জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী আউয়াল টেন্ডার জালিয়াতির মাস্টার

নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই)। অথচ প্রতিষ্ঠানটির প্রধান প্রকৌশলী মো. আবদুল আউয়ালকে ঘিরে উঠেছে প্রকল্প বাস্তবায়ন, টেন্ডার, নিলাম, পদায়ন ও আর্থিক লেনদেনসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ। এই অধিদপ্তরের একটি অঘোষিত ‘সিন্ডিকেট সাম্রাজ্যে’। সরকারি ইজিপি মতো স্পর্শকাতর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ করছেন বহিরাগত ব্যক্তি এমন বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে এই প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগ রয়েছে, তাঁর প্রত্যক্ষ মদদে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, বিল-ভাউচার প্রক্রিয়াকরণ, কমিশন বাণিজ্য, ঠিকাদার সিন্ডিকেট গঠন এবং আর্থিক অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার লুটপাট সংঘটিত হচ্ছে। সম্প্রতি জনৈক আসাদ মাহমুদ নামের এক ব্যাক্তি দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর অভিযোগ, সরকারি বিধি-বিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রধান প্রকৌশলী নিজের আস্থাভাজন বহিরাগতদের দিয়ে পরিচালনা করাচ্ছেন ইজিপির মত গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম। ফলে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনা ও টেন্ডার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে দেখা দিয়েছে গুরুতর প্রশ্ন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. আবদুল আউয়ালের ইজিপি ও আইবাস আইডির পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে অফিসে বসেই টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ওয়ার্ক অর্ডার আপলোড, বিল এন্ট্রি এবং আর্থিক নথি প্রক্রিয়াকরণের মতো স্পর্শকাতর কাজ করছেন আউটসোর্সিং এক কর্মচারী। অথচ সরকারি বিধি অনুযায়ী এসব কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক কর্মকর্তাদের।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগ রয়েছে, জনগণের নিরাপদ পানি নিশ্চিত করার জন্য যে অর্থ বরাদ্দ হয়, তার প্রতিটি টাকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে জনস্বার্থ। একটি টেন্ডারে অনিয়ম, একটি প্রকল্পে নি¤œমানের কাজ কিংবা সরকারি মালামাল কম দামে বিক্রি প্রতিটি ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। আবদুল আউয়ালের বিভিন্ন কর্মস্থলের সময়কার কর্মকান্ড ঘিরে দুদকে একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে।
নরসিংদীতে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ ও প্রকল্প চালু করা সম্ভব না হওয়ায় পরে বিশেষ টিম গঠন করে অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এক ঠিকাদারের বক্তব্য উদ্ধৃত করে অভিযোগে বলা হয়েছে, ঠিকাদারদের কাছ থেকে অর্থ দাবি করা হতো। দাবি অনুযায়ী অর্থ না দিলে বিল থেকে টাকা কেটে নেওয়া এবং অর্থ দিলে কাজের ক্ষেত্রে সুবিধা পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
নরসিংদী ও কিশোরগঞ্জে দায়িত্ব পালনের সময় সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ এবং টেন্ডারের কাগজপত্র পরিবর্তনের অভিযোগও উঠেছে। সরকারি টেন্ডারের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রতিযোগিতার মাধ্যমে যোগ্য ঠিকাদার নির্বাচন ও সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ মূল্য নিশ্চিত করা। সেখানে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ হয়ে থাকলে প্রশ্ন উঠবে পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে। তাই সংশ্লিষ্ট টেন্ডারের বিজ্ঞপ্তি, দরপত্র, মূল্যায়ন কমিটির কার্যবিবরণী, অনুমোদন নথি এবং অডিট আপত্তি পর্যালোচনা করেই সত্যতা মিলেছে।
বিজ্ঞাপন
সিলেট সার্কেলে দায়িত্ব পালনের সময় কুলাউড়া ও গোলাপগঞ্জ পৌরসভার পানি সরবরাহ ও পরিবেশগত স্যানিটেশন উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বও পালন করেন আবদুল আউয়াল। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা জটিলতার পাশাপাশি পরামর্শক নিয়োগেও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।
এ ক্ষেত্রে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি, দরপত্র, মূল্যায়ন, চুক্তি এবং পরামর্শককে অর্থ পরিশোধের নথি পর্যালোচনায় মেলে নানা অনিয়ম। নোয়াখালীর একটি নিলাম নিয়ে ওঠা অভিযোগটি বিশেষভাবে গুরুতর। জানা গেছে, ডানিডার অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন একটি প্রকল্পের প্রায় ৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা মূল্যের পাইপ ও নির্মাণসামগ্রী মাত্র ১৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় নিলামে বিক্রি করা হয়। এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন মালামালের মূল্য নির্ধারণ ও এত কম দামে বিক্রির অনুমোদনই দিলেন কিভাবে এই প্রধান প্রকৌশলী। অধিকাংশ ঠিকাদার নিলামের খবর জানতেন না এমন অভিযোগও রয়েছে। ময়মনসিংহে দীর্ঘদিন নির্বাহী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ, স্বজনপ্রীতি এবং বদলি-পদায়নে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন ও পিআরএল ফাইল অনুমোদনের ক্ষেত্রেও অর্থ দাবির অভিযোগ রয়েছে। এক থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন করেন তিনি। ময়মনসিংহের ফুলপুর ও গৌরীপুর পৌরসভার পানি সরবরাহ প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্পগুলোর একটি বর্তমানে কার্যত অচল রয়েছে। একটি প্রকল্প নির্মাণের পর যদি তা সচল না থাকে, তাহলে শুধু নির্মাণের খরচ দেখলেই হবে না। দেখতে হবে নকশা ঠিক ছিল কি না, কাজের মান কেমন, যন্ত্রপাতি যথাযথ ছিল কি না এবং প্রকল্প পরিচালনায় কোথায় ব্যর্থতা হয়েছে।
এ ব্যাপারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি)’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। অর্থ ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
বিজ্ঞাপন
এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. আবদুল আউয়াল এর মুঠো ফোনে কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি। এমনকি ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে উত্তর মেলেনি।








