ইডেনের হল-ক্যান্টিনে রান্না হয় পচা সবজি, নেই বিশুদ্ধ পানি

রাজধানীর ইডেন মহিলা কলেজের আবাসিক হল ও ক্যান্টিনের খাবারের মান নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কোথাও বাসি খাবার, কোথাও পোকাযুক্ত খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। এমনকি নিম্নমানের ও পচা সবজি রান্নার অভিযোগও রয়েছে। পাশাপাশি কলেজের মূল ক্যান্টিনে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা না থাকায় বোতলজাত পানি কিনে পান করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
বিজ্ঞাপন
শিক্ষার্থীদের আরও অভিযোগ, আবাসিক হলগুলোতে নিয়মিত গ্যাস না থাকায় অনেক সময় রান্না করা সম্ভব হয় না। ফলে বাধ্য হয়ে বাইরে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে তাদের। দীর্ঘদিন নিম্নমানের খাবার খাওয়ার কারণে অনেকে পেটের পীড়া, গ্যাস্ট্রিকসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন বলেও জানিয়েছেন তারা।
১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ইডেন মহিলা কলেজে বর্তমানে প্রায় ২২ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। এর মধ্যে ছয়টি আবাসিক হলে থাকেন প্রায় ৬ হাজার শিক্ষার্থী। ছয়টি আবাসিক হলে ছয়টি ক্যান্টিন থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে চালু রয়েছে পাঁচটি। এর বাইরে কলেজের মূল ক্যান্টিন নামে আরও একটি ক্যান্টিন রয়েছে।
সরেজমিনে মূল ক্যান্টিনে পান করার উপযোগী বিশুদ্ধ পানির স্থায়ী ব্যবস্থা দেখা যায়নি। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, আগে সেখানে পানির ফিল্টার থাকলেও সেটির নিয়মিত পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো না। বর্তমানে সেই ফিল্টারও নেই।
বিজ্ঞাপন
ফলে ক্যান্টিনে খাবার খেতে আসা শিক্ষার্থীদের বোতলজাত পানি কিনে পান করতে হচ্ছে। এতে প্রতিদিন অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি নিরাপদ পানি পাওয়া নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে তাদের।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রায় দুই মাস আগে ক্যান্টিনের পানির ফিল্টারে একটি বিড়াল পড়ে যায়। বিষয়টি জানার পরও ফিল্টারটি যথাযথভাবে পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত না করে পানি ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ তাদের। এতে পানির নিরাপত্তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
শুধু মূল ক্যান্টিন নয়, আবাসিক হলগুলোর খাবারের মান নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, কখনো খাবারের মধ্যে পোকা পাওয়া যায়, আবার কখনো বাসি খাবার পরিবেশন করা হয়। নিম্নমানের সবজি ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
আবাসিক শিক্ষার্থী ও নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহ-ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক সিনহা নিশাত বলেন, একদিন হলের ক্যান্টিন থেকে আলু ভর্তা কিনে খাওয়ার সময় তিনি তাতে পোকা দেখতে পান। এরপর থেকে তিনি আর হলের ক্যান্টিনে খাবার খাননি বলে জানান।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, আবাসিক হলের বড় একটি অংশের শিক্ষার্থী প্রতিদিন ক্যান্টিনের খাবারের ওপর নির্ভরশীল। তাই খাবারের মান খারাপ হলে বিষয়টি শুধু ভোগান্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি তাদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
সম্প্রতি ইডেন মহিলা কলেজের জেবুন্নেছা হলের ক্যান্টিন পরিদর্শন করে পচা পেঁপে ও পচা সবজি রান্নার প্রমাণ পাওয়ার দাবি করেছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কনজ্যুমার ইয়ুথ বাংলাদেশ (সিওয়াইবি) ইডেন কলেজ শাখা।
বিজ্ঞাপন
সংগঠনটির সভাপতি নাসরিন আক্তার অভিযোগ করেন, ক্যান্টিনগুলোর রান্নাঘরের পরিবেশ অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। পরিদর্শনের সময় পচা ও বাসি সবজি, ফ্রিজে রাখা খাবার এবং নিষিদ্ধ ইস্ট বেকারের খাদ্যপণ্য পাওয়ার দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, জেবুন্নেছা ও খোদেজা খাতুন হলের ক্যান্টিনের পরিবেশ তুলনামূলকভাবে বেশি খারাপ ছিল।
ইডেন মহিলা কলেজের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন অপরাজেয়ের পক্ষ থেকেও মূল ক্যান্টিনে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সংগঠনটির দাবি, বিভিন্ন বিভাগে একাধিকবার আবেদনের পর পানির ফিল্টার বসানো হলেও মূল ক্যান্টিনে এখনো স্থায়ী ব্যবস্থা করা হয়নি।
বিজ্ঞাপন
শিক্ষার্থীরা বলছেন, ক্যান্টিন ও আবাসিক হলের খাবারের মান নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। রান্নার উপকরণের মান যাচাই, রান্নাঘর পরিষ্কার রাখা এবং খাবার পরিবেশনের আগে তা পরীক্ষা করার ব্যবস্থাও কার্যকর করতে হবে।
পাশাপাশি মূল ক্যান্টিনে স্থায়ীভাবে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
জেবুন্নেছা হলের ক্যান্টিন পরিচালক নাসির উদ্দিন বলেন, প্রতিদিন রান্না শেষে রাতে ময়লা ডাস্টবিনে ফেলা হয়। যেদিন ক্যান্টিন পরিদর্শন করা হয়েছিল, সেদিন বৃষ্টির কারণে রান্নাঘর কিছুটা অপরিষ্কার ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
পচা পেঁপে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেটি রান্নার জন্য রাখা ছিল না; ময়লার ঝুড়িতে ছিল। তবে ফ্রিজে সমস্যা থাকার বিষয়টি স্বীকার করে তা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি।
জেবুন্নেছা হলের সুপার মোস্তারি সালেহীন বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর ক্যান্টিন কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছে। রান্নাঘরের ফ্লোরের টাইলসসহ প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ দ্রুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হলে কয়েকটি পানির ফিল্টার রয়েছে এবং পানির সমস্যা সমাধানেও আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি।
খোদেজা হলের ক্যান্টিন পরিচালক মো. নাসির বলেন, লাকড়ি দিয়ে রান্নার কারণে রান্নাঘর সবসময় পরিষ্কার রাখা কঠিন হয়। তবে ফ্রিজের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে এবং কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রান্না করা খাবার অবিক্রীত থাকলে তা ফ্রিজে রাখতে হয় বলেও জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে ১১তলা হলের সুপার আসমা সুলতানা জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং কয়েকবার ক্যান্টিন পরিদর্শন করা হয়েছে। তার দাবি, বর্তমানে পরিবেশের কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
হলটির সুপার দিল আফরোজ বলেন, খাবারের সমস্যা সমাধানে কাজ চলছে এবং আগের তুলনায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। সপ্তাহে একবার ক্যান্টিন পরিদর্শন করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও হেলথ অ্যান্ড হোপের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থ হওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রান্না এবং পচা বা মানহীন খাবার।
বিজ্ঞাপন
তার মতে, দীর্ঘদিন অস্বাস্থ্যকর খাবার খেলে পেটের পীড়া, গ্যাস্ট্রিকসহ বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খাবারের মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস করা উচিত নয়।
ইডেন মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ ড. শামিম আরা বেগম বলেন, ১১তলা হলের ক্যান্টিন পরিদর্শনের সময় অপরিষ্কার পরিবেশে রান্না করতে দেখা গেছে। এ কারণে ক্যান্টিন ছেড়ে দেওয়ার নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
অন্য কোনো হল থেকেও অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের ডেকে সতর্ক করা হয় বলে জানান তিনি। পাশাপাশি সিওয়াইবি সদস্যদের নিয়মিত তদারকি করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
অধ্যক্ষের দাবি, বর্তমানে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। পানির ফিল্টারসহ যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলোও পর্যায়ক্রমে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, অভিযোগ ও আশ্বাসের মধ্যে বিষয়টি সীমাবদ্ধ না রেখে ক্যান্টিন ও আবাসিক হলের খাবারের মান, রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা এবং নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নিয়মিত ও কার্যকর নজরদারি চালু করা হবে।







