ঢাবির পদচারী সেতুই এখন নারী শিক্ষার্থীদের আতঙ্ক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি সুফিয়া কামাল হলের পাশের পদচারী সেতু শিক্ষার্থীদের নিরাপদে সড়ক পারাপারের জন্য নির্মাণ করা হলেও বর্তমানে সেটিই নারী শিক্ষার্থীদের কাছে নিরাপত্তার উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। জরাজীর্ণ অবকাঠামো, পর্যাপ্ত আলোর অভাব এবং বহিরাগত, ভবঘুরে ও মাদকসেবীদের আনাগোনায় সেতুটি ব্যবহার করতে ভয় পাচ্ছেন অনেক শিক্ষার্থী।
বিজ্ঞাপন
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশেষ করে বিকেলের পর সেতু এলাকায় বহিরাগতদের আনাগোনা বেড়ে যায়। সেখানে হয়রানি ও ছিনতাইয়ের আশঙ্কাও রয়েছে। সম্প্রতি এক নারী শিক্ষার্থী হয়রানির শিকার হওয়ার বিষয়টিও সংশ্লিষ্টদের কাছে তুলে ধরা হয়েছে।
জরাজীর্ণ সেতুতে বাড়ছে নিরাপত্তা শঙ্কা
শিক্ষার্থীরা জানান, পদচারী সেতুটির সিঁড়িসহ বিভিন্ন অংশ দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিগ্রস্ত। কোথাও ভাঙন দেখা দিয়েছে, আবার কোথাও অবকাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মোছা. আছিয়া খাতুনের অভিযোগ, সেতুটি এখন বখাটে ও মাদকসেবীদের আড্ডার জায়গায় পরিণত হয়েছে। বিকেলের পর বহিরাগতদের উপস্থিতি বাড়ে এবং সিঁড়িতে বসে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে নারী শিক্ষার্থীদের আপত্তিকর মন্তব্য শুনতে হয় বলে জানান তিনি।
তার মতে, পর্যাপ্ত আলো ও সিসিটিভি নজরদারি না থাকায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়ছে।
দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী তাকিয়া তাসনিমও সন্ধ্যার পর সেতুটি ব্যবহার করাকে আতঙ্কের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্য, সেতু ও আশপাশের এলাকা অন্ধকার থাকায় সেখানে ভবঘুরে ও মাদকসেবীদের আড্ডা দেখা যায়। শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন ও ব্যাগ ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি জানান।
বিজ্ঞাপন
‘ভয়েই কখনো ওই ব্রিজে যাইনি’
সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী আসিয়া আয়াত জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছর ধরে পড়াশোনা করলেও নিরাপত্তার কারণে তিনি ওই পদচারী সেতু ব্যবহার করেননি।
তার ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তার দাবি জানিয়ে আসছেন। কয়েকজন নারী শিক্ষার্থী সেখানে অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ বা হয়রানির শিকার হয়েছেন বলেও শুনেছেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
ফলে নিরাপদে সড়ক পারাপারের জন্য নির্মিত অবকাঠামোটিই এখন অনেক শিক্ষার্থীর কাছে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
সেতু সরিয়ে নেওয়ার দাবি শিক্ষার্থীদের
কবি সুফিয়া কামাল হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক রুকু খাতুন জানিয়েছেন, তারা সেতুটি সংস্কারের পরিবর্তে পুরোপুরি অপসারণের দাবি জানাচ্ছেন। তার মতে, হলের শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন কার্যক্রমে সেতুটির তেমন ব্যবহার নেই। বরং এখানে ভাসমান মানুষ ও বহিরাগতদের অবস্থানের কারণে হলের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ছে।
বিজ্ঞাপন
এ বিষয়ে সিটি করপোরেশন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ এবং চিঠি দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ডাকসুর তিন দফা দাবি
শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গত ২৭ জুলাই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেন ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য সর্ব মিত্র চাকমা ও আনাস ইবনে মুনির।
বিজ্ঞাপন
আবেদনে তিনটি প্রধান দাবি জানানো হয়— ১. ঝুঁকিপূর্ণ পদচারী সেতুটি অপসারণ করা। ২. দ্রুতগতির যানবাহন চলাচলকারী সড়কে নিরাপদ ক্রসিং ও যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা। ৩. রাতে সড়ক পারাপারের স্থানটি আলোকিত করতে পর্যাপ্ত ল্যাম্পপোস্ট স্থাপন করা।
আবেদনে গত ২৫ জুলাই রাতে অন্ধকারের সুযোগে এক নারী শিক্ষার্থী হয়রানির শিকার হওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়।
ডাকসুর সদস্য সর্ব মিত্র চাকমা বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো নিয়ে ডাকসু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তার মতে, ডাকসুর মূল কাজ শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো তুলে ধরা ও দাবি জানানো; বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
বিজ্ঞাপন
বিকল্প নকশার প্রস্তাবও রয়েছে
শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে শুধু সেতু অপসারণ নয়, এটি রাখা হলে নতুনভাবে নির্মাণের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
সর্ব মিত্র চাকমার ভাষ্য অনুযায়ী, সেতুটি এমনভাবে নির্মাণ করা যেতে পারে, যাতে এটি সরাসরি কবি সুফিয়া কামাল হল থেকে কার্জন হল পর্যন্ত সংযোগ তৈরি করে। এতে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় চলাচলও সহজ হবে এবং নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া সম্ভব হবে।
বিজ্ঞাপন
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্য
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ইসরাফিল রতন বলেন, শিক্ষার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিনি ও ছাত্র প্রতিনিধিরা সিটি করপোরেশনে গিয়ে বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
তার ভাষ্য, এটি সরকারি অবকাঠামো-সংক্রান্ত বিষয় হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়। ক্যাম্পাসের আশপাশে ফায়ার সার্ভিস, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, পার্কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থাকায় পুরো এলাকার ব্যবস্থাপনা বিবেচনা করেও সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
তবে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আবারও সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যোগাযোগের কথা জানিয়েছেন তিনি।
‘হুটহাট করে ওভারব্রিজ ভাঙা সম্ভব নয়’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রাজীব খাদেম জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রস্তাবের কাগজপত্র আবারও পর্যালোচনা করা হবে।
তিনি বলেন, একটি পদচারী সেতু ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে নেওয়া যায় না। সেতুটি অপসারণের পর কোনো দুর্ঘটনা বা বিতর্কিত পরিস্থিতি তৈরি হলে তার দায় ও প্রভাবও বিবেচনা করতে হবে।
সিটি করপোরেশন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। ফলে শিক্ষার্থীদের দাবির বাস্তবায়নে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
নিরাপদ সড়ক পারাপারের উদ্দেশ্যে নির্মিত একটি পদচারী সেতু যদি উল্টো শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেটির কার্যকারিতা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। এখন শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের সমস্যাটির দ্রুত ও কার্যকর সমাধান করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।








