Logo

সিদ্ধিরগঞ্জ ডিপিডিসিতে ‘মাসুদ-জাহাঙ্গির-বলয়’

profile picture
বশির হোসেন খান
১২ আগস্ট, ২০২৬, ১৯:৪৬
সিদ্ধিরগঞ্জ ডিপিডিসিতে ‘মাসুদ-জাহাঙ্গির-বলয়’
প্রকৌশলী জাহাঙ্গির ও প্রকৌশলী মো. মাসুদুর রহমান। ফাইল ছবি

ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি)এর সিদ্ধিরগঞ্জ ডিভিশনে বিদ্যুৎ সরবরাহের তারের পাশাপাশি যেন ছড়িয়ে পড়েছে অনিয়মেরও এক অদৃশ্য জাল।

বিজ্ঞাপন

মিটার থেকে সংযোগ কারিগরি সেবা থেকে গ্রাহক হয়রানি বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোহম্মদ জাহাঙ্গির হোসেনের (পরিচিতি নং ২০৩৬৪) নাম। ঘুষ গ্রহণ, মিটার টেম্পারিং, অবৈধ সংযোগ, অনুমোদনহীন লোড বৃদ্ধি এবং সরকারি রাজস্ব ফাঁকির মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। আর এই সিন্ডিকেটের নেপথ্যের কারিগর সিদ্ধিরগঞ্জ নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদুর রহমান (পরিচিতি নং ১১১৩০)।

এ বিষয়ে কয়েকজন ভুক্তভোগী দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

অভিযোগকারীরা বলছেন, জাহাঙ্গির হোসেনকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী বলয়ের মাধ্যমে এসব অনিয়ম পরিচালিত হচ্ছে। ওই বলয়ে ডিপিডিসির কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর পাশাপাশি বহিরাগতদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। তবে জাহাঙ্গির হোসেন তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, দীর্ঘ চাকরিজীবনে তিনি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।

বিজ্ঞাপন

‘মাসোয়ারা’ দিয়ে চলে সুবিধা: সিদ্ধিরগঞ্জ ডিভিশনের ডিসিএম ফিডার, ভূইয়াপাড়া ফিডার, শান্তিনগর ফিডার, একতা ফিডার ও আশপাশের এলাকায় কয়েকজন গ্রাহকের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি। তাঁদের দাবি, অর্থের বিনিময়ে মিটার, সংযোগ ও লোড ব্যবস্থাপনায় নিয়মের ব্যত্যয় ঘটানো হয়। কোনো কোনো বাণিজ্যিক মিটারে বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা চার্জ দেওয়া, আবাসিক সংযোগে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং অনুমোদনের বাইরে লোড বাড়ানোর অভিযোগও রয়েছে।

কারিগরি কাজেও বহিরাগতদের দাপট: অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্যে মিটার রিডার মো. জামাল ও মো. মিজানুর রহমানসহ ৬/৭ জনের একটি গ্রুপের নাম এসেছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কারিগরি কাজে অনিয়ম এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা আদায়ের অভিযোগ করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিপিডিসির কয়েকজন কর্মচারী বলেন, নিয়ম অনুযায়ী যে সেবা পাওয়ার কথা, তার জন্যও অনেক সময় গ্রাহকদের অতিরিক্ত অর্থের মুখোমুখি হতে হয়। প্রতিবাদ করলে নানা ধরনের চাপের আশঙ্কায় অনেকে মুখ খুলতে চান না। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা খুঁজতে গিয়ে বেশ কিছুর প্রমাণ মিলেছে। যার নথি এখন দৈনিক জনবাণীর হাতে।

সোলার ছাড়া অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ: নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের একটি বিদ্যুৎ সংযোগটির গ্রাহক মো. মানিক ইসলাম। তাঁর ঠিকানা আর/এস ৫১৫৪, কদমতলী, সিদ্ধিরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ। গ্রাহক নম্বর ৩৮৩১৩৩৮৬ এবং মিটার নম্বর বিডি-০৭৭৪৬৭।

