খালেদা জিয়ার নাম থাকায় বদলে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নকশা

ময়মনসিংহের ত্রিশালে অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দুই দশক পেরিয়ে ২১ বছরে পা দিয়েছে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত এলাকায় প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল ২০০৫ সালের ১ মার্চ। পরের বছর ২০০৬ সালের ২৫ মে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধন হয়।
বিজ্ঞাপন
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও উদ্বোধন—দুটিই করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। ফলে সংশ্লিষ্ট ফলকগুলোতে তার নাম ছিল। তবে পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এসব স্মারকের গুরুত্ব কমে যায় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা ও অবকাঠামোগত পরিকল্পনায় পরিবর্তনের ফলে ঐতিহাসিক ভিত্তিপ্রস্তর ও নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত বটগাছটি ক্যাম্পাসের বাইরে পড়ে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের দাবি, রাজনৈতিক বিবেচনায় তৎকালীন পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা হয়েছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জমির পরিমাণ, যোগাযোগব্যবস্থা ও ক্যাম্পাসের সার্বিক সুবিধা বিবেচনা করেই বিভিন্ন সময়ে নকশা ও সীমানায় পরিবর্তন এসেছে।
ভিত্তিপ্রস্তরের পাশেই হওয়ার কথা ছিল প্রধান ফটক
বিজ্ঞাপন
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠার সময় ক্যাম্পাসের জমির পরিমাণ ছিল প্রায় সাড়ে ১৫ একর। তখন ভিত্তিপ্রস্তরের পাশ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

পরবর্তীতে সেই পরিকল্পনায় পরিবর্তন এনে ফটকটি অন্য স্থানে নির্মাণ করা হয়। ভিত্তিপ্রস্তরের পাশ দিয়ে থাকা রাস্তা বন্ধ করে সেখানে নির্মাণ করা হয় শিউলিমালা হল। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে সম্প্রসারণ করা হলেও পশ্চিম দিকে ভিত্তিপ্রস্তরসংলগ্ন জমি অধিগ্রহণ করা হয়নি। ফলে ক্যাম্পাসের সীমানা বাড়লেও ঐতিহাসিক ভিত্তিপ্রস্তরটি বাইরে থেকে যায়।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের পরিচালক মো. হাফিজুর রহমানের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠার সময় জমি কম থাকায় প্রধান ফটকটি এক পাশে হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার সুবিধার কথা বিবেচনা করে পরে ফটকটি তুলনামূলক মাঝামাঝি স্থানে নির্মাণ করা হয়।
বিজ্ঞাপন
তার দাবি, তৎকালীন সময়ে বিএনপিপন্থি শিক্ষকরা পরিকল্পনার বিরোধিতা করলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি আমলে নেয়নি। পরবর্তী সময়ে জমি অধিগ্রহণ করা হলেও ভিত্তিপ্রস্তরের পাশের অংশ অধিগ্রহণ না হওয়ায় সেটি ক্যাম্পাসের বাইরে থেকে যায়।
ক্যাম্পাসের বাইরেই নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত বটগাছ
শুধু ভিত্তিপ্রস্তর নয়, এর পাশের ঐতিহাসিক বটগাছটিও বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার বাইরে। স্থানীয়ভাবে এটি ‘নজরুল বটবৃক্ষ’ নামে পরিচিত।
বিজ্ঞাপন
প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, প্রায় ১১২ বছর আগে কিশোর কাজী নজরুল ইসলাম আসানসোল থেকে ত্রিশালে এসে দরিরামপুর ইংরেজি হাইস্কুলে ভর্তি হন। স্কুলে যাওয়ার ফাঁকে তিনি নামাপাড়ার শুকনি বিলের পাড়ে থাকা একটি বটগাছে উঠে বাঁশি বাজাতেন বলে স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে গল্প প্রচলিত রয়েছে।
এই বটগাছকে ঘিরে ত্রিশালের মানুষের আবেগও দীর্ঘদিনের। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর বটতলা ও ভিত্তিপ্রস্তরটি ক্যাম্পাসের ঐতিহাসিক অংশ হিসেবে সংরক্ষণের দাবি উঠে আসছে।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ
বিজ্ঞাপন
বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও রাজনৈতিকভাবে বিএনপিপন্থি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অভিযোগ, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর খালেদা জিয়ার নামসংবলিত ভিত্তিপ্রস্তর ও উদ্বোধনী ফলক যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।
তাদের অভিযোগ, ভিত্তিপ্রস্তরের আশপাশে ময়লা-আবর্জনা ফেলে রাখা হতো। পুরোনো প্রশাসনিক ভবনের সামনে থাকা উদ্বোধনী ফলকও বিভিন্ন সময়ে ফুলের টব ও অন্যান্য সামগ্রী দিয়ে আড়াল করে রাখা হয়েছিল।

তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুটি ফলকই পরিমার্জন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, ভিত্তিপ্রস্তরটি ক্যাম্পাসের বাইরে থাকায় দীর্ঘদিন এর আশপাশে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকত। তার দাবি, আগের সরকারের সময়ে নানা বাধা সত্ত্বেও তারা কয়েকবার ভিত্তিপ্রস্তর পরিষ্কার ও রং করেছেন।
তিনি ঐতিহাসিক ভিত্তিপ্রস্তর ও বটগাছকে ক্যাম্পাসের ভেতরে এনে সংরক্ষিত স্থান তৈরির দাবি জানান।
‘ভিত্তিপ্রস্তর কোনো ব্যক্তি বা দলের সম্পত্তি নয়’
বিজ্ঞাপন
বিশ্ববিদ্যালয়ের সদস্য সচিব মারুফ হাসান বলেন, ভিত্তিপ্রস্তরটি কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।
তার মতে, যে স্থান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেটি ক্যাম্পাসের বাইরে থাকা দুঃখজনক। তিনি সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে ভিত্তিপ্রস্তর ও বটগাছকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ হওয়া উচিত।
বিজ্ঞাপন
রাস্তা বন্ধ করে হল নির্মাণের অভিযোগ
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইমদাদুল হুদা বলেন, ভিত্তিপ্রস্তরের পাশ দিয়ে আগে একটি রাস্তা ছিল। সেখান থেকে ভিত্তিপ্রস্তরটি সহজেই দেখা যেত। পরে ওই রাস্তা বন্ধ করে সেখানে শিউলিমালা হল নির্মাণ করা হয়। এরপর সীমানাপ্রাচীরও এমনভাবে নির্মাণ করা হয় যে ভিত্তিপ্রস্তরটি ক্যাম্পাসের বাইরে পড়ে যায়।
তার ভাষ্য, জমিটি অধিগ্রহণ করা সম্ভব হলে ভিত্তিপ্রস্তরসংলগ্ন অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। পাশাপাশি হলের পাশ দিয়ে বিকল্প রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে
বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) ও সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান বলেন, ভিত্তিপ্রস্তরটি খালেদা জিয়া স্থাপন করেছিলেন এবং তার সংশ্লিষ্টতার কারণে রাজনৈতিকভাবে সেটিকে ক্যাম্পাসের বাইরে রাখা হয়েছিল বলে তিনি মনে করেন।
আরও পড়ুন
তিনি জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। জমি অধিগ্রহণ সম্ভব হলে ভিত্তিপ্রস্তরটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার ভেতরে নেওয়া হবে।
উপাচার্যের পরিকল্পনায় বটতলা ও ভিত্তিপ্রস্তর
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মোশারফ হোসেন জানান, ভিত্তিপ্রস্তরটি বর্তমানে ক্যাম্পাসের সীমানার বাইরে রয়েছে। সেটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার ভেতরে নেওয়ার পরিকল্পনা প্রশাসনের রয়েছে।

তিনি বলেন, ঐতিহাসিক বটতলাটিও একই এলাকায় রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও নজরুলের স্মৃতির সঙ্গে স্থানটির সম্পর্ক বিবেচনা করে ভিত্তিপ্রস্তর ও বটতলা—দুটোকেই ক্যাম্পাসের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রশাসন সেই অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নিচ্ছে।
ইতিহাস সংরক্ষণেই গুরুত্ব সংশ্লিষ্টদের
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের সঙ্গে খালেদা জিয়ার ভূমিকা, ঐতিহাসিক ভিত্তিপ্রস্তর এবং নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত বটতলা—সবকিছুই জড়িয়ে রয়েছে। রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ মনে করছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার স্মারকগুলোকে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে রেখে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে ঐতিহাসিক ভিত্তিপ্রস্তর ও বটতলাকে মূল ক্যাম্পাসের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। একই সঙ্গে সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে স্থান দুটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।








