Logo

রক্তঝরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ে বাংলাদেশ

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ আগস্ট, ২০২৬, ১১:১৫
রক্তঝরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ে বাংলাদেশ
ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক স্মরণীয় ও আলোচিত দিন হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। ওই দিন দুপুরের পর রাজধানীজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে নেই। অল্প সময়ের মধ্যেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারো মানুষ গণভবন ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনার দিকে অগ্রসর হতে শুরু করেন। কোথাও বিজয়ের উচ্ছ্বাস, কোথাও অনিশ্চয়তা, আবার কোথাও সংঘর্ষের আশঙ্কায় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

বিজ্ঞাপন

পরে সেনাপ্রধানের জাতির উদ্দেশে ভাষণ এবং ইন্টারনেট সংযোগ পুনরায় চালু হওয়ার পর দেশের মানুষ নিশ্চিত হতে শুরু করে যে, টানা প্রায় সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটেছে। একই সঙ্গে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। অনেকের মতে, এর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।

যদিও এই পরিবর্তন হঠাৎ করে ঘটেনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিতর্ক, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব এবং প্রশাসনের প্রতি আস্থাহীনতা—এসব বিষয় দীর্ঘ সময় ধরে জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সেই জমে থাকা অসন্তোষের বিস্ফোরণের ক্ষেত্র তৈরি করে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গণআন্দোলনের সাক্ষী হলেও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল এর সূচনা শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে। শুরুতে এটি কোটা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনে শিক্ষক, অভিভাবক, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে আন্দোলনের মূল দাবি রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও সরকারের পদত্যাগের দাবিতে রূপ নেয়।

বিজ্ঞাপন

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরীর মতে, এই আন্দোলন ছিল জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা একটি অর্গানিক গণআন্দোলন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের প্রকৃত চরিত্র যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর টানা চার মেয়াদ রাষ্ট্র পরিচালনা করে। এ সময়ে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে দেশ-বিদেশে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়। একই সময়ে বিরোধী দলগুলো রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ তোলে।

২০২৪ সালের জুনে সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালসংক্রান্ত উচ্চ আদালতের একটি রায় প্রকাশের পর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। তারা মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত এবং বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি জানান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, জগন্নাথসহ প্রায় সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

বিজ্ঞাপন

শুরুর দিকে আন্দোলনের কর্মসূচি ছিল বিক্ষোভ, অবস্থান, সড়ক অবরোধ এবং ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন। তবে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা, সংঘর্ষ এবং প্রাণহানির ঘটনার পর পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে। সাধারণ মানুষও শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করতে শুরু করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আহত ও নিহতদের ছবি এবং ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে জনমনে ক্ষোভ আরও বাড়ে।

১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আন্দোলনে নতুন গতি আসে। সেই রাতেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল থেকে শিক্ষার্থীরা মিছিল বের করেন। পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, তাদের ওপর হামলা চালানো হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যকর ভূমিকা নেয়নি।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার দেশব্যাপী কারফিউ জারি করে এবং মোবাইল ইন্টারনেট ও পরে ব্রডব্যান্ড সংযোগও বন্ধ করে দেয়। সরকার এসব পদক্ষেপকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে আন্দোলন দমন করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও আন্দোলনের গতি থেমে থাকেনি।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ সহিংসতা পরিহার, সংযম প্রদর্শন এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানায়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও টানা কয়েক সপ্তাহ বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহকে গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করে।

৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত বিশাল সমাবেশ আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ওই দিন শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে এক দফা ঘোষণা করা হয়, যা আন্দোলনের লক্ষ্যকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। আন্দোলনের সমন্বয়কদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ আলোচনা ও ঝুঁকি বিবেচনার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

এরপর ঘোষণা আসে 'মার্চ ফর ঢাকা' কর্মসূচির। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজারো মানুষ রাজধানীর উদ্দেশে রওনা হন। বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করেন এবং রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবস্থান নেন।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

৫ আগস্ট সকালে রাজধানীর শাহবাগ, বাংলামোটর, ফার্মগেট, নীলক্ষেত, পল্টন, উত্তরা, মিরপুর, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। দুপুরের পর শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর নিশ্চিত হলে অনেক এলাকায় বিজয় মিছিল বের হয়। একই সঙ্গে কিছু স্থানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।

পরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানান, বাংলাদেশের দ্রুত পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্যে শেখ হাসিনা অল্প সময়ের নোটিশে ভারতে যান এবং মানবিক কারণে তাকে সাময়িকভাবে সেখানে অবস্থানের সুযোগ দেওয়া হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৫ আগস্ট শুধু একটি সরকারের পতনের দিন নয়; এটি দীর্ঘদিনের ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হবে। তাদের মতে, এই গণঅভ্যুত্থান রাষ্ট্রীয় সংস্কার, জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে জাতীয় আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম আলী রেজার ভাষায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। তার মতে, এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের সরকারগুলোর জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হয়ে থাকবে যে, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও জনগণের প্রত্যাশাকে উপেক্ষা করে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় টিকে থাকা সহজ হবে না।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD