গৃহবধূ থেকে যেভাবে আপসহীন নেত্রী হয়ে ওঠেন খালেদা জিয়া

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এক বহুল আলোচিত ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে দলটির নেতৃত্ব দেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবি, সরকার পরিচালনা, বিরোধী দলের রাজনীতি এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি পান।
বিজ্ঞাপন
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জন্ম নেওয়া খালেদা জিয়া ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ৮০ বছর বয়সে মারা যান। তাই ২০২৬ সালের ১৫ আগস্ট তাঁর ৮২তম নয়, ৮১তম জন্মবার্ষিকী হওয়ার কথা। ২০২৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনি ৮০ বছর পূর্ণ করেছিলেন।
তাঁর মৃত্যুর পর বিএনপির নেতৃত্বে আসেন জ্যেষ্ঠ ছেলে তারেক রহমান। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বড় জয় পায় এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
জন্ম ও শৈশব
বিজ্ঞাপন
খালেদা খানম পুতুল নামে পরিচিত খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট। তাঁর বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন ব্যবসায়ী এবং মা তৈয়বা মজুমদার ছিলেন গৃহিণী। তাঁর পারিবারিক শিকড় ফেনীতে হলেও শৈশবের বড় একটি সময় কাটে দিনাজপুরে।
দিনাজপুরে তাঁর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয়। পরে তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৬০ সালে তরুণ সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিয়ের পর স্বামীর কর্মস্থলের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে বসবাস করতে হয় তাঁকে। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান পাকিস্তানে দায়িত্ব পালন করলে তিনিও সেখানে স্বামীর সঙ্গে ছিলেন। তাঁদের দুই ছেলে—তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো।
রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আগে খালেদা জিয়ার জীবন ছিল মূলত পরিবারকেন্দ্রিক। স্বামী ও দুই সন্তানকে ঘিরেই তাঁর সংসারজীবন আবর্তিত হতো। রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর কোনো আনুষ্ঠানিক ভূমিকা তখন ছিল না।
বিজ্ঞাপন
মুক্তিযুদ্ধের সময় বন্দিজীবন
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়ে যুদ্ধে যোগ দেন। এ সময় দুই সন্তানকে নিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন খালেদা জিয়া।
চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জ হয়ে পরে ঢাকায় আসেন তিনি। একপর্যায়ে ১৯৭১ সালের জুলাইয়ে তাঁকে আটক করে পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যন্ত তিনি বন্দি অবস্থায় ছিলেন।
বিজ্ঞাপন
এই সময়ের অভিজ্ঞতা তাঁর ব্যক্তিজীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। তবে তখনও রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার কোনো পরিকল্পনা তাঁর ছিল না।
স্বামীর মৃত্যুর পর বদলে যায় জীবন
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুর পর খালেদা জিয়ার জীবনে আসে আরেকটি বড় মোড়।
বিজ্ঞাপন
তখন তিনি ছিলেন মূলত একজন গৃহবধূ। কিন্তু জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংকট, দলীয় বিভাজন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁকে ধীরে ধীরে রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলে দেশের রাজনীতিতে নতুন সংকট তৈরি হয়। একই সময়ে বিএনপিও সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। দলীয় নেতাদের অনুরোধে খালেদা জিয়া বিএনপিতে যোগ দেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে উঠে আসেন।
১৯৮৩ সালে তিনি বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
বিজ্ঞাপন
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব
বিএনপির নেতৃত্ব নেওয়ার পর খালেদা জিয়া সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় হন। এরশাদ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের বিরোধিতা এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে তিনি ধারাবাহিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।
১৯৮৬ সালের নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। পরবর্তী কয়েক বছরে আন্দোলনের কারণে তাঁকে একাধিকবার আটকও করা হয়।
বিজ্ঞাপন
বিএনপি, আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আন্দোলন এবং রাজপথের ধারাবাহিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এরশাদ সরকারের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদ ক্ষমতা ছাড়েন।
এই আন্দোলনে দৃঢ় অবস্থানের কারণে খালেদা জিয়া ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি পান।
১৯৯১ সালে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী
বিজ্ঞাপন
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হলে খালেদা জিয়া সরকার গঠন করেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন।
তাঁর প্রথম মেয়াদে বাংলাদেশে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থনীতি, শিক্ষা, নারী উন্নয়ন ও রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রসারে তাঁর সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ আলোচিত হয়।
১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনেও বিএনপি জয়ী হলেও রাজনৈতিক বিরোধের কারণে অল্প সময়ের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে নতুন নির্বাচনের পথ তৈরি হয়।
বিজ্ঞাপন
১৯৯৬ ও ২০০১ সালের রাজনীতি
১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করতে না পারলেও দলটি বড় বিরোধী দল হিসেবে সংসদে অবস্থান নেয়। খালেদা জিয়া বিরোধীদলীয় নেত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
এরপর ১৯৯৯ সালে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট গঠিত হয়। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের জাতীয় নির্বাচনে চারদলীয় জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে খালেদা জিয়া তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তাঁর সরকারের সময়ে শিক্ষা, নারী উন্নয়ন, অবকাঠামো, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিক কর্মসূচি নেওয়া হয়। ২০০৫ সালে Forbes ম্যাগাজিনের প্রভাবশালী নারীদের তালিকায় তাঁর অবস্থান ২৯তম ছিল।
এক-এগারো ও কারাবাস
২০০৬ সালে নিয়ম অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর দেশের রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি এবং সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর বড় দুই রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের ওপর চাপ তৈরি হয়।
২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁকে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার একটি বাড়িতে সাবজেল হিসেবে রাখা হয়। একই সময়ে তাঁর দুই ছেলেও গ্রেপ্তার হন।
২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে খালেদা জিয়া মুক্তি পান। কারাবন্দিত্বের এই সময় বিএনপির ভেতরে নানা সংকট তৈরি হলেও দলের একটি বড় অংশের কাছে তিনি নেতৃত্বের প্রধান প্রতীক হিসেবে থেকে যান।
বিরোধী রাজনীতিতে দীর্ঘ সময়
২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি পরাজিত হওয়ার পর খালেদা জিয়া বিরোধীদলীয় নেত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী বছরগুলোতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার এবং রাজনৈতিক অধিকারসহ বিভিন্ন দাবিতে বিএনপি আন্দোলন করে।
২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের বর্জনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলেও খালেদা জিয়া তখন কারাবন্দি ছিলেন।
মামলা, কারাবাস ও অসুস্থতা
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার কারাদণ্ড হয়। পরে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলাতেও তাঁর সাজা হয়।
কারাবন্দি অবস্থায় তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। ২০২০ সালের ২৫ মার্চ সরকার নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে তাঁর সাজা স্থগিত করে মুক্তি দেয়। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন।
পরবর্তী সময়ে আদালতের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এসব মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া সাজা বাতিল বা খালাসের বিষয়টি সামনে আসে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক আন্দোলন ও সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হয়। আন্দোলনের একপর্যায়ে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন।
এরপর রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় খালেদা জিয়ার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও আইনি সংকটের অবসান ঘটে এবং তিনি মুক্ত রাজনৈতিক জীবনের সুযোগ পান।
শেষ অধ্যায় ও মৃত্যু
দীর্ঘদিন নানা শারীরিক জটিলতায় ভোগার পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
আরও পড়ুন
পরদিন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়। তাঁকে স্বামী জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে সমাহিত করা হয়। তাঁর জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন।
উত্তরাধিকার ও তারেক রহমানের নেতৃত্ব
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির নেতৃত্বে আসেন তাঁর জ্যেষ্ঠ ছেলে তারেক রহমান। ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বড় জয় পায়। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
একজন গৃহবধূ হিসেবে জীবন শুরু করে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেত্রী হয়ে ওঠার পথটি ছিল দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল। স্বামীর মৃত্যুর পর অনিচ্ছাকৃতভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ, এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব, তিনবার প্রধানমন্ত্রী হওয়া, দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতি, কারাবাস ও অসুস্থতা—সব মিলিয়ে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের গত কয়েক দশকের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
‘আপসহীন নেত্রী’ পরিচয়টি তাই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত পরিচিতিগুলোর একটি হয়ে রয়েছে। তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি গণতন্ত্রের আন্দোলনের প্রতীক; আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি এমন এক নারী নেতা, যাঁর কয়েক দশকের রাজনৈতিক পথচলা দেশের ক্ষমতার পালাবদল ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।