বিজ্ঞাপন

বিলে দেখা যায়, ২৫ মে মিটারের পূর্ববর্তী রিডিং ছিল ২৭ হাজার ৬৬১ ইউনিট। ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে বর্তমান রিডিং দাঁড়ায় ৩০ হাজার ৪৩০ ইউনিট। অর্থাৎ উল্লিখিত সময়ের মধ্যে ব্যবহৃত বিদ্যুতের পরিমাণ ২ হাজার ৭৬৯ ইউনিট। বিলের হিসাবে ব্যবহৃত ইউনিটের মূল্য ৩ হাজার ৩৪৪ টাকা ১ পয়সা দেখানো হয়েছে। এর সঙ্গে অন্যান্য চার্জ ও সমন্বয়ের বিষয়ও বিলে উল্লেখ রয়েছে। সংযোগটির ট্যারিফ হিসেবে এলটি-এ ১১ এবং গ্রাহকের ধরন হিসেবে ‘ওএম’ উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকৃত ব্যবহার যাচাই ও পূর্ববর্তী কয়েক মাসের ব্যবহার এবং ডিপিডিসির রেকর্ড পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে সোলার ছাড়া এই বিদ্যুৎ সংযোগ অনুমোদনের সুযোগ নাই। অভিযোগ রয়েছে উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোহম্মদ জাহাঙ্গির হোসেনকে ৫ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে তরিগড়ি করে এই সংযোগ নিয়েছেন গ্রাহক মানিক ইসলাম। এ ছাড়াও ওই মিটারের বিলটি যাছাই-বাছাই করলে অসংঘতি পাওয়া যাতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরেজমিনে গিয়ে কয়েকটি সংযোগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার মতো তথ্য পাওয়া গেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, আবাসিক সংযোগ ব্যবহার করেই কোথাও কোথাও অটো রিকশার গ্যারেজ প্রতি মাসে এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়েছে। অনুমোদন ছাড়াই মিটার টেম্পারিং করে প্রকৌশলী জাহাঙ্গিরের পকেটে যাচ্ছে ঘুষের টাকা। সিদ্ধিরগঞ্জ ডিভিশন ঘিরে ওঠা অভিযোগের দায় শুধু একজন উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোহম্মদ জাহাঙ্গির হোসেনই নয়, এই প্রভাববলয়ের নেতৃত্বে সিদ্দিরগঞ্জ নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদুর রহমান। কারণ কারিগরি কাজের তদারকি ও মিটার টেম্পারিং কিংবা অনুমোদনহীন সংযোগ হলে সংশ্লিষ্ট রেকর্ডে তার ছাপ না থাকাই প্রমাণ করে নির্বাহী প্রকৌশলী কৌশলী হয়ে এ সব প্রমাণ পরিবর্তন করেন।

গ্রাহকদের অভিযোগ, নতুন সংযোগ, মিটার পরিবর্তন কিংবা অন্য কোনো কারিগরি সেবা পেতে গিয়ে তাঁদের একধরনের ‘দালালনির্ভরতার’ মধ্যে পড়তে হয়। অভিযোগ রয়েছে, অফিসের নিয়মিত সেবা পাওয়ার পথকে জটিল করে সেই সুযোগে প্রকৌশলী জাহাঙ্গির চক্র সুবিধা আদায় করে।

বিজ্ঞাপন

হাসনাত স্যার পাশে আছেন: প্রকৌশলী জাহাঙ্গির হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। নিজের সম্পদের উৎস বৈধ বলেও দাবি করেন তিনি। তবে তাঁর একটি বক্তব্য বিশেষভাবে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জাহাঙ্গির হোসেন বলেন, “হাসনাত স্যার পাশে আছে বলে কোনো কিছুতেই চিন্তা করি না। আমার সম্পর্কে জানতে হলে স্যারকে জিজ্ঞেস করেন।”

ডিপিডিসির কোম্পানি সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ হাসনাত চৌধুরীর বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD