Logo

১৯৯১ সালে যেভাবে হয়েছিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১২ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৫০
১৯৯১ সালে যেভাবে হয়েছিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের একটি ব্যতিক্রমী অধ্যায়। সেই নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ভোটের দিন সংসদ কক্ষে প্রকাশ্যে ভোটগ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছিলেন তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের কয়েকজন সংসদ সদস্য।

বিজ্ঞাপন

১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এরশাদ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ আবার সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যায়। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সবচেয়ে বেশি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে। আওয়ামী লীগ প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সংসদে যায়। এরপর সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান অনুযায়ী ওই বছরই অনুষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।

১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী ছিলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী। দুজন প্রার্থীর মধ্যেই সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়।

ভোট শেষে আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট। ওই নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যসহ মোট ভোটার ছিলেন ৩৩০ জন। তবে ভোট দেন ২৬৪ জন সংসদ সদস্য। ভোটদানে বিরত থাকেন ৬৬ জন।

বিজ্ঞাপন

ভোটের দিন সংসদ কক্ষে উত্তেজনা

১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটগ্রহণের দায়িত্বে থাকা সাবেক নির্বাচন কর্মকর্তা মিহির সারওয়ার মোর্শেদের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে সেদিনের নানা ঘটনা।

তৎকালীন নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা সংসদ অধিবেশন কক্ষেই ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা করেছিলেন। সেখানে কয়েকটি ভোটকেন্দ্র বা বুথ স্থাপন করা হয়। সংসদ সদস্যরা নির্ধারিত ব্যবস্থায় ভোট দেন এবং নির্বাচন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি দলীয় পোলিং এজেন্টরাও পুরো প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন।

বিজ্ঞাপন

ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পর আওয়ামী লীগের কয়েকজন সংসদ সদস্য সংসদ কক্ষে প্রবেশ করে প্রকাশ্যে ভোটগ্রহণের পদ্ধতির প্রতিবাদ করেন। তাদের মধ্যে ছিলেন মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিম ও সাজেদা চৌধুরীসহ আরও কয়েকজন নেতা।

প্রকাশ্যে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা নিয়ে তারা সংসদ কক্ষে আপত্তি জানান এবং সেসময় ‘শেইম, শেইম’ বলে প্রতিবাদ করেন। তাদের অভিযোগ ছিল, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এ ধরনের প্রকাশ্য ভোটের ব্যবস্থা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ও গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর প্রকাশিত তৎকালীন সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে ওই দিনের প্রতিবাদের ঘটনাও উঠে আসে। ভোটগ্রহণ শুরুর পর আওয়ামী লীগের প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন সংসদ সদস্য সংসদ কক্ষে ঢুকে ভোটগ্রহণ নিয়ে আপত্তি জানান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

কীভাবে হয়েছিল ভোটগ্রহণ

তৎকালীন নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থাপনায় সংসদ কক্ষে ভোটগ্রহণের আয়োজন করা হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন বিচারপতি আব্দুর রউফ।

ভোটের দিন স্পিকারের জন্য ব্যবহৃত বড় চেয়ারটির পরিবর্তে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের জন্য একটি ছোট চেয়ার রাখা হয়েছিল। নির্ধারিত সময় দুপুর ২টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়।

বিজ্ঞাপন

খালেদা জিয়ার ভোটদানের মধ্য দিয়ে ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার পর আবদুর রহমান বিশ্বাস, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকারসহ সংসদ সদস্যরা পর্যায়ক্রমে ভোট দেন।

নির্বাচনী কর্মকর্তা মিহির সারওয়ার মোর্শেদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংসদ কক্ষে চারটি বুথ স্থাপন করা হয়েছিল। তিনি নিজে খুলনা ও বরিশাল বিভাগের সংসদ সদস্যদের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত পোলিং অফিসার ছিলেন। বিএনপির ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা এবং আওয়ামী লীগের তোফায়েল আহমেদ সেখানে পোলিং এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ভোটগ্রহণের সময় সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া নির্বাচন কর্মকর্তা ও পোলিং এজেন্টদের সামনে সম্পন্ন হয়। ফলে কারা কোন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, সেটি গোপন থাকার সুযোগ ছিল না।

বিজ্ঞাপন

ওই সংসদে স্বতন্ত্র সদস্য হিসেবে থাকা হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও নুরুল ইসলাম মনিও প্রকাশ্যে ভোট দেন। নির্বাচনের ফলাফলে তাদের ভোট আবদুর রহমান বিশ্বাসের পক্ষে গিয়েছিল বলে তৎকালীন সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

৩৫ বছর পর আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভোট

১৯৯১ সালের ওই নির্বাচনের পর বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি পদে আরও কয়েকবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে অধিকাংশ নির্বাচনে একক প্রার্থী থাকায় সংসদ সদস্যদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি।

বিজ্ঞাপন

ফলে ১৯৯১ সালের পর দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রকাশ্য ভোটের বিধান থাকলেও তা কার্যত বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরীক্ষার মুখে পড়েনি।

