ভোলায় ৪৮৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা, তবু লোডশেডিং

ভোলা জেলায় রয়েছে গ্যাসের বড় মজুত, পাশাপাশি রয়েছে একাধিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র। জেলার মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৪৮৫ মেগাওয়াট। অথচ জেলার সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ১২০ মেগাওয়াটের মধ্যে। চাহিদার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি উৎপাদন সক্ষমতা থাকার পরও প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ছেন ভোলার মানুষ। এতে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বিপাকে পড়ছেন ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তারা।
বিজ্ঞাপন
ভোলায় বর্তমানে প্রায় ৪৫০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার দুটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে বোরহানউদ্দিন উপজেলার দক্ষিণ কুতুবা এলাকায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) মালিকানাধীন ভোলা-১ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২২৫ মেগাওয়াট। একই উপজেলায় রয়েছে নূসতান নামের ২২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ডুয়েল-ফুয়েল কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্ল্যান্ট।
এ ছাড়া ভোলা শহরের খেয়াঘাট এলাকায় রয়েছে ৪০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় কেন্দ্রটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এটি পুনরায় চালু করা হলে জেলায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৪৮৫ মেগাওয়াটে।
অন্যদিকে, ভোলার সাত উপজেলার মধ্যে ছয়টিতে বিদ্যুৎ বিতরণ করছে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো) ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। দুই সংস্থার আওতায় গ্রাহক সংখ্যা পাঁচ লাখের বেশি। ওজোপাডিকোর দৈনিক বিদ্যুৎ চাহিদা ২২ থেকে ৩০ মেগাওয়াট এবং পল্লী বিদ্যুতের চাহিদা ৭০ থেকে ৯০ মেগাওয়াট।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
কিন্তু উৎপাদন সক্ষমতা ও স্থানীয় চাহিদার মধ্যে এমন বিশাল ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ না পাওয়ায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিতরণকারী সংস্থাগুলো।
ভোলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক শাহ মো. রাজ্জাকুর রহমান বলেন, “জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় আমরা বাধ্য হয়েই লোডশেডিং দিচ্ছি। বর্তমানে দিনে ও রাতে মিলিয়ে প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ লোডশেডিং রাখতে হচ্ছে।”
বিজ্ঞাপন
ওজোপাডিকোর কর্মকর্তারাও বলছেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় তাদের আওতাধীন এলাকাতেও লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। ফলে শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
দেশের অনেক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র যেখানে জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ব্যাহত করছে, সেখানে ভোলার চিত্র একেবারেই ভিন্ন। জেলার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসের সরবরাহ রয়েছে। বরং স্থানীয় চাহিদা সীমিত হওয়ায় ভোলার গ্যাসের একটি বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের হিসাবে, ভোলায় বর্তমানে প্রায় ১ দশমিক ৭৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুত রয়েছে। ভবিষ্যতে এ মজুতের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
বিজ্ঞাপন
১৯৯৫ সালে ভোলায় প্রথম শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে বাপেক্স। ২০০৯ সালে ওই ক্ষেত্র থেকে গ্যাস উৎপাদন শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালে ভোলা নর্থ এবং ২০২৩ সালে ইলিশা গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলেও এখনো এসব ক্ষেত্র থেকে উৎপাদন শুরু হয়নি।
বর্তমানে ভোলার গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মোট দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১২২ মিলিয়ন ঘনফুট। স্থানীয় চাহিদা সীমিত এবং জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন না থাকায় উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বর্তমানে শাহবাজপুরসহ উৎপাদনে থাকা ক্ষেত্রগুলো থেকে প্রতিদিন প্রায় ৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন ও সরবরাহ করা হচ্ছে। বাকি গ্যাসের একটি অংশ অব্যবহৃত বা উদ্বৃত্ত থাকছে।
ভোলা থেকে জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন লাইনে গ্যাস নেওয়ার উদ্যোগ না থাকায় এখানকার গ্যাস মূলত স্থানীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনেই ব্যবহার হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ভোলা থেকে জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হবে না—এমন বিবেচনায় এখন পর্যন্ত এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
বিজ্ঞাপন
তবে ভোলায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাদের প্রশ্ন, যে জেলায় গ্যাসের মজুত রয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে এবং স্থানীয় চাহিদার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে, সেই জেলাতেই কেন লোডশেডিং থাকবে?
ইলিশা এলাকার বরফকলের স্বত্বাধিকারী মোর্শেদ বলেন, “ভোলার বিদ্যুৎ দিয়ে অন্য জেলা চলে। অথচ ভোলায় তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে আমাদের বরফকলের ব্যবসা এখন বন্ধ হওয়ার পথে। বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।”
লালমোহনের ব্যবসায়ী সাকিল বলেন, “লোডশেডিং এখন প্রতিদিনের নিয়মে পরিণত হয়েছে। আমাদের পুরো ব্যবসাটাই বিদ্যুৎনির্ভর। যে হারে লোডশেডিং হচ্ছে, তাতে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলা ছাড়া উপায় থাকবে না।”
বিজ্ঞাপন
ভোলা শহরের মুসলিমপাড়া এলাকার বাসিন্দা জেসমিন বলেন, “ভোলা থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়া হচ্ছে, অথচ ভোলার মানুষকেই লোডশেডিংয়ে থাকতে হচ্ছে। এটা আমাদের জন্য খুবই হতাশার। এর আগেও ভোলাবাসী অনেক আন্দোলন করেছে, তবুও লোডশেডিং সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।”
সচেতন নাগরিকদের মতে, ভোলার গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে আগে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করা জরুরি। একই সঙ্গে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে ভোলার বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো হলে লোডশেডিং অনেকটাই কমানো সম্ভব।
তাদের দাবি, ভোলার ক্ষেত্রে উৎপাদন সক্ষমতার ঘাটতি নয়, বরং বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাই বড় সমস্যা। তাই দ্রুত সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়িয়ে স্থানীয় মানুষের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।








