Logo

দুর্গম এলাকায় নেই সড়ক-অ্যাম্বুলেন্স, রোগীর ভরসা স্বজনের কাঁধ

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২২ আগস্ট, ২০২৬, ১৯:৪৮
দুর্গম এলাকায় নেই সড়ক-অ্যাম্বুলেন্স, রোগীর ভরসা স্বজনের কাঁধ
ছবি: সংগৃহীত

রাঙ্গামাটির লংগদু উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি জনপদে এখনো পৌঁছায়নি আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার সুবিধা। সড়ক নেই, অ্যাম্বুলেন্স চলাচলের সুযোগ নেই, অনেক এলাকায় আবার মোবাইল নেটওয়ার্ক ও বিদ্যুৎও অনুপস্থিত। ফলে জরুরি অসুস্থতা কিংবা প্রসববেদনার মতো পরিস্থিতিতে রোগীকে কাঁধে তুলে পাহাড়ি পথ পাড়ি দেওয়াই স্থানীয়দের একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি প্রসববেদনা ওঠার পর এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন লংগদুর বাসিন্দা সুমিতা চাকমা। হাসপাতালে নেওয়ার জন্য কোনো যানবাহন না থাকায় তার স্বামী সুপন চাকমা চরম দুশ্চিন্তায় পড়ে যান।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সুমিতাকে নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিতে হলে প্রায় ৫ কিলোমিটার দুর্গম পাহাড়ি পথ অতিক্রম করতে হয়। পথে রয়েছে পাঁচটি ঝিরি ও তিনটি উঁচু পাহাড়। বর্ষার পানি ও দুর্গমতার কারণে ওই পথে যানবাহন চলাচলেরও সুযোগ নেই।

শেষ পর্যন্ত স্থানীয় চারজন ব্যক্তি বাঁশ ও বোরগি দিয়ে একটি ‘ভাড়’ বা ঝুলন্ত দোলা তৈরি করেন। বৃষ্টি কিছুটা কমলে তাতে সুমিতাকে শুইয়ে শুরু হয় কয়েক ঘণ্টার দুর্গম যাত্রা।

বিজ্ঞাপন

প্রায় তিন ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে তাকে লংগদু-দিঘীনালা সড়কের ডাঙ্গাবাজার এলাকায় নেওয়া হয়। সেখান থেকে অটোরিকশায় করে খাগড়াছড়ি জেনারেল হাসপাতালে পৌঁছানো হয় তাকে। পরে ৫ আগস্ট রাতে চিকিৎসকদের সহযোগিতায় সন্তান জন্ম দেন সুমিতা।

সুপন চাকমা বলেন, ওই দিন তিনি ও তার পরিবার ভয়াবহ দুশ্চিন্তার মধ্যে ছিলেন। প্রতিবেশীরা সহযোগিতার জন্য এগিয়ে না এলে স্ত্রী ও সন্তানকে বাঁচানো সম্ভব হতো না। হাসপাতাল থেকে স্ত্রী ও নবজাতককে বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়ার সময়ও একই ধরনের সহযোগিতার প্রয়োজন হবে বলে জানান তিনি।

দুর্গম জনপদে চিকিৎসা যেন বিলাসিতা

বিজ্ঞাপন

সুমিতার ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির বহু দুর্গম পাহাড়ি পাড়ায় জরুরি চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ এখনো সীমিত। ফলে গর্ভবতী নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি কিংবা গুরুতর অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছাতেই দীর্ঘ সময় লেগে যায়।

শীলাছড়ার পেরা আদম পাড়ার বাসিন্দা মানবেন্দ্র চাকমা জানান, তার গ্রামসহ আশপাশের আরও পাঁচটি গ্রামে কোনো সড়ক যোগাযোগ নেই। বর্ষাকালে ঝিরিগুলোতে পানির স্রোত বেড়ে যাওয়ায় চলাচল আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।

তার মতে, বয়স্ক মানুষ, শিশু, রোগী ও গর্ভবতী নারীদের জন্য এসব পথ অতিক্রম করা অত্যন্ত বিপজ্জনক।

বিজ্ঞাপন

দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অ্যাম্বুলেন্সের সুবিধা অনেকের কাছেই কার্যত অচেনা। ফোর-হুইল ড্রাইভ গাড়িও যেখানে পৌঁছাতে পারে না, সেখানে বাঁশ ও কাপড়ের তৈরি দোলা বা ‘ভাড়’ই হয়ে ওঠে রোগী পরিবহনের মাধ্যম।

সাপে কাটা রোগী, তীব্র ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি কিংবা প্রসববেদনায় থাকা নারীদের অনেক সময় চারজন বা তার বেশি মানুষ কাঁধে তুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাহাড়ি পথ পাড়ি দেন। হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে; অনেক ক্ষেত্রে পথেই মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে বলে স্থানীয়রা জানান।

বর্ষাকালেই সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় ইউপি সদস্য কৃমল চাকমা জানান, তার ২ নম্বর ওয়ার্ডে প্রায় সাড়ে ৬০০ পরিবারের বসবাস। সেখানে আটটি পাড়ার মধ্যে পাঁচটিতেই সড়ক যোগাযোগ নেই। অনেক এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ও বিদ্যুৎও নেই।

