লোডশেডিংয়ে অন্ধকার ইবি, মোমবাতির আলোয় পড়ছেন শিক্ষার্থীরা

তীব্র লোডশেডিংয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থীরা। সেমিস্টার ও ফাইনাল পরীক্ষা চলার মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মোমবাতি ও মোবাইলের ফ্ল্যাশের আলোয় পড়াশোনা করতে হচ্ছে তাদের। তীব্র গরমে ফ্যান বন্ধ থাকায় পড়াশোনার পাশাপাশি স্বাভাবিক জীবনযাপনও কঠিন হয়ে উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কয়েক দিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের শেখপাড়া, আনন্দনগর, শান্তিডাঙ্গা, শাহ আজিজ পকেট গেট, লালন পকেট গেট ও মেইন গেট এলাকায় লোডশেডিং তুলনামূলক বেশি হচ্ছে। কোনো কোনো দিন ২৪ ঘণ্টায় কয়েক ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না বলেও দাবি করেছেন তারা।
মোমবাতির আলোয় পরীক্ষার প্রস্তুতি
সাদ্দাম হোসেন হলে গিয়ে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ না থাকায় কয়েকজন শিক্ষার্থী মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়াশোনা করছেন। কারও সামনে বই-খাতা, আবার কেউ মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে নোট ও পিডিএফ পড়ার চেষ্টা করছেন।
বিজ্ঞাপন
পরদিন পরীক্ষা থাকলেও বিদ্যুৎ আসার অপেক্ষায় বসে থাকার সুযোগ নেই তাদের। তাই বাধ্য হয়ে বিকল্প আলো ব্যবহার করে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।
সাদ্দাম হোসেন হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান জানান, তার মাস্টার্সের ফাইনাল পরীক্ষা সামনে। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনায় বড় ধরনের সমস্যা হচ্ছে। বাইরে থেকে মোমবাতি কিনে এনে পড়াশোনা করতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
তার দাবি, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন বিভাগে পরীক্ষা চলমান থাকায় বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিদ্যুৎ না থাকলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সুবিধার্থে হলগুলোতে জেনারেটর ব্যাকআপ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
আরেক শিক্ষার্থী সাকিব বলেন, সেমিস্টার পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইলের ফ্ল্যাশ দিয়ে পিডিএফ পড়াও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে মোমবাতির আলোতেই পড়াশোনা করতে হচ্ছে। এতে পড়াশোনার পাশাপাশি ঘুমেরও ব্যাঘাত ঘটছে।
রাতের লোডশেডিংয়ে ঘুমও ব্যাহত
শিক্ষার্থী মিশুক শাহরিয়ার জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের একটি ছাত্রাবাসে থাকা তার এক জুনিয়রের পরীক্ষা থাকায় লোডশেডিংয়ের কারণে তার কক্ষে এসে পড়তে হয়েছিল। কিন্তু সেখানেও বিদ্যুৎ ছিল না।
বিজ্ঞাপন
তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাত ১০টা থেকে ১টা পর্যন্ত প্রায় তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাভাবিক ঘুমের সময়সূচিও ব্যাহত হয়েছে। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হওয়ায় ক্লাসেও যেতে পারেননি তিনি।
শিক্ষার্থীদের মতে, দীর্ঘ লোডশেডিং এখন শুধু পড়াশোনার সমস্যা নয়; এর প্রভাব তাদের শারীরিক বিশ্রাম ও দৈনন্দিন জীবনেও পড়ছে।
ইন্টারনেট, ল্যাপটপ ও পানির মোটরেও সমস্যা
বিজ্ঞাপন
বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন মেস ও ছাত্রাবাসে থাকা শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ না থাকলে ইন্টারনেট ব্যবহারে সমস্যা হয়। অনেকের মোবাইল, ল্যাপটপ ও অন্যান্য ডিভাইসের চার্জ শেষ হয়ে যায়। ফলে অনলাইন ক্লাস, কুইজ, অ্যাসাইনমেন্ট এবং পড়াশোনার প্রয়োজনীয় ডিজিটাল উপকরণ ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে।
শিক্ষার্থী পরশ প্রভা শিকদার জানান, তাদের মেসে আইপিএস বা জেনারেটরের ব্যবস্থা নেই। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় রাত জেগে থাকতে হয়।
তার অভিযোগ, বিদ্যুৎ চলে গেলে মোবাইল নেটওয়ার্কেও সমস্যা দেখা দেয়। ফলে অনলাইনের প্রয়োজনীয় ক্লাস, কুইজ ও অ্যাসাইনমেন্ট সময়মতো সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিজ্ঞাপন
ইমতিয়াজ জর্ডান বলেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার বড় একটি অংশ এখন ল্যাপটপ ও ইন্টারনেটনির্ভর। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে ডিভাইসের চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ায় পড়াশোনার পরিকল্পনা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
এ ছাড়া বিদ্যুৎ না থাকায় পানির মোটরও চালানো সম্ভব হয় না। ফলে গোসল, পানি সংগ্রহসহ দৈনন্দিন কাজেও বাড়তি ভোগান্তি তৈরি হচ্ছে।
২৪ ঘণ্টায় ৭-৮ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ নেই, দাবি শিক্ষার্থীর
বিজ্ঞাপন
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ এক ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন, কোনো কোনো দিন ২৪ ঘণ্টায় সাত-আট ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েক দিন ধরে দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং চলছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তার মতে, স্বাভাবিক সময়েও বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা লোডশেডিং হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে শেখপাড়া, আনন্দনগর ও শান্তিডাঙ্গা এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে মানববন্ধনের ঘোষণাও দেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
ক্যাম্পাসের বাইরের বিদ্যুৎ সরবরাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণে নেই
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্য, ক্যাম্পাসসংলগ্ন আবাসিক এলাকাগুলোর বিদ্যুৎ সরবরাহ সরাসরি তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। ফলে এসব এলাকায় লোডশেডিং কমানোর ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ সীমিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী এ কে এম শরিফ বলেন, ক্যাম্পাসের আশপাশের এলাকাগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন নয়। তাই ওই এলাকার বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়।
বিজ্ঞাপন
তবে ক্যাম্পাসের ভেতরে লোডশেডিং তুলনামূলক কম বলে দাবি করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ক্যাম্পাসে যতটা সম্ভব সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে বলেও জানান।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, জ্বালানি তেলের কারণে কখনো কখনো জেনারেটরের কার্যক্ষমতায় সীমাবদ্ধতা দেখা দেয়। সাধারণত বিদ্যুৎ চলে গেলে প্রায় ১০ মিনিটের মধ্যে জেনারেটর চালু করা হয়। অফিস চলাকালে এ সময় আরও কমে প্রায় পাঁচ মিনিটে নামিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়।
তবে বিভিন্ন হলে অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক সংযোগ থাকায় জেনারেটর থেকে সব জায়গায় পর্যাপ্ত ব্যাকআপ দিতে কিছুটা সমস্যা হয় বলেও জানান তিনি।
সৌরবিদ্যুৎ ও জেনারেটর নিয়ে ভাবছে প্রশাসন
শাহ আজিজুর রহমান হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. এটিএম মিজানুর রহমান বলেন, বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট শুধু ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা নয়, এটি জাতীয় পর্যায়ের সংকট।
তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়টি অপেক্ষাকৃত প্রত্যন্ত এলাকায় হওয়ায় নিজস্ব আয়ের সুযোগ সীমিত এবং সরকারি অর্থায়নের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে অর্থসংকটের কারণে অনেক সময় চাইলেও তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না।
তবে শিক্ষার্থীদেরও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, হল থেকে বের হওয়ার সময় অনেকেই বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক যন্ত্র চালু রেখে যান। আবার বৈদ্যুতিক চুলা, ফ্রিজসহ বেশি বিদ্যুৎ খরচ হয় এমন যন্ত্র ব্যবহারের কারণেও চাপ বাড়তে পারে।
ক্যাম্পাসে বিদ্যুৎ চলে গেলে অন্ধকার কমাতে জেনারেটরের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান তিনি।
পিডিবির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ
বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত প্রধান প্রকৌশলী (মেকানিক্যাল) আব্দুল মালেক জানান, বিদ্যুৎ সংকট বর্তমানে জাতীয় সমস্যা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ বিষয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে।
আরও পড়ুন
তার বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের ঘাটতি থাকলেও খুলনা ও কুষ্টিয়া—দুটি গ্রিড থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। কোনো একটি গ্রিডে সমস্যা হলে অন্য গ্রিড থেকে সরবরাহ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
কয়েক মিনিট পরপর বিদ্যুৎ চলে যাওয়া ও ফিরে আসার বিষয়ে তিনি জানান, অনেক ক্ষেত্রে ফিডার পরিবর্তনের সময় সাময়িকভাবে লাইনে বিভ্রাট তৈরি হয়।
আশপাশের এলাকায় চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেন বলেন, ক্যাম্পাসের ভেতরের পরিস্থিতি তুলনামূলক সহনীয় হলেও আশপাশে বসবাসকারী শিক্ষার্থীরা অসহনীয় ভোগান্তির মধ্যে রয়েছেন।
তিনি জানান, এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত রিজিওনাল ডিরেক্টরের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ক্যাম্পাসসংলগ্ন এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১০ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৩ মেগাওয়াট।
শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ বিবেচনায় অন্তত অর্ধেক চাহিদা পূরণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
সেমিস্টার ও ফাইনাল পরীক্ষা চলাকালে এমন দীর্ঘ লোডশেডিং শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি দ্রুত উন্নত না হলে পরীক্ষার প্রস্তুতি, ঘুম, অনলাইন শিক্ষাকার্যক্রম এবং দৈনন্দিন জীবন—সব ক্ষেত্রেই ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শিক্ষার্থীরা।