এবার সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে। রাষ্ট্রপতি পদে বিরোধী জোট প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ায় দীর্ঘ সময় পর আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। জামায়াত-এনসিপি জোট ইতোমধ্যে এলডিপি চেয়ারম্যান অলি আহমদকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন বিএনপির পক্ষ থেকেও রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীর নাম তখনও ঘোষণা করা হয়নি।

বিজ্ঞাপন

২০ আগস্ট সংসদ কক্ষেই ভোট

ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দিন নির্ধারিত হয়েছে। মনোনয়নপত্র বাছাই হবে ১৬ আগস্ট এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট। ভোটগ্রহণ হবে ২০ আগস্ট। ওই দিন দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, ভোটের জন্য সংসদ সদস্যদের আহ্বান জানিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংসদ কক্ষে বৈঠক আহ্বান করবেন। ভোট শেষে একই কক্ষে ব্যালট গণনা করা হবে এবং সেখান থেকেই প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণা করা হবে।

বিজ্ঞাপন

নির্বাচন পরিচালনায় নির্বাচন কমিশনের ২০ জন সহায়ক কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি সংসদ সচিবালয়ের প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মকর্তাও নির্বাচনী কাজে যুক্ত থাকবেন।

এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার তালিকায় ৩৪৯ জন সংসদ সদস্যের নাম রয়েছে। এর মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যও রয়েছেন।

কীভাবে ভোট দেবেন সংসদ সদস্যরা

বিজ্ঞাপন

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট পদ্ধতি সাধারণ নির্বাচনের তুলনায় আলাদা। সাধারণ নির্বাচনে ভোট গোপন ব্যালটে হলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের ভোট প্রকাশ্য হিসেবে গণ্য হয়।

ইসি সচিবের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ আসনে বসে ভোট দেবেন। নির্বাচন কর্মকর্তারা তাদের কাছে ব্যালট পেপার পৌঁছে দেবেন। এরপর সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য প্রার্থীর নামের পাশে নিজের পূর্ণ স্বাক্ষর ও নির্ধারিত বিভক্তি সংখ্যা লিখে ব্যালট বাক্সে তা জমা দেবেন।

ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর সংসদ কক্ষেই ব্যালট গণনা করা হবে। গণনা ও ফলাফল ঘোষণার পুরো প্রক্রিয়া একই জায়গায় সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

চিফ হুইপের বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি, সংসদ নেতা, বিরোধীদলীয় নেতা ও স্পিকারের ভোট দেওয়ার দৃশ্য গণমাধ্যমকে সরাসরি সম্প্রচারের সুযোগ দেওয়া হবে। ভোট গণনা এবং ফলাফল প্রস্তুতের কার্যক্রমও ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত সরাসরি সম্প্রচার করা যাবে।

প্রকাশ্য ভোটে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়া যাবে?

এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো প্রকাশ্য ভোট এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ। কারণ ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য সংখ্যা বেশি হওয়ায় তাদের মনোনীত প্রার্থীর জয় অনেকটাই নিশ্চিত বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিরোধী দলের প্রার্থী থাকায় ভোটের রাজনৈতিক তাৎপর্য বেড়েছে।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা সংসদে ওই দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার আসন শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে।

এই বিধান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি না, তা নিয়ে অবশ্য ভিন্নমত রয়েছে।

এক পক্ষের মতে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনও সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হওয়ায় দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দিলে ৭০ অনুচ্ছেদের প্রশ্ন আসতে পারে।

অন্যদিকে সংসদবিষয়ক কয়েকজন গবেষকের যুক্তি হলো, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদের আইন প্রণয়ন বা সংসদের স্বাভাবিক কার্যপ্রণালীর অংশ নয়। এটি সংবিধান এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন-সংক্রান্ত বিশেষ আইনের অধীনে পরিচালিত একটি পৃথক নির্বাচন। তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়াকে ৭০ অনুচ্ছেদের আওতায় সংসদে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে তারা মনে করেন।

নির্বাচন কমিশনের মধ্যেও এ বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিলে ৭০ অনুচ্ছেদের বিষয়টি প্রযোজ্য হতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে তার সংসদ সদস্য পদ নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

১৯৯১-এর বিতর্ক কি এবারও ফিরছে?

১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দেখিয়েছিল, সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুধু আনুষ্ঠানিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়; ভোটের ধরন ও পদ্ধতিও রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।

সেই সময় আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা প্রকাশ্য ভোটের প্রতিবাদ করেছিলেন। তিন দশকের বেশি সময় পর এবার আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে যাচ্ছে। ফলে ১৯৯১ সালের সেই পুরোনো বিতর্ক—প্রকাশ্য ভোট, দলীয় অবস্থান এবং সংসদ সদস্যদের ভোটের স্বাধীনতা—নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

তবে এবারের নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত সংসদ সদস্যরা কীভাবে ভোট দেবেন, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ ভোট দেবেন কি না এবং প্রকাশ্য ভোটের রাজনৈতিক প্রভাব কতটা পড়বে—এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে ২০ আগস্ট ভোটগ্রহণ ও ফলাফল ঘোষণার পর।

তথ্য সূত্র: বিবিসি বাংলা

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD