‘আপসহীন নেত্রী’ খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন আজ

বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন আজ শনিবার (১৫ আগস্ট)। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে রাজপথের আন্দোলন, সরকার পরিচালনা থেকে কারাবাস—বিভিন্ন রাজনৈতিক অধ্যায় পেরিয়ে দেশের রাজনীতিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেন। রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের অবস্থানে অটল থাকার কারণে বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি পান।
বিজ্ঞাপন
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পথচলা শুধু বিএনপির নেতৃত্বের ইতিহাসের সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির উত্থান-পতন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সরকার পরিচালনা এবং বিরোধী দলের আন্দোলন—দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পর্যায়েই তার সক্রিয় উপস্থিতি ছিল।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব
রাজনীতির রাজপথে খালেদা জিয়ার দৃশ্যমান উত্থান ঘটে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির নেতৃত্বে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার নেতৃত্বে দলটি আন্দোলনে শক্ত অবস্থান তৈরি করে এবং ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের সময় তিনি রাজপথের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে সামনে আসেন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এরশাদ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনীতিতে গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করলে খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। এর মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে তার অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়।
পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচন এবং ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়েও তিনি দেশের সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি এ সময় বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তিও আরও বিস্তৃত হয়।
বিজ্ঞাপন
‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর একটি হলো ‘আপসহীনতা’। বিএনপির নেতাকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক চাপ, আন্দোলন, মামলা কিংবা কারাবাস—কোনো পরিস্থিতিতেই তিনি সহজে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে যাননি।
জীবনের শেষ দিকের রাজনৈতিক অধ্যায়েও তাকে নানা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। মামলা ও কারাবাসের কারণে দীর্ঘ সময় সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকতে হলেও বিএনপির নেতৃত্বে তার অবস্থান নিয়ে দলটির ভেতরে প্রশ্ন তৈরি হয়নি।
বিজ্ঞাপন
অসুস্থতা ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দলের নেতাকর্মীদের কাছে তিনি ঐক্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। তার নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক অবস্থানকে ঘিরে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে যে আবেগ তৈরি হয়েছে, সময়ের সঙ্গে সেটিও আরও দৃঢ় হয়েছে।
রিজভীর বক্তব্যে খালেদা জিয়ার দৃঢ়তার প্রশংসা
খালেদা জিয়ার জন্মদিনের আগে শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিএনপির সংবাদ সম্মেলনে তার রাজনৈতিক জীবনের দৃঢ়তার বিষয়টি তুলে ধরেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
বিজ্ঞাপন
রিজভীর ভাষ্য অনুযায়ী, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়া ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ‘মূর্ত প্রতীক ও মূল প্রেরণা’ হিসেবে ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার আক্রমণ ও প্রতিকূলতা এলেও তিনি নিজের দায়িত্ব ও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হননি বলেও মন্তব্য করেন রিজভী।
খালেদা জিয়ার দৃঢ়তা বোঝাতে গিয়ে তিনি তাকে ‘হিমালয় পর্বতের মতো মাথা উঁচু করে’ এগিয়ে যাওয়া নেত্রী হিসেবে বর্ণনা করেন। বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে এই বক্তব্য তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও দৃঢ় নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দলীয় আবেগের কেন্দ্রে খালেদা জিয়া
বিজ্ঞাপন
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় খালেদা জিয়া শুধু বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেননি; দলটির নেতাকর্মীদের কাছে তিনি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতেও পরিণত হন।
ক্ষমতায় থাকার সময় যেমন তিনি জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন, তেমনি বিরোধী দলে থাকার সময়ও তার রাজনৈতিক প্রভাব দৃশ্যমান ছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকট ও আন্দোলনের সময়ে দলের নেতাকর্মীরা তার নেতৃত্ব ও অবস্থানের দিকে তাকিয়ে থেকেছেন।
বিএনপির কাছে খালেদা জিয়া একই সঙ্গে দলের নেত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং গণতন্ত্রের আন্দোলনের প্রতীক। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ভূমিকা ও উত্তরাধিকারকে সামনে রেখেই দলটি বিভিন্ন সময়ে নিজেদের রাজনৈতিক কর্মকৌশল নির্ধারণ করেছে।
বিজ্ঞাপন
দোয়া ও মিলাদে জন্মদিন পালন
খালেদা জিয়ার জন্মদিন উপলক্ষে বিএনপি এবার দোয়া ও মিলাদ মাহফিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে দলীয় কার্যালয় ও মসজিদে এসব কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তবে দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে জন্মদিনের আনুষ্ঠানিকতার চেয়েও দিনটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম স্মরণের উপলক্ষ হিসেবে। তাদের কাছে তিনি এমন এক নেত্রী, যার রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে আন্দোলন, সংগ্রাম, ত্যাগ ও প্রতিকূলতার নানা অধ্যায় জড়িয়ে রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সময়ের সঙ্গে বহু রাজনৈতিক চরিত্র ও অধ্যায়ের পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু খালেদা জিয়ার নাম এখনও দেশের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণভাবে উচ্চারিত হয়। কারণ তার রাজনৈতিক জীবন শুধু ক্ষমতায় থাকা কিংবা ক্ষমতার বাইরে থাকার হিসাব নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কয়েক দশকের রাজনৈতিক আন্দোলন, বিএনপির সাংগঠনিক বিকাশ এবং দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ নানা বাঁক।
৮২তম জন্মদিনে তাই বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে খালেদা জিয়া শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন। তাদের দৃষ্টিতে তিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, দৃঢ়তা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও অবস্থানে অটল থাকার প্রতীক। রাজনৈতিক জীবনে বহু আঘাত ও সংকটের মুখোমুখি হয়েও নেতৃত্বের প্রশ্নে পিছিয়ে না যাওয়ার যে ভাবমূর্তি তিনি তৈরি করেছেন, সেটিই তাকে বিএনপির কাছে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে।








