ডোম-ইনোর জালে জমি-বাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব শিক্ষক পরিবার

তিন বছরের প্রতিশ্রুতি, এক-দুই দশকেও শেষ হয়নি ভবন; পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বাতিলের আদেশ, কোটি টাকার জরিমানা ও শতাধিক মামলার অভিযোগ আদালত-থানায় ঘুরেও প্রতিকার নেই। বহুতল ভবনের স্বপ্ন দেখিয়ে জমি নেওয়া, এরপর বছরের পর বছর নির্মাণ ঝুলিয়ে রাখার অভিযোগ উঠেছে রাজধানীর ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান ডোম-ইনো বিল্ডার্স লিমিটেডের বিরুদ্ধে।
বিজ্ঞাপন
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে গুরুতর প্রতারণার অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী জমির মালিকরা। তাদের অভিযোগ, তিন বছরের মধ্যে ভবন বুঝিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জমি নেওয়ার পর কেটে গেছে ১০, ১৫ এমনকি ২০ বছরও; কিন্তু অনেক প্রকল্পের নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি। নিজের বাড়ি ছিল, ছিল নিরাপদ ছাদ। বাড়ির কয়েকটি ফ্ল্যাট থেকে নিয়মিত ভাড়াও আসত। সংসারে অভাব ছিল না, ভবিষ্যৎ নিয়েও ছিল না বড় কোনো দুশ্চিন্তা। কিন্তু বহুতল ভবনের স্বপ্নে ডেভেলপারের হাতে জমি তুলে দেওয়ার পর সেই স্বচ্ছল জীবনই যেন পরিণত হয়েছে দীর্ঘ দুর্ভোগে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চুক্তির সময় তিন বছরের মধ্যে ভবন নির্মাণ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এক যুগ, দেড় যুগ পেরিয়ে গেছে; কোথাও প্রায় দুই দশক। অথচ অনেক প্রকল্পে ভবন নির্মাণ শেষ হয়নি। কোথাও পড়ে আছে কঙ্কালসার অবকাঠামো, কোথাও জমেছে ময়লা পানি, আবার কোথাও নির্মাণকাজ থেমে আছে বছরের পর বছর।
ফলে জমির মালিকরা একদিকে হারিয়েছেন নিজেদের বসতবাড়ি, অন্যদিকে বন্ধ হয়েছে ভাড়ার আয়। এমনও অভিযোগ রয়েছে নিজের জমির মালিক হয়েও কেউ কেউ এখন অন্যের বাড়িতে ভাড়াটিয়া হয়ে জীবন কাটাচ্ছেন।
শুধু নির্মাণকাজে বিলম্ব নয়, ডোম-ইনোর বিরুদ্ধে জমির মালিকদের সঙ্গে চুক্তি, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি এবং আর্থিক দায়বদ্ধতা ঘিরেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বাতিলের আদেশ, কোটি কোটি টাকা জরিমানা এবং বিভিন্ন আদালতে মামলা থাকা সত্ত্বেও সমস্যার কার্যকর সমাধান মিলছে না। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রাক্তন শিক্ষক সুফিয়া খাতুনও ডোম-ইনোর বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ তুলে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিকার চেয়ে ঘুরছেন আদালত ও থানায়। তাঁর অভিযোগ, বহুতল ভবনের প্রতিশ্রুতিতে জমি দেওয়ার পর তিনি শুধু নিজের সম্পদই হারাননি, হারিয়েছেন দীর্ঘদিনের নিরাপদ জীবন ও আয়ের উৎসও।
অভিযোগের ভারে প্রশ্নের মুখে ডোম-ইনোর ব্যবসায়িক প্রতিশ্রুতি তিন বছরের চুক্তি কীভাবে গড়াল এক-দুই দশকের অপেক্ষায়? জমির মালিকদের অভিযোগের নিষ্পত্তি না হয়ে কেন বছরের পর বছর ঝুলে থাকছে প্রকল্পগুলো? আর এত মামলা, আদেশ ও অভিযোগের পরও ভুক্তভোগীরা কেন পাচ্ছেন না প্রতিকার এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অধরা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চুক্তির শর্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বছরের পর বছর প্রকল্প ঝুলিয়ে রাখা, জমি ও পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, ফ্ল্যাট হস্তান্তরে ব্যর্থতা এবং কোথাও কোথাও অনুমোদনসংক্রান্ত অনিয়মের কারণে তারা সর্বস্বান্ত হয়েছেন। ভুক্তভুগিরা বলেন, এটি নিছক ব্যবসায়িক ব্যর্থতা নয়; দীর্ঘসূত্রতা ও অনিশ্চয়তার এমন এক দুঃসহ ফাঁদ, যার মধ্যে আটকা পড়ে গেছে শত শত পরিবারের জীবন।
বিজ্ঞাপন
