তারেক রহমানের বিএনপি সরকারের ছয় মাসের কেমন ছিল চিত্র?

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পূর্ণ করেছে। প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্র পরিচালনায় ফিরে আসা দলটির জন্য এই সময় ছিল নানা প্রত্যাশা, চ্যালেঞ্জ ও বিতর্কে ভরা। সরকারের ঘোষিত অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ছয় মাস শেষে এসব ক্ষেত্রে কতটা অগ্রগতি হয়েছে, তা নিয়ে যেমন প্রশ্ন রয়েছে, তেমনি সামাজিক নিরাপত্তা, কূটনীতি ও প্রশাসনিক কিছু উদ্যোগে ইতিবাচক সাড়ার কথাও বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিজ্ঞাপন
সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বড় অংশ বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মূল্যায়নে, বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা, মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুৎ-জ্বালানি এবং রাজনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
শুরুতেই নির্ধারিত হয়েছিল তিন অগ্রাধিকার
১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার পরদিন বিএনপি সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকে তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এগুলো হলো—দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা।
বিজ্ঞাপন
ছয় মাস পর সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়নের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই এই তিনটি বিষয় সামনে এসেছে। কারণ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর সরাসরি প্রভাব রয়েছে এসব খাতের।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
সরকারের দাবি, তাদের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানো এবং জনপ্রতিনিধিদের কিছু সুযোগ-সুবিধা সীমিত রাখার উদ্যোগও প্রশংসা পেয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ে এখনো প্রশ্ন
বিজ্ঞাপন
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ছিল অন্যতম বড় প্রত্যাশা। কিন্তু ছয় মাসের বিভিন্ন ঘটনা সেই প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে নয়টি। কারাগারে বন্দি বা বিচারাধীন অবস্থায় ৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩৬৫টি। একই সময়ে মব সহিংসতায় ১২০ জন নিহত হওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে।
এ ছাড়া রাজনৈতিক সংঘাত, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হত্যা, ছিনতাই ও গণপিটুনির মতো ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।
বিজ্ঞাপন
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রত্যাশিত মাত্রায় স্থিতিশীল না হওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন।
অর্থনীতিতে কিছু উদ্যোগ, কিন্তু মূল্যস্ফীতির চাপ
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার সময় দেশের অর্থনীতি নানা সংকটের মধ্যে ছিল। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগের স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের ধীরগতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
বিজ্ঞাপন
অর্থনীতিবিদদের মতে, ছয় মাসের মধ্যে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট পুরোপুরি সমাধান করা কঠিন। তবে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচিও সরকারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হিসেবে আলোচিত হয়েছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর জন্য অর্থায়নের উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছে।
তবে সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে এখনো রয়ে গেছে দ্রব্যমূল্য। দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে।
বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু আর্থিক নীতি নয়, বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ ব্যবস্থা ও উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে সরকারের বড় চাপ
ছয় মাসের সময়ে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে উঠেছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং, বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিয়ম এবং অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ দেখা দিয়েছে। এর পাশাপাশি গ্যাস সংকটও শিল্প, পরিবহন ও সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলেছে।
বিজ্ঞাপন
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারি, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি সংকটের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
সরকার অবশ্য এসব সংকটের জন্য আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা এবং অবকাঠামোগত বিভিন্ন সীমাবদ্ধতাকে দায়ী করছে। সরকারের পক্ষ থেকে সংকট দ্রুত সমাধানের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা অর্থনীতি সচল রাখার অন্যতম প্রধান শর্ত। ফলে আগামী সময়ে এ খাতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের দিকে নজর থাকবে।
বিজ্ঞাপন
কূটনীতিতে কিছু ইতিবাচক অর্জন
অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সংকটের বিপরীতে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে সরকার কিছু সাফল্য পেয়েছে বলে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান নির্বাচিত হওয়াকে সরকারের অন্যতম কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া দায়িত্ব নেওয়ার পর বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সফরকালে চীনের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক করিডর, তিস্তা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে অগ্রগতির বিষয়গুলোও আলোচনায় এসেছে।
তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখনো জটিলতা রয়েছে। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাকে ঘিরে বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ দাবির বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলছে। ফলে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কোন দিকে যায়, সেটিও সরকারের পররাষ্ট্রনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
রাজনৈতিক সংস্কার ও সুশাসন নিয়ে অসন্তোষ
রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নটি ছিল ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা এবং জুলাই সনদ নিয়ে যে প্রক্রিয়া এগিয়েছিল, ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সরকারের সঙ্গে সেই বিষয়গুলো নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন
বিশ্লেষকদের অভিযোগ, বিচার বিভাগ, পুলিশ সংস্কার, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ছয় মাসে প্রত্যাশিত দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি।
বিশেষ করে সংস্কার ইস্যুতে সরকারের অবস্থান নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে টানাপোড়েন বাড়ছে। ফলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সংস্কার বাস্তবায়নের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
সরকারের জন্য সামনে আরও বড় পরীক্ষা
ছয় মাসের মূল্যায়নে বিএনপি সরকারের চিত্র একেবারে একমুখী নয়। সামাজিক নিরাপত্তা, কূটনীতি ও কিছু প্রশাসনিক উদ্যোগে ইতিবাচক দিক রয়েছে। অন্যদিকে দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট, কর্মসংস্থান এবং রাজনৈতিক সংস্কারের মতো ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি বুঝে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সময় লেগেছে। এখন শুরু করা বিভিন্ন প্রকল্প ও সংস্কারের ফল ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হবে।
তবে সাধারণ মানুষের কাছে সরকারের সাফল্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হবে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো। আগামী ছয় মাসে এসব ক্ষেত্রে বাস্তব পরিবর্তন কতটা আসে, সেটিই বিএনপি সরকারের জনপ্রিয়তা ও কার্যকারিতার বড় পরীক্ষা হয়ে উঠবে।
তথ্য সূত্র: বিবিসি বাংলা








