স্বপ্নের কাজে মানব পাচারের নির্মম ফাঁদে হাজারো বাংলাদেশি

বিদেশে ভালো চাকরি, বেশি আয় এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির স্বপ্নে প্রতি বছর হাজারো বাংলাদেশি দেশ ছাড়ছেন। প্রয়োজনীয় পাসপোর্ট, ভিসা, বিএমইটির স্মার্টকার্ড এবং নিয়োগপত্র নিয়ে বৈধভাবেই তারা বিমানে ওঠেন। কিন্তু গন্তব্য দেশে পৌঁছানোর পর অনেকের জীবন পরিণত হয় ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে।
বিজ্ঞাপন
প্রতিশ্রুত কর্মস্থলে নেওয়া হয় না, পাসপোর্ট জব্দ করা হয়, দিনের পর দিন না খেয়ে থাকতে হয়, জোর করে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করানো হয়, অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। কেউ কেউ মানব পাচারকারীদের হাতে এক দেশ থেকে আরেক দেশে বিক্রি হয়ে যান। অনেকে দেশে ফেরেন লাশ হয়ে, আবার কেউ ফিরে আসেন মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙে পড়া অবস্থায়।
এই ভয়াবহ বাস্তবতার মধ্যেই বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবস। জাতিসংঘ ২০১৩ সালে ৩০ জুলাইকে এই দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দি’, যা বর্তমান সময়ে মানব পাচারের নতুন কৌশল ও বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
স্বপ্নের ইতালি নয়, পৌঁছাতে হলো মাফিয়াদের আস্তানায়
বিজ্ঞাপন
নারায়ণগঞ্জের তরুণ ইমরান হোসেন উন্নত জীবনের আশায় ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। পরিবারের সঞ্চয়, জমিজমা এবং ধারদেনার টাকা তুলে দেন দালালের হাতে। কিন্তু ইতালির পরিবর্তে তাকে কুয়েত হয়ে মিশর, পরে লিবিয়ায় নিয়ে গিয়ে মানব পাচারচক্রের মাধ্যমে মাফিয়াদের কাছে বিক্রি করা হয়।
দীর্ঘদিন বন্দি থাকার পর পরিবারের সদস্যরা প্রায় ২২ লাখ টাকা দিয়ে তাকে মুক্ত করেন। কিন্তু সেখানেও শেষ হয়নি দুর্ভোগ। পরে স্থানীয় পুলিশের হাতে আটক হয়ে কয়েক মাস কারাভোগের পর দেশে ফিরতে সক্ষম হন।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন মাসুম মোল্লাসহ আরও অনেক বাংলাদেশি। কারও মুক্তিপণে গুনতে হয়েছে ৪০ লাখ টাকা, কেউ বছরের পর বছর বিদেশে জিম্মি থেকেছেন।
বিজ্ঞাপন
চাকরির নামে সাইবার দাসত্বের নতুন ফাঁদ
মানব পাচারের ধরনও বদলেছে। এখন শুধু নির্মাণশ্রমিক বা শ্রমবাজার নয়, বিদেশে অফিস, কল সেন্টার কিংবা কম্পিউটার অপারেটরের চাকরির লোভ দেখিয়েও মানুষকে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে।
ব্র্যাকের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, বিদেশে নেওয়া ব্যক্তিদের ৯৮ শতাংশ প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি। বরং তাদের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশকে বিভিন্ন ধরনের অনলাইন প্রতারণা বা সাইবার স্ক্যামে জোরপূর্বক যুক্ত করা হয়েছে। যারা অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, তাদের ওপর চালানো হয়েছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
বিজ্ঞাপন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভুয়া ওয়েবসাইট, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম ও ফেসবুক ব্যবহার করে এসব চাকরির প্রলোভন ছড়ানো হচ্ছে। বিদেশে পৌঁছানোর পর ভুক্তভোগীদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে তথাকথিত "স্ক্যাম সেন্টার"-এ আটকে রেখে অনলাইন প্রতারণার কাজে বাধ্য করা হয়।
কম্বোডিয়ায় গিয়ে প্রতারণার শিকার হাজারো বাংলাদেশি
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে প্রায় ১৫ হাজার ৯২১ জন বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে কম্বোডিয়ায় গেছেন। কিন্তু তাদের বড় অংশই প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি।
বিজ্ঞাপন
সাম্প্রতিক অভিযানে কম্বোডিয়া থেকে ৫৮৩ জন বাংলাদেশি দেশে ফেরেন। তাদের প্রায় সবাই জানিয়েছেন, চাকরির নামে নিয়ে গিয়ে প্রতারণার কাজে বাধ্য করা হয়েছিল। অধিকাংশের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়, চলাচলের স্বাধীনতা ছিল না এবং অনেকেই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
ইউরোপগামী সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে বাংলাদেশিরা
ইউরোপের সীমান্তরক্ষী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টাকারীদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই শীর্ষে রয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। সাগরপথে যাত্রাকালে অনেকের মৃত্যু হয়েছে, আবার অনেককে পাচারকারীরা জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করেছে।
শুধু চলতি বছরের মার্চেই লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। নৌকায় খাদ্য ও পানির সংকটে কয়েকদিন ভেসে থাকার পর একে একে প্রাণ হারান তারা।
ব্র্যাকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি এই পথ ব্যবহার করে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। আর ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ইতালিতে গেছেন ৪ হাজারের বেশি এবং গ্রিসে পৌঁছেছেন আরও ৩ হাজার ৬০০-এর বেশি বাংলাদেশি।
বিজ্ঞাপন
রাশিয়ায় চাকরির প্রলোভনে যুদ্ধক্ষেত্রে
মানব পাচারের আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো, চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশিদের রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে পাঠানোর অভিযোগ।
নিরাপত্তারক্ষী, নির্মাণশ্রমিক, ওয়েল্ডার কিংবা পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরির কথা বলে অনেকের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়া হয়। পরে রাশিয়ায় পৌঁছে ভাষা না বুঝেই বিভিন্ন নথিতে স্বাক্ষর করিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর যৌথ অনুসন্ধানেও এমন তথ্য উঠে এসেছে। জানা গেছে, এই যুদ্ধে ইতোমধ্যে প্রায় অর্ধশত বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে।
নারী পাচারের নতুন কৌশল
বিদেশে গৃহকর্মী, পোশাক কারখানা কিংবা বিউটি পার্লারে চাকরির লোভ দেখিয়ে বহু নারীকে বিভিন্ন দেশে পাচার করা হচ্ছে। পরে তাদের জোরপূর্বক যৌন শোষণ, নির্যাতন এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
অনেক নারী মাসের পর মাস কোনো বেতন ছাড়াই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কেউ দেশে ফিরেছেন অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায়, আবার অনেকেই দীর্ঘ সময় বন্দি জীবন কাটিয়ে ফিরে এসেছেন।
রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশিদের সাগরপথে পাচার অব্যাহত
কক্সবাজার ও টেকনাফ উপকূল দিয়েও মানব পাচারের ঘটনা থামছে না। চাকরি কিংবা বিয়ের প্রলোভনে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানো হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
গত কয়েক বছরে উপকূলীয় এলাকা থেকে হাজারো মানুষকে উদ্ধার করা হলেও পাচারচক্র সক্রিয় রয়েছে। অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় এবং পরে পাচারের মতো ঘটনাও নিয়মিত ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিচার প্রক্রিয়ায় ধীরগতি
মানব পাচার ঠেকাতে আইন থাকলেও বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত মানব পাচারসংক্রান্ত ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় দুই হাজার মামলা তদন্তাধীন এবং তিন হাজারের বেশি মামলা বিচারাধীন।
চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে নতুন শতাধিক মামলা হলেও নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৭টি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযুক্তরা শাস্তির আওতায় আসছেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর মানব পাচার এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও সংঘবদ্ধ। পাচারকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রতারণার জাল বিস্তার করছে। অন্যদিকে, আইনের প্রয়োগ, নজরদারি এবং বিচারিক কার্যক্রম যথেষ্ট কার্যকর না হওয়ায় পাচারচক্র আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
তাদের মতে, বৈধ বিদেশগমন নিশ্চিত করা, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কঠোর তদারকি, দালালচক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা এবং মানব পাচার মামলার কার্যকর বিচার নিশ্চিত করা না গেলে উন্নত জীবনের স্বপ্নে দেশ ছাড়তে গিয়ে আরও অসংখ্য মানুষ ভয়াবহ এই অপরাধচক্রের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।