শান্তিনগরের ‘ডোম-ইনো-এসকাপেরেট’ প্রকল্পের জমির মালিক সুফিয়া খাতুনের গল্পটি যেন এই দীর্ঘ দুর্ভোগের প্রতীক। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক শিক্ষক সুফিয়া খাতুনের বয়স ৮০ বছরের বেশি। ২০০৭ সালে পরিবারের জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য ডোম-ইনোর সঙ্গে চুক্তি করেন তিনি ও তাঁর ওয়ারিশরা। চুক্তি অনুযায়ী তিন বছরের মধ্যে ভবন নির্মাণ শেষ করে জমির মালিকদের অংশের ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দেওয়ার কথা। ভবন নির্মাণের জন্য ভেঙে ফেলা হয় তাঁদের পারিবারিক বাড়ি। জমি বুঝে নেয় ডোম-ইনো। কয়েকতলার একটি কাঠামোও দাঁড় করানো হয়। তারপর যেন হঠাৎ থেমে যায় সবকিছু। এক বছর, দুই বছর, পাঁচ বছর এভাবে পেরিয়ে যায় প্রায় সাড়ে ১৮ বছর। আজও নিজের বাড়িতে ফিরতে পারেননি সুফিয়া খাতুন। শুধু বাড়ি হারানোর বেদনা নয়, দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যে হারিয়েছেন স্বজনও। তাঁর দুই বোন মারা গেছেন। দুশ্চিন্তা করতে করতে তাঁর চিকিৎসক ছেলে অর্থোপেডিক সার্জন ডা. খালেদ মোশাররফও মারা গেছেন বলে জানান তিনি। কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন প্রবীণ এই সাবেক শিক্ষক। তাঁর প্রশ্ন, “আর কত দিন অপেক্ষা করব? মৃত্যুর আগে কি নিজের বাড়িটা দেখে যেতে পারব?”এই প্রশ্নের উত্তর তাঁর কাছে নেই। ডেভেলপারের কাছ থেকেও তিনি পাননি কার্যকর কোনো সমাধান এমন অভিযোগ তাঁর।
সুফিয়া খাতুনের অভিযোগ, বছরের পর বছর নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় প্রকল্পের অবস্থা এখন ভয়াবহ। নির্মাণাধীন কাঠামো পড়ে আছে অযতেœ। জমে থাকা পানিতে মশা-মাছির উপদ্রব। সাপেরও বিচরণ রয়েছে বলে জানান তিনি। অর্থাৎ যে জমিতে একসময় ছিল পারিবারিক বসতবাড়ি, সেখানে এখন দাঁড়িয়ে আছে পরিত্যক্ত নির্মাণকাঠামো; আর সেই কাঠামো ঘিরে তৈরি হয়েছে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাঝুঁকি।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকার কারণে কাঠামোটির ব্যবহারযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফলে ভবনটি আদৌ ব্যবহারযোগ্য কি না, তা নিয়েও নতুন করে প্রকৌশলগত মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সুফিয়া খাতুনের প্রকল্প নিয়ে বিরোধ গড়ায় আর্বিট্রেশনে। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আর্বিট্রেশন কোর্ট ডোম-ইনোকে দেওয়া পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বাতিলের পাশাপাশি প্রায় ১৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা জরিমানা করেছে। এই আদেশের বিরুদ্ধে ডোম-ইনো আপিল করেছে। অন্যদিকে সুফিয়া খাতুন আপিল খারিজের আবেদন জানিয়েছেন। একটি প্রকল্পের বিরোধ যখন এত বড় অঙ্কের জরিমানা এবং পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বাতিলের পর্যায়ে পৌঁছে, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এত বছর ধরে জমি হারিয়ে অপেক্ষায় থাকা জমির মালিকদের দায়ভার কে নেবে? সুফিয়া খাতুনের মতো একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন অন্তত ৮০ জন জমির মালিক এমন দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।
কারও বাড়ি ছিল দোতলা। কারও পাঁচতলা। কারও বাড়িতে পরিবার থাকত, পাশাপাশি ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে নিয়মিত আয় হতো। কেউ দোকান বা অফিস ভাড়া দিয়ে সংসারের ব্যয় মেটাতেন। ডোম-ইনো ডেভেলপারের সঙ্গে চুক্তির পর সেই বাড়িগুলো ভেঙে দেওয়া হয়। তারপর? বছরের পর বছর চলে যায়। ভবন শেষ হয় না। নিজের বাড়ি হারিয়ে জমির মালিকরাই হয়ে যান ভাড়াটিয়া। কেউ কেউ অসুস্থ, কেউ প্রবীণ। অনেকে এরই মধ্যে মারা গেছেন। তাঁদের উত্তরসূরিরাও এখন জানেন না, আদৌ কখন নিজের জমিতে তাঁদের প্রাপ্য ফ্ল্যাট বুঝে পাবেন। ডোম-ইনোর বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিধি শুধু জমির মালিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন শত শত ফ্ল্যাট ক্রেতা। ভুক্তভোগীদের দাবি, বিভিন্ন প্রকল্পে ফ্ল্যাট বিক্রির চুক্তি করে ক্রেতাদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়া হয়েছে। অনেকেই দিয়েছেন পুরো টাকা কিংবা বড় অঙ্কের অগ্রিম। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে ফ্ল্যাট বুঝে পাননি। ফলে একই প্রকল্পে একদিকে জমির মালিকের জমি আটকে আছে, অন্যদিকে ক্রেতার টাকা আটকে আছে। দুই পক্ষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে অসমাপ্ত ভবন, মামলা আর দীর্ঘ অনিশ্চয়তা।
ভুক্তভোগী অন্তত ১৫ জন জমির মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডোম-ইনোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে ১৩৬টি মামলা রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদেও তথ্য অনুযায়ী, একটি মামলায় তাঁর চার বছরের সশ্রম কারাদন্ডের আদেশ হয়েছে। দুটি আর্বিটেশন মামলায় প্রায় ১৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। এ ছাড়া শতাধিক মামলার মধ্যে অন্তত ১৭টিতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকার অভিযোগও রয়েছে। মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের ‘ডোম-ইনো-আলবা’ প্রকল্প নিয়ে করা মামলায় আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে চার বছরের সশ্রম কারাদন্ডের পরোয়ানা জারি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিজ্ঞাপন
ভুক্তভোগীদের দাবি, গত ২১ জুলাই বনানী থানা ওই পরোয়ানা গ্রহণ করেছে। অথচ বনানীর এফ ব্লকের ৭ নম্বর সড়কের ১৩ নম্বর বাড়িতে অবস্থিত ‘ডোম-ইনো হাউজে’ আব্দুস সালামের যাতায়াত রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার বনানী অফিসে গিয়ে মূল ফটকের গেটে একজন অফিস সহকারীর সঙ্গে দেখা হয়। তিনি দৈনিক জনবাণীকে বলেন, আপনি আমার নাম বলবেন না। এমডি সালাম স্যার গ্রাহকের সঙ্গে এতো প্রতারনা করেছেন। যাতে জন্য তিনি হঠাৎ করে অফিসে আসেন আবার আত্মগোপনে চলে যান। বনানী থানা পুলিশ ম্যানেজ করেই অফিসে বসেই ব্যবসা পরিচালনা করেন এমডি স্যার।
ভুক্তভোগীরা বলেন, বিভিন্ন মামলায় আব্দুস সালাম ও তাঁর স্ত্রী এবং কোম্পানির চেয়ারম্যান রিজওয়ানা ইসলাম আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন। রিজওয়ানা ইসলাম গত ২৬, ২৭ ও ২৮ জুলাই আদালতে হাজির হয়েছেন বলেও সংশ্লিষ্টরা জানান। আব্দুস সালাম গত বছরের মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন এবং তাঁর স্ত্রীও গত বছরের এপ্রিলে কারাগারে ছিলেন বলে জানা গেছে।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগ ও মামলার এই দীর্ঘ তালিকার মধ্যেও প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভুক্তভোগীদের অনিশ্চয়তা কাটেনি। এ ব্যাপারে ডম-ইনো’র ম্যানেজার ফারুক হোসেন বলেন, প্রকল্প নিয়ে গ্রাহকদের সঙ্গে মামলার জটিলতা রয়েছে। তা ছাড়া স্যার আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাই নানা ঝমালের মধ্য আছে। আশা করছি অল্প দিনের মধ্য এমডি স্যার সরকারকে ম্যানেজ করে ব্যবসা আগের মতই পরিচালনা করতে পারবে। সালাম স্যার অনেক ক্ষমতাধর। ইতোমধ্য সরকারি এক বিশেষ মহলের সঙ্গে কথা হয়েছে। খুব শিঘ্রই এমডি সালাম স্যার সরকারের প্রতিনিধি’র সঙ্গে কথা বলে সব ঠিক করে নিবে। তখন কোনো শক্তিই ডম-ইনোকে আটকে রাখতে পারবে না।
রাজউকের নিয়ম-নীতি লঙ্ঘনের কিছু হয়ে থাকলে রাজউক নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নেবে। এসব অভিযোগ প্রতিদ্বন্দ্বীদের শত্রুতামূলক প্রচারণার ফল বলেও দাবি করেন তিনি। এসব অভিযোগের বিষয়ে ডোম-ইনোর মালিক আব্দুস সালামের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। এমকি তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে বার্তা পাঠিয়ে উত্তর পাওয়া যায়নি।








