গোল্লায় বাপেক্সের প্রতিশ্রুতি, রিগ টেন্ডারে জালিয়াতি

দেশের অন্যতম স্বায়ত্তশাসিত তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড(বাপেক্স)। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করত প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু রিগ সরবরাহ ঘিরে হঠাৎ করেই শুরু হয় নানা প্রশ্ন। প্রকল্পটির দরপত্র আহ্বানের পর কাগজে-কলমে সবকিছুই ছিল নিয়মমাফিক।
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, দরপত্র সংগ্রহ, কারিগরি মূল্যায়ন সব ধাপই সম্পন্ন হয়েছিল নিয়ম অনুযায়ী। কিন্তু আড়ালে জমতে থাকে কিছু অস্বাভাবিক তথ্য। দরপত্রের নথি সংগ্রহ করেছিল ৩৭টি প্রতিষ্ঠান। অথচ শেষ পর্যন্ত অংশ নেয় মাত্র দুইটি। এর মধ্যে প্রকল্প পরিচালক ও চেয়ারম্যানের পছন্দের একটি প্রতিষ্ঠান অস্বাভাবিক কম সময়ে কাজ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। তাদের দাবি ছিল, মাত্র ১৩ মাসে তারা পুরো প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। প্রশ্ন ওঠে, একই ধরনের প্রকল্প যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে সাধারণত ১৮ থেকে ২৪ মাস সময় নেয়, সেখানে একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে অর্ধেক সময়ে কাজ শেষ করার নিশ্চয়তা দিচ্ছে?
অনুসন্ধানে উঠে আসে, প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ একটি যন্ত্রাংশ সরবরাহ করবে বিদেশি একটি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রস্তুতকারকের নথিতে যে সময়সীমার কথা উল্লেখ ছিল, তার সঙ্গে দরদাতার দেওয়া সময়ের বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়।
সূত্র বলছে, বাপেক্সের প্রায় হাজার কোটি টাকার ২০০০ অশ্বশক্তির এসি-এসি ভিএফডি স্থলভিত্তিক খনন রিগ ক্রয়কে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। মাত্র ১৩ মাসে পূর্ণাঙ্গ রিগ সরবরাহের প্রতিশ্রুতি, টেন্ডার মূল্যায়নের স্বচ্ছতা এবং মূল প্রস্তুতকারকের প্রকৃত সরবরাহ সক্ষমতা যাচাইয়ের বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
এদিকে একটি প্রতিষ্ঠানের পাঠানো আইনি নোটিশে অভিযোগ করা হয়েছে, মূল প্রস্তুতকারকের সক্ষমতা স্বাধীনভাবে যাচাই না করেই দরপত্র মূল্যায়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এ অভিযোগের বিষয়ে বাপেক্স মহাব্যবস্থাপক ও কোম্পানি সচিব মো. মঞ্জুরুল হক দাবি করেছে, রিগ ক্রয় প্রকল্প একটি প্রকৌশল, সংগ্রহ ও নির্মাণভিত্তিক প্রকল্প নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ দায়িত্বভিত্তিক প্রকল্প।
সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ রিগ কোনো একক কারখানায় তৈরি সাধারণ যন্ত্র নয়। রিগটির অন্যতম প্রধান উপাদান যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাটারপিলারের জেনারেটর প্যাকেজ। শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র থেকে যন্ত্রাংশ সংগ্রহ, এরপর চীনে প্রকৌশল সমন্বয়, সংযোজন, একীভূতকরণ, পরীক্ষণ, চালুকরণ ও পরিদর্শনের কাজ সম্পন্ন করে পরে সমুদ্রপথে বাংলাদেশে পরিবহন এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে উল্লেখযোগ্য সময়ের প্রয়োজন হয়।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, এতগুলো ধাপ অতিক্রম করে মাত্র ১৩ মাসে পূর্ণাঙ্গ রিগ সরবরাহের ঘোষণা কতটা বাস্তবসম্মত। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ প্রশ্নের উত্তর অনুমান বা দরদাতার ঘোষণার ওপর নির্ভর না করে মূল প্রস্তুতকারকের আনুষ্ঠানিক তথ্যের ভিত্তিতে যাচাই করা উচিত। গতকাল রোববার জ্বালানি বিভাগ, বাপেক্স এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো একটি আইনি নোটিশে দাবি করা হয়েছে, ১৩ মাসের সরবরাহ সময় ঘোষণা করা দরদাতাদের তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাটারপিলারের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে যাচাই করতে হবে। নোটিশে আরও বলা হয়েছে, যদি ঘোষিত সময়সূচি মূল প্রস্তুতকারকের প্রকৃত উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে সরকারি ক্রয় আইন, ২০০৬ এবং সরকারি ক্রয় বিধিমালা, ২০০৮ অনুযায়ী বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
বিজ্ঞাপন
নোটিশে দাবি করা হয়েছে, ক্যাটারপিলারের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণের পর নোটিশদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে যে, নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ বাস্তবসম্মত নয়। এ কারণেই তারা শেষ পর্যন্ত দরপত্রে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে।
টেন্ডার-সংক্রান্ত পরিসংখ্যানও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বাপেক্স সূত্রে জানা গেছে, এ দরপত্রের নথি সংগ্রহ করেছিল ৩৭টি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দরপত্র জমা দেয় মাত্র ৫টি প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে কারিগরি মূল্যায়ন শেষে প্রতিযোগিতায় রয়েছে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান। আইনি নোটিশে দাবি করা হয়েছে, মূল প্রস্তুতকারকের প্রকৃত সরবরাহ সক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ঘোষিত সময়সীমার বাস্তবতা নিয়ে সংশয়ের কারণেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রতিষ্ঠান শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি ক্রয়ে সমান প্রতিযোগিতার নীতি তখনই কার্যকর থাকে, যখন সব দরদাতা একই বাস্তবতার ভিত্তিতে মূল্যায়িত হন। কোনো দরদাতা যদি অস্বাভাবিকভাবে কম সময়সীমা ঘোষণা করে মূল্যায়নে অতিরিক্ত সুবিধা অর্জন করে, কিন্তু পরে নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ করতে না পেরে সময় বাড়ানোর আবেদন করে, তাহলে শুরু থেকেই বাস্তবসম্মত সময় উল্লেখ করা অন্য দরদাতাদের প্রতি ন্যায্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কি মূল প্রস্তুতকারকের কাছ থেকে স্বাধীনভাবে তথ্য যাচাই করা হবে, নাকি দরদাতাদের ঘোষিত তথ্যকেই চূড়ান্ত ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হবে? কারণ এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি রিগ ক্রয়ের ফল নির্ধারণ করবে না; ভবিষ্যতে সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, সমান প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহির মানদন্ড নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠতে পারে।
একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ বলেন, “সরকারি প্রকল্পে কম সময়ের প্রতিশ্রুতি সবসময় দক্ষতার প্রমাণ নয়। কখনো কখনো এটি মূল্যায়নে সুবিধা পাওয়ার কৌশলও হতে পারে। তাই প্রতিশ্রুতির পেছনে বাস্তব সক্ষমতার প্রমাণ থাকা জরুরি।”
এ বিষয়ে জ্বালানি সচিব ও বাপেক্সের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম এর মুঠো ফোনে কল দিলে তিনি রিসিভ করেনি। এমনকি খুদেবার্তা পাঠিয়ে উত্তর মেলেনি।








