জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাফিয়া প্রকৌশলী আউয়াল

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) জনগণের নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। অথচ সেই প্রতিষ্ঠানেই অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের যেন শেষ নেই। অভিযোগের কেন্দ্রে প্রধান প্রকৌশলী মো. আবদুল আউয়ালকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী বলয়।
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, ক্ষমতার দাপট আর প্রভাবের জাল বিস্তার করে কথিত এই চক্র অধিদপ্তরকে পরিণত করেছে সুবিধা বাণিজ্যের কেন্দ্রে; যেখানে অর্থের বিনিময়ে বদলি-পদায়ন, প্রশাসনিক সুবিধা, প্রকল্প ও ঠিকাদারি কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠছে। ‘টাকা দিলেই সমস্যার সমাধান’—এমন অভিযোগও রয়েছে এই বলয়কে ঘিরে। চক্রটির বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ তুলে কেউ কেউ প্রধান প্রকৌশলী আউয়ালকে ‘সেবা খাতের মাফিয়া’ বলেও অভিহিত করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও সিনিয়রদের ডিঙিয়ে ৩৫ কোটি টাকার বিনিময়ে প্রধান প্রকৌশলীর চেয়ার বাগিয়ে নেন। নিজের আধিপত্য বিস্তারে তিনি গড়ে তুলেন একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, এক সময় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন প্রধান প্রকৌশলী আউয়াল। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশীর্বাদপুষ্ট ও বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে পরিচিত। সেই দাপটেই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে। তিনি ছিলেন এই দপ্তরের এক মূর্তিমান আতঙ্ক। তার দাপটে তখন কেউ মুখ খুলতে পারেনি। তার বিরুদ্ধে গেলেই নেমে আসতো অত্যাচারের স্টিমরোলার।
অতীতে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠতার পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার করা কয়েকজন কর্মকর্তা এখনো বহাল তবিয়তে থেকে নতুন করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। সেই বলয়ের ছত্রচ্ছায়ায় বদলি, পদায়ন, প্রকল্প, ঠিকাদারি কাজ ও দাপ্তরিক সিদ্ধান্তকে ঘিরে অনিয়মের পুরোনো সংস্কৃতি নতুন মাত্রা পেয়েছে। আর এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন ডিপিএইচইর প্রধান প্রকৌশলী মো. আবদুল আউয়াল। অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্রকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে নানা সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করা হচ্ছে। ফলে অতীতে রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় যারা প্রভাবশালী ছিলেন, তাদেরই কেউ কেউ বর্তমান সময়েও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখে নিজেদের প্রভাববলয় অটুট রেখেছেন—এমন অভিযোগই এখন অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত।
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্টরা বলছে, অনিয়মের এই বলয় কেবল ব্যক্তি বা পদকেন্দ্রিক নয়; বরং এটি একটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্কে রূপ নিয়েছে। ফলে একজনের বদলে একাধিক স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সুবিধাভোগী মহলকে ঘিরে তৈরি হয়েছে পারস্পরিক স্বার্থের জটিল সমীকরণ। এতে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে যেমন ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে, তেমনি প্রশ্ন উঠছে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও কেন জনগুরুত্বপূর্ণ এই অধিদপ্তরে পুরোনো প্রভাববলয়ের শিকড় উপড়ে ফেলা গেল না।
অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. আবদুল আউয়ালকে ঘিরে পদায়ন, দায়িত্ব বণ্টন, প্রকল্প বাস্তবায়ন, টেন্ডার, বদলি, নিলাম এবং আর্থিক অনিয়মের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার আগে তাঁর বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থার নেতিবাচক মূল্যায়ন ছিল। এরপরও তাঁকে অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই রিপোর্টে বলা হয় তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মো. আবদুল আউয়াল ১৯৯৮ সালের ৫ মার্চ জিওবি-ডানিডা প্রকল্পে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর ২০০৬ সালে রাজস্ব খাতে যোগ দেন এবং ২০১৩ সালে চাকরিতে নিয়মিত হন। তাঁর মূল পদ নির্বাহী প্রকৌশলী হলেও পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীসহ অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দায়িত্বে আসেন তিনি। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর তাঁকে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর পরপরই ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি তিনি অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পূর্ত) পদে দায়িত্ব পাওয়ার জন্য আবেদন করেন। ১১ জানুয়ারি এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হয়।
বিজ্ঞাপন
একজন কর্মকর্তার অল্প সময়ের মধ্যে অধিদপ্তরের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসার বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে। এসব পদায়ন আর্থিক লেনদেন ও রাজনৈতিক আশীর্বাদে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আবদুল আউয়ালের দ্রুত উত্থানের পেছনে প্রায় ৩৫ কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন হয়েছে—এমন গুরুতর অভিযোগও পাওয়া গেছে।
অভিযোগে দাবি করা হয়, কথিত ওই অর্থের একটি অংশ তৎকালীন স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদী এবং আরেকটি অংশ তৎকালীন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার কাছে গেছে। আবদুল আউয়ালকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেওয়ার আগে কয়েকজন কর্মকর্তার বিষয়ে মূল্যায়নে আবদুল আউয়াল সম্পর্কে দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগের তথ্য ছিল। সেই মূল্যায়নের পরও তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রশাসনিক ভিত্তিই ছিল অবৈধ আর্থিক লেনদেন।
বিজ্ঞাপন
আবদুল আউয়ালের রাজনৈতিক পরিচয়ের অনুসন্ধানে জানা গেছে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) পড়াশোনার সময় তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। কর্মজীবনেও আওয়ামী লীগ-সমর্থক হিসেবে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এ ছাড়া ময়মনসিংহের সাবেক দুই সংসদ সদস্যের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. আবদুল আউয়ালের মুঠোফোনে কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি।