তিনি দুর্গম এলাকার জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক অথবা পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথা জানান।

আটারকছড়া ইউনিয়ন পরিষদের নারী সদস্য স্মরণিকা চাকমা বলেন, বর্ষাকাল এবং প্রসববেদনা—দুর্গম এলাকার মানুষের কাছে দুটিই আতঙ্কের বিষয়। বর্ষায় পাহাড়ি ঝিরির পানি বেড়ে গেলে অনেক পাড়া কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কোনো গর্ভবতী নারীর জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

আটারকছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অজয় মিত্র চাকমার ভাষ্য, পুরো ইউনিয়নটি পাহাড়ি এলাকায় হওয়ায় সড়ক যোগাযোগের ঘাটতি প্রকট। প্রয়োজনের তুলনায় স্বাস্থ্যসেবাও অপ্রতুল। দুর্গমতার কারণে মৌলিক সেবা থেকে মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে এবং হাসপাতালে নেওয়ার পথেই অনেক রোগীর মৃত্যু হচ্ছে।

ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহন বাড়ায় মৃত্যুঝুঁকি

চিকিৎসকদের মতে, গুরুতর অসুস্থ রোগীকে দীর্ঘ সময় ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথে বহন করা তার শারীরিক অবস্থাকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলতে পারে। বিশেষ করে ট্রমা বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের রোগীদের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিজ্ঞাপন

পার্বত্য অঞ্চলের স্বাস্থ্য খাতে বড় সংকটগুলোর একটি হলো চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের সীমাবদ্ধতা এবং জীবনযাপনের নানা অসুবিধার কারণে অনেক স্বাস্থ্যকর্মী এসব এলাকায় দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে অনাগ্রহী।

অন্যদিকে শহর ও জেলা সদরকেন্দ্রিক হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের ওপর বাড়তি চাপ থাকলেও পাহাড়ের প্রত্যন্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে জনবল সংকট রয়েছে। অনেক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী পদায়নের পর প্রেষণে সমতল বা জেলা সদরে চলে আসেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বর্ষায় বাড়ে রোগের প্রকোপ

বিজ্ঞাপন

ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে পাহাড়ি এলাকাগুলোতে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাবও বাড়ে। বর্ষাকালে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু এবং বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। দুর্গমতার কারণে আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনাও কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমতলের স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো হুবহু পাহাড়ি এলাকায় প্রয়োগ করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। পাহাড়ে জনসংখ্যার ঘনত্ব তুলনামূলক কম হলেও একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পৌঁছাতে অনেক বেশি ভৌগোলিক দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়।

তাদের মতে, স্বাস্থ্য বাজেট ও জনবল পরিকল্পনায় পাহাড়ি এলাকার ভৌগোলিক বাস্তবতাকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

পার্বত্য স্বাস্থ্য খাত নিয়ে কাজ করা গবেষকদের মতে, শুধু স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভবন নির্মাণ করলেই প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হবে না। সেখানে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের থাকার উপযোগী পরিবেশ, বিশেষ ভাতা এবং নিয়মিত মোবাইল মেডিকেল ক্যাম্পের ব্যবস্থা জরুরি।

জনবল ও অবকাঠামো সংকটে স্বাস্থ্যসেবা

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দুর্গম এলাকায় চিকিৎসক ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। বিদ্যুৎ, পরিবারের বসবাসের সুবিধা ও সন্তানদের শিক্ষার সুযোগের অভাবে অনেক চিকিৎসক সেখানে থাকতে চান না।

বিজ্ঞাপন

তিনি জানান, পাহাড়ি এলাকায় স্যাটেলাইট ক্লিনিক ও বিশেষ মোবাইল মেডিকেল টিম পাঠানোর উদ্যোগ রয়েছে। বিজিবি ও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময়ে দুর্গম পাড়ায় বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ বিতরণ করা হয়। তবে প্রয়োজনের তুলনায় এসব উদ্যোগ এখনো পর্যাপ্ত নয়।

রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য মিনহাজ মুর্শিদ জানান, জনবল সংকটের কারণে স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে। সংকট কাটাতে গত বছরের নভেম্বরে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের কোটা-সংক্রান্ত দাবির কারণে নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত রয়েছে। বিষয়টি সমাধানে কাজ চলছে বলে জানান তিনি।

রাঙ্গামাটি পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক সোহাগময় চাকমাও জনবল সংকটের কথা স্বীকার করেছেন। তার মতে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার পরও বিভিন্ন কারণে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি গত আড়াই বছর ধরে উপজেলাগুলোতে ওষুধসহ প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তার জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক বরাদ্দ নেই।

তিনি আরও জানান, অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অবকাঠামো জরাজীর্ণ। এসব কেন্দ্রে গর্ভবতী নারীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে দুর্গম পাহাড়ি জনপদে স্বাস্থ্যসেবার সংকট কাটাতে দ্রুত সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD