশ্চিত না করা, কখনো প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাব, আবার কখনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে কর্মরত শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পাঠানোর অভিযোগ সামনে আসছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব বিদ্যুৎ সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা, সেই প্রতিষ্ঠানের কাজ করতে গিয়েই যদি কর্মীদের প্রাণ দিতে হয়, তাহলে তাঁদের নিরাপত্তার দায়িত্ব কার?

সর্বশেষ রাজধানীর ডেমরায় নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ ও থ্রি-ফেজ প্রিপেইড মিটার স্থাপনের কাজ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ডিপিডিসির আউটসোর্সিং কর্মী মো. আনিছ (৩৫)। অভিযোগ রয়েছে, কাজটি করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেও ডেমরা ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসানুজ্জামান ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আব্দুল রউফের নির্দেশ এড়াতে পারেননি তিনি।

এমনকি মিটার স্থাপনের কাজে দক্ষ নন জানিয়ে তাঁকে ওই কাজ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার অনুরোধও করেছিলেন আনিছ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। আনিছের মৃত্যুর পর ঘটনাটি থানা-পুলিশকে অবহিত করা, নিহতের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করার বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টি ধামাচাপা দিতে সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ তৎপরতা চালাচ্ছে। থানা-পুলিশকে অবহিত না করেই তড়িঘড়ি করে লাশ দাফন সম্পর্ণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) হাবিবুন নাহারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন। শুধু এমডিই নন, সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট একাধিক প্রকৌশলীও গণমাধ্যমকর্মীদের এড়িয়ে চলছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে কর্মীদের নিরাপত্তা, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, একটি রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের জীবন রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কেন স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হচ্ছে না?

ডিপিডিসির বিভিন্ন সময়ের দুর্ঘটনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য পর্যালোচনায় একাধিক মৃত্যুর ঘটনা সামনে এসেছে। ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে ডিপিডিসির পাওয়ার স্টেশনে কাজ করতে গিয়ে ইন্দোনেশীয় প্রকৌশলী তৌফিকের মৃত্যু হয়। ২০২২ সালে ডেমরার সারুলিয়ায় বিদ্যুৎ লাইনের কাজ করতে গিয়ে মারা যান ডিপিডিসির লাইনম্যান মো. ইকবাল শাহিন। এরপর ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর রাজধানীর মানিকনগরে ডিপিডিসির ১১ কেভি ওয়াসা বহির্গামী ফিডারের সংস্কারকাজ চলাকালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারান ফোরম্যান মো. নবীর হোসেন। এ ঘটনায় মাসুম মিয়া ও রবিউল ইসলাম নামে আরও দুই শ্রমিক গুরুতর আহত হন। ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের শিমুলপাড়া বিহারী ক্যাম্প এলাকার সোনা মিয়া মার্কেটের সামনে সঞ্চালন লাইনে কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান ডিপিডিসির বার্ষিক ঠিকাদারি শ্রমিক মো. নজরুল ইসলাম (৫৫)। এ ঘটনায় আরও দুই শ্রমিক আহত হন বলে জানা গেছে।

সর্বশেষ ২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর ডেমরায় থ্রি-ফেজ প্রিপেইড মিটার স্থাপনের সময় প্রাণ হারান আউটসোর্সিং কর্মী আনিছ। এসব পৃথক ঘটনায় ২০১৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত অন্তত পাঁচটি মৃত্যুর ঘটনা সামনে এসেছে। তবে এটিই ডিপিডিসির মোট মৃত্যুর সংখ্যা নয়। এর বাইরে আরও দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর অভিযোগ থাকলেও স্বীকার করছেন না প্রকৌশলীরা।

বিজ্ঞাপন

২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর মানিকনগরে ডিপিডিসির ১১ কেভি ওয়াসা বহির্গামী ফিডারের সংস্কারকাজ চলাকালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান ফোরম্যান নবীর হোসেন। আহত হন মাসুম মিয়া ও রবিউল ইসলাম। ঘটনার পর তৎকালীন বিদ্যুৎ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান হাসপাতালে আহত শ্রমিকদের দেখতে যান।

তিনি ঘটনাটিকে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে না দেখে দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে ডিপিডিসি ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই বলেও উল্লেখ করা হয়। এ ঘটনার পর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার খবর প্রকাশিত হলেও নিরাপত্তাব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি কী পরিবর্তন এসেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বিশেষজ্ঞদের। কর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, শাটডাউন নিশ্চিতকরণ, ভোল্টেজ পরীক্ষা, আর্থিং এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহ কতটা নিশ্চিত হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানিকনগরের ঘটনার পরও যদি একই ধরনের অভিযোগে ডেমরায় আনিছের মৃত্যু ঘটে, তাহলে আগের তদন্তের সুপারিশ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

বিজ্ঞাপন

ডেমরার মেন্দিপুর থুলথুলিয়া এলাকায় নতুন সংযোগের কাজে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন আনিছ। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সংশ্লিষ্ট উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আব্দুল রউফকে জানিয়েছিলেন, মিটার স্থাপনের কাজে তিনি দক্ষ নন। এমনকি তাঁকে দিয়ে যেন এই কাজ না করানো হয়, সে অনুরোধও করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে থ্রি-ফেজ প্রিপেইড মিটার স্থাপনের কাজে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিকদের দাবি, কাজ শুরুর আগে নিয়ম অনুযায়ী শাটডাউন নেওয়ার কথা থাকলেও কাজ চলাকালে বিদ্যুৎ লাইন চালু ছিল। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই তাঁকে কাজে পাঠানো হয়েছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ জান্নাতুর রহমান বলেন, এখন তদন্তের মূল প্রশ্ন কাজটি করার অনুমতি কে দিয়েছিলেন? ফিডার বন্ধ করার দায়িত্ব কার ছিল? শাটডাউন নিশ্চিত না করেই কেন কর্মীকে বিদ্যুতের লাইনে পাঠানো হলো? আনিছের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছিল কি না? এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত দায় নির্ধারণ সম্ভব নয়। তিনি আরো বলেন, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে শুধু এক ডিভিশন থেকে অন্য ডিভিশনে বদলি করাই কি যথেষ্ট ব্যবস্থা? একজন শ্রমিকের মৃত্যুর পর প্রকৃত দায় নির্ধারণ এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব কার?

শুধু আনিছের ঘটনাই নয়, ডেমরার উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আব্দুর রউফের বিরুদ্ধে আরও একটি পুরোনো মৃত্যুর অভিযোগ সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মাতুয়াইল ডিভিশনে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর নির্দেশে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক কালামকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পাঠানো হয়েছিল এবং ওই কাজ করতে গিয়ে কালামের মৃত্যু হয়।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ঘটনার পর দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে শুধু বদলি করেই বিষয়টি শেষ করা হয়েছে। এমনকি তদন্ত প্রতিবেদনে প্রকৃত দায় এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

ডিপিডিসির বিভিন্ন দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠনের খবর পাওয়া গেলেও সব ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন, সুপারিশ এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়নি। ফলে প্রতিটি মৃত্যুর পর একই প্রশ্ন সামনে আসছেÑতদন্তের ফলাফল কোথায়, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না দিয়ে শুধুই বদলি।

এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শের আলী বলেন, ‘আমি ঘটনা শুনেছি। তবে পুরোপুরি জানি না। আপনি নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলেন। এ বিষয়ে আমি কিছু বলব না।’

বিজ্ঞাপন

ডিপিডিসির নারায়ণগঞ্জ জোনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘আমি ঘটনা শুনেছি। তবে যেহেতু তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, তাই এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির প্রধান কথা বলবেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলেন।’

এ বিষয়ে ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক (আইসিটি অ্যান্ড প্রকিউরমেন্ট) ও নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন)-এর অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মো. রবিউল হাসান বলেন, ‘আমি ঘটনাটি সম্পর্কে জানি না। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখছি। সংশ্লিষ্ট কারও দায়িত্বহীনতার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ ব্যাপারে ডিপিডিসির এমডির হাবিবুন নাহারের মুঠো ফোনে কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD