Logo

র‍্যাব বিলুপ্ত নয়, নতুন নামে থাকছে একই কাঠামো

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৯ আগস্ট, ২০২৬, ১৬:৫৩
র‍্যাব বিলুপ্ত নয়, নতুন নামে থাকছে একই কাঠামো
ছবি: সংগৃহীত

র‍্যাব বিলুপ্ত করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) নামে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে প্রস্তাবিত আইনের খসড়া বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বাহিনীর নাম ও আইনি ভিত্তি বদলালেও র‍্যাবের জনবল, সম্পদ, ক্ষমতা, দায়দায়িত্ব, মামলা ও সাংগঠনিক ধারাবাহিকতার বড় অংশই নতুন ইউনিটে বহাল থাকছে।

বিজ্ঞাপন

গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের ভেটিং সাপেক্ষে খসড়াটি অনুমোদিত হয়েছে। সরকারের তথ্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, বিদ্যমান র‍্যাব বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে এসআরবি নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করা হবে।

তবে খসড়ার বিভিন্ন বিধান বলছে, র‍্যাবের প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরাধিকার প্রায় পুরোপুরিই নতুন বাহিনীর কাছে স্থানান্তরিত হবে। র‍্যাবের কর্মকর্তা-কর্মচারী, তহবিল, সম্পদ, নথি, হিসাব, চুক্তি ও দায়দায়িত্ব এসআরবির কাছে যাবে। এমনকি র‍্যাবের পক্ষে বা বিপক্ষে চলমান মামলাও নতুন বাহিনীর নামে চালিয়ে যাওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

নাম বদলালেও ক্ষমতার বড় অংশ বহাল

বিজ্ঞাপন

অনুমোদিত খসড়ায় ২৭টি ধারা রয়েছে। এর মধ্যে ২৬ ধারায় র‍্যাব বিলুপ্ত হওয়ার পর তার কার্যক্রম ও সম্পদের ধারাবাহিকতা কীভাবে নতুন ইউনিটে থাকবে, তা নির্ধারণ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

নতুন আইন কার্যকর হলে র‍্যাব গঠনের ভিত্তি ২০০৩ সালের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (সংশোধনী) আইনটি রহিত হবে। একই সঙ্গে র‍্যাবের সব সম্পদ, অধিকার, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, সুবিধা, তহবিল, ব্যাংক ও নগদ অর্থ, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, হিসাব, রেজিস্টার এবং অন্যান্য নথি এসআরবিতে স্থানান্তরিত হবে।

র‍্যাবে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও নতুন ইউনিটের সদস্য হিসেবে বিবেচিত হবেন। চাকরির শর্ত পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত তারা আগের শর্তেই দায়িত্ব পালন করবেন।

এ ছাড়া র‍্যাবের বিদ্যমান দায়দায়িত্ব, চুক্তি এবং আদালতে চলমান মামলা এসআরবির নামে অব্যাহত থাকবে। শুধু বাহিনীর নাম পরিবর্তনের কারণে র‍্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে চলমান কোনো মামলা বা আইনি কার্যক্রমও বাতিল হবে না।

বিজ্ঞাপন

সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য নেওয়ার সুযোগ থাকছে

এসআরবি বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে পরিচালিত বিশেষায়িত ইউনিট হলেও প্রয়োজনে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীসহ অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনী থেকে কর্মকর্তা ও সদস্য নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

খসড়ার ৪(৩) ধারায় পুলিশের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী ও অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনী থেকে প্রেষণ বা অস্থায়ী সংযুক্তির বিধান রয়েছে। ফলে র‍্যাবের যে বহুবাহিনীভিত্তিক কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিন সমালোচনা ছিল, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নতুন ইউনিটেও বহাল থাকছে।

বিজ্ঞাপন

গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন অবশ্য বিশেষায়িত বাহিনী গঠন করা হলে সেটি শুধু প্রশিক্ষিত পুলিশ সদস্যদের নিয়ে করার সুপারিশ করেছিল।

কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর মতে, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের এমন ইউনিটে যুক্ত করা হলে তাদের মূল বাহিনীর কমান্ড কাঠামোর বাইরে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি জটিলতা তৈরি করতে পারে।

তদন্ত, গ্রেপ্তার ও তল্লাশির ক্ষমতা

বিজ্ঞাপন

প্রস্তাবিত এসআরবির দায়িত্বের পরিধি বেশ বিস্তৃত। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার, মাদক, সাইবার অপরাধ, মানব পাচার, সংঘবদ্ধ অপরাধ ও সন্ত্রাস দমনে কাজ করবে ইউনিটটি।

নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, মানব পাচার এবং অপরাধমূলক মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে।

নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পরোয়ানা ছাড়াই প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশে ফৌজদারি মামলা তদন্ত করতে পারবে এসআরবি।

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ র‍্যাবের তুলনায় নতুন ইউনিটের তদন্তক্ষমতার ক্ষেত্র কিছু জায়গায় আরও স্পষ্ট ও বিস্তৃত করা হয়েছে।

নিজস্ব হাজতখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ

এসআরবির নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার বিধান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। খসড়ার একটি ধারায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে ‘অনতিবিলম্বে’ নিকটবর্তী থানার হেফাজতে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আবার অন্য ধারায় এসআরবির নিজস্ব হাজতখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার অনুমতি রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এই দুই বিধান কীভাবে একসঙ্গে কার্যকর হবে এবং এসআরবির হাজতে একজন আটক ব্যক্তিকে কতক্ষণ রাখা যাবে, সে বিষয়ে খসড়ায় বিস্তারিত ব্যাখ্যা নেই।

র‍্যাবের বিরুদ্ধে অতীতে গোপন বন্দিশালা, বেআইনি আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ থাকায় নতুন ইউনিটের নিজস্ব হেফাজতব্যবস্থা নিয়েই মানবাধিকারকর্মীদের উদ্বেগ রয়েছে।

অভিযোগ নিষ্পত্তিতে নতুন কমিটি

বিজ্ঞাপন

প্রস্তাবিত আইনে নাগরিক ও বাহিনীর সদস্যদের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য পাঁচ সদস্যের একটি অভিযোগ প্রতিকার কমিটি রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে কমিটির পাঁচ সদস্যের মধ্যে চারজনই সরকার, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট ইউনিটের কর্মকর্তা হবেন। একজন সদস্য সরকার মনোনীত মানবাধিকার, আইন বা বিচার প্রশাসনে অন্তত ১০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি হবেন।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে কমিটি সরাসরি শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করবে। ফলে কমিটির স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

সরকারের ব্যাখ্যা, ‘এটি নতুন ব্যাটালিয়ন’

বিজ্ঞাপন

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, র‍্যাবের পুরোনো কাঠামো শুধু নাম পরিবর্তন করে রাখা হচ্ছে—বিষয়টি এমন নয়। তার মতে, নাগরিক ও বাহিনীর সদস্যদের অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা, শৃঙ্খলাভঙ্গের সংজ্ঞা এবং জবাবদিহির কাঠামো নতুন আইনে স্পষ্ট করা হয়েছে।

তিনি বলেন, র‍্যাব বিলুপ্ত করা হচ্ছে এবং এসআরবি হবে নতুন একটি ব্যাটালিয়ন। রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই মানবাধিকার সমুন্নত রেখে এমন বিশেষায়িত বাহিনী প্রয়োজন। সাইবার অপরাধ, মাদক ও সংঘবদ্ধ অপরাধের মতো নতুন ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় বিশেষ প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম ও দক্ষ জনবল দরকার বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তবে মানবাধিকারকর্মী মো. নূর খান মনে করেন, শুধু নাম পরিবর্তন করে একই কাঠামো ও ক্ষমতা বহাল রাখলে সমস্যার মৌলিক সমাধান হবে না। তার আশঙ্কা, পুরোনো কাঠামো অক্ষুণ্ন থাকলে এসআরবিও ভবিষ্যতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

র‍্যাবের বিরুদ্ধে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগের পর জাতিসংঘ, গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন বাহিনীটি বিলুপ্তের সুপারিশ করেছিল। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রও র‍্যাব ও বাহিনীর তৎকালীন ও সাবেক সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

এমন প্রেক্ষাপটে র‍্যাবকে সম্পূর্ণ ভেঙে নতুন কাঠামো তৈরির বদলে প্রায় একই জনবল, সম্পদ ও বিস্তৃত ক্ষমতা নিয়ে এসআরবি গঠনের সিদ্ধান্ত কতটা কাঙ্ক্ষিত সংস্কার আনবে—এখন সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD