Logo

গ্রামাঞ্চলে তীব্র লোডশেডিং, থমকে গেছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৮ আগস্ট, ২০২৬, ১৯:২১
গ্রামাঞ্চলে তীব্র লোডশেডিং, থমকে গেছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা
ছবি: সংগৃহীত

তীব্র গরমের মধ্যে গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিংয়ে বিপাকে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। দিনের বেলায় বিদ্যুৎ না থাকায় শ্রেণিকক্ষে ফ্যান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, বাড়িতে পড়ার পরিবেশও থাকছে না স্বাভাবিক। আর রাতে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে ঘুম। এতে নিয়মিত পড়াশোনার রুটিনে ছন্দপতনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ক্লাসে মনোযোগ ও উপস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

রাজধানী ঢাকার পাশের গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমী গ্রামের শিক্ষার্থী ছোয়াইদ হাসান নুজাইমের অভিজ্ঞতাই এর একটি উদাহরণ। স্থানীয় বরমী ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর কাছে দিনের বড় একটি সময় বিদ্যুৎ না থাকা এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা। কখন বিদ্যুৎ চলে যাবে কিংবা আবার কখন আসবে, তার নিশ্চয়তা না থাকায় বাড়িতে পড়তে বসার সময়ও তাকে বিদ্যুতের অপেক্ষায় থাকতে হয়। একই পরিস্থিতি দেখা দেয় স্কুলের শ্রেণিকক্ষেও।

নুজাইমের ভাষ্য, দিন-রাতের বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। ফলে বাড়িতে ঠিকমতো পড়াশোনা করা যায় না। স্কুলে গিয়েও গরমের মধ্যে ফ্যান বন্ধ থাকলে ঘেমে যেতে হয়। এতে পড়ায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

শুধু নুজাইম নয়, বরমী ইউনিয়ন ও আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও একই ধরনের ভোগান্তির কথা জানা গেছে। তীব্র গরমে শ্রেণিকক্ষে ফ্যান থাকলেও বিদ্যুৎ না থাকায় সেগুলো অচল হয়ে পড়ে। কেউ খাতা দিয়ে বাতাস করার চেষ্টা করে, কেউ ঘন ঘন পানি পান করে, আবার কেউ অপেক্ষা করে কখন বিদ্যুৎ ফিরে আসবে।

বিজ্ঞাপন

ফলে শিক্ষকরা পাঠদান চালিয়ে গেলেও অনেক শিক্ষার্থীর মনোযোগ পাঠের বদলে গরম, অস্বস্তি ও বিদ্যুৎ আসার অপেক্ষার দিকে চলে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে শ্রেণিকক্ষের স্বাভাবিক পরিবেশ ও পাঠ গ্রহণের ওপর।

রাতের লোডশেডিংয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যাহত ঘুম

শিক্ষার্থীদের সমস্যাটি শুধু দিনের ক্লাসে সীমাবদ্ধ নয়। রাতের লোডশেডিংও তাদের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় আরেকটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল আহাদ জানায়, রাতে পড়তে বসার সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে পড়াশোনা বন্ধ রাখতে হয়। বাড়িতে বিকল্প আলোর ব্যবস্থা থাকলেও তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘসময় বই নিয়ে বসে থাকা কঠিন। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ না থাকায় রাতে ঘুমাতেও সমস্যা হয়। ফলে সকালে স্কুলে গিয়ে শরীর ও মন দুটোই ক্লান্ত লাগে।

আহাদের ভাষায়, রাতে বিদ্যুৎ না থাকলে গরমে ঘুমাতে কষ্ট হয় এবং পড়াশোনাও করা যায় না। সকালে স্কুলে যাওয়ার পর ঘুম ঘুম লাগে। তখন ক্লাসে মনোযোগ দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।

শিক্ষার্থীদের এই অভিজ্ঞতা দেশের বিভিন্ন মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলের বাস্তবতার সঙ্গে মিলে যায়। দিনের লোডশেডিং শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ নষ্ট করছে, আর রাতের বিদ্যুৎ বিভ্রাট কেড়ে নিচ্ছে পড়াশোনা ও বিশ্রামের সময়। স্কুলের পাঠ, বাড়ির কাজ, পরীক্ষার প্রস্তুতি কিংবা পরদিনের পড়া—সব ক্ষেত্রেই তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা।

বিজ্ঞাপন

বিদ্যুৎ কখন থাকবে আর কখন থাকবে না, তা আগে থেকে নিশ্চিত না হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত পড়াশোনার নির্দিষ্ট রুটিনও ধরে রাখতে পারছে না।

পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ লোডশেডিং

শিক্ষার্থীদের এই দুর্ভোগের পেছনে দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতির অবনতিও একটি বড় কারণ। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১০ আগস্ট দেশে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭২২ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরের মধ্যে এ সময়ের লোডশেডিংয়ের মাত্রা ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ে।

বিজ্ঞাপন

তথ্য তুলনায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের একই দিনের তুলনায় ২০২৬ সালের ১০ আগস্ট লোডশেডিংয়ের পরিমাণ প্রায় ১৮ গুণ বেশি। অন্যদিকে ২০২২ সালের ৫৫ মেগাওয়াটের সঙ্গে তুলনা করলে পাঁচ বছরের ব্যবধানে লোডশেডিং প্রায় ৪৯ দশমিক ৫ গুণ বেড়েছে।

পিডিবি সারা দিনের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চাহিদা বিবেচনায় গড় লোডশেডিংয়ের হিসাব প্রকাশ করে। অন্যদিকে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) ঘণ্টাভিত্তিক বিদ্যুৎ সরবরাহ, চাহিদা ও ঘাটতির তথ্য প্রকাশ করে। পিজিসিবির তথ্যেও নির্দিষ্ট সময়ে বিদ্যুৎ ঘাটতির বড় চিত্র পাওয়া যায়।

গত ১০ আগস্ট রাত ১টা থেকে ২টার মধ্যে দেশের সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট বলে পিজিসিবির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

উৎপাদন ও চাহিদার ব্যবধান

চলতি ১৬ আগস্টের বিদ্যুৎ চাহিদার পূর্বাভাসেও ঘাটতির আশঙ্কা ছিল। পিজিসিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ওই দিন দিনের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ধরা হয়েছিল ১৫ হাজার ১৮০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদা ১৭ হাজার ৮৫০ মেগাওয়াট।

এর আগের দিন ১৫ আগস্ট প্রকৃত বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ১৫ হাজার ৯১ মেগাওয়াট। বিপরীতে চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ১৯০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ওই দিনও উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান ছিল।

বিজ্ঞাপন

বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চাহিদার এই ব্যবধানের প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় পড়ছে। তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বিশেষ করে শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ বাড়ছে।

শিক্ষকদের চোখেও উদ্বেগ

লোডশেডিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক আমজাদ হোসেন বলেন, কয়েক সপ্তাহ ধরে তীব্র গরমের মধ্যে শ্রেণিকক্ষে বিদ্যুৎ না থাকলে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিকভাবে মনোযোগী রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ফ্যান বন্ধ থাকায় তারা ঘেমে যায় এবং অস্বস্তিতে থাকে।

তাঁর মতে, শিক্ষকরা পাঠদান চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও শিক্ষার্থীদের মনোযোগের বড় একটি অংশ তখন গরম ও বিদ্যুৎ আসার দিকে থাকে। ছোট শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও বেশি দেখা যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় আরেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক জানান, দিনের লোডশেডিংয়ে শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ কমার পাশাপাশি রাতের বিদ্যুৎ বিভ্রাট শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও ঘুমের ওপরও প্রভাব ফেলছে। অনেক শিক্ষার্থী রাতে পড়তে পারছে না, আবার গরমের কারণে ঠিকমতো ঘুমাতেও পারছে না। ফলে পরদিন স্কুলে এসে তারা ক্লান্ত থাকে।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘদিন এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ধারাবাহিকতা, ফলাফল এমনকি শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

সন্তানদের পড়াশোনা নিয়ে দুশ্চিন্তায় অভিভাবকরা

লোডশেডিংয়ের কারণে সন্তানদের পড়াশোনা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন গ্রামীণ এলাকার অভিভাবকরাও। বিদ্যুৎ না থাকায় রাতে পড়াশোনা যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি তীব্র গরমে ঘুমের সমস্যাও তৈরি হচ্ছে। এর ফলে সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় অনেক শিক্ষার্থী ক্লান্ত থাকে।

অভিভাবক এনামুল হাসান বলেন, পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় লোডশেডিংয়ের পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দিনের বড় একটি সময় বিদ্যুৎ থাকে না। কখন বিদ্যুৎ আসবে, তারও নির্দিষ্টতা নেই। ফলে সন্তানদের পড়াশোনা নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় থাকতে হচ্ছে।

তাঁর দাবি, বিদ্যুৎ এলেও স্বস্তি নেই, কারণ কখন আবার চলে যাবে সেই চিন্তা থাকে। বাড়িতে আইপিএস থাকলেও পর্যাপ্ত সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সেটি ঠিকমতো চার্জ করা সম্ভব হয় না। ফলে সন্তানরা পড়তে বসলেই বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।

‘বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই’

দেশের চলমান বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় উৎপাদন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম।

আরও পড়ুন

তিনি বলেন, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে সক্ষমতা রয়েছে, সেটিকে কার্যকরভাবে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বাড়াতে হবে। উৎপাদন বাড়ানোর জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি। একই সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার যে ভর্তুকি দিচ্ছে, তা অব্যাহত রাখার প্রয়োজন রয়েছে।

শামসুল আলমের মতে, সাধারণ মানুষের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের কোনো বিকল্প নেই। সামর্থ্যবান মানুষ ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ বা ডিজেল জেনারেটরের মতো বিকল্প ব্যবস্থা করতে পারলেও দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার মানুষের পক্ষে তা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, গুলশান, ধানমন্ডি বা বারিধারার মতো এলাকার অনেক বাসিন্দার বিকল্প বিদ্যুতের ব্যবস্থা করার সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে বিদ্যুৎ কোনো বিলাসিতা নয়; এটি প্রয়োজনীয় সেবা। তাই তাদের চাহিদা পূরণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ—দুই ক্ষেত্রেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং শুধু দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকেই ব্যাহত করছে না, এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনে। শ্রেণিকক্ষে অস্বস্তি, রাতে পড়াশোনায় বাধা, ঘুমের ঘাটতি এবং পরদিন ক্লান্তি—সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রভাব এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD