বিদেশে বিয়ের স্বপ্নকে পুঁজি করে নারী পাচার, সতর্ক বাংলাদেশ

বিদেশি নাগরিককে বিয়ে করে নতুন জীবনের আশায় চীনে পাড়ি দেওয়া—কাগজে-কলমে এটি একটি বৈধ পারিবারিক অভিবাসন প্রক্রিয়া। কিন্তু এই বৈধ পথটিই যদি প্রতারণা, জবরদস্তি কিংবা নারী পাচারের কাজে ব্যবহার করা হয়, তাহলে বিষয়টি আর ব্যক্তিগত বিয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি হয়ে ওঠে আন্তদেশীয় অপরাধের একটি গুরুতর ঝুঁকি।
বিজ্ঞাপন
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনে পারিবারিক পুনর্মিলনের কিউ–১ ভিসায় বাংলাদেশি নারীদের যাওয়ার সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন স্থান থেকে উঠে এসেছে এমন কিছু অভিযোগ, যেখানে বিদেশে বিয়ে, উন্নত জীবন, আর্থিক নিরাপত্তা কিংবা চীনে যাওয়ার সুযোগ দেখিয়ে নারীদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হয়েছে। এসব অভিযোগের সবগুলোই যে সত্য, তা এখনই বলা যায় না। প্রতিটি ঘটনার পৃথক তদন্ত ও আইনি যাচাই প্রয়োজন। তবে অভিযোগগুলোর ধরন এবং ভিসা নেওয়ার সংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি—দুটিকে পাশাপাশি রেখে ঝুঁকিটি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করার সময় এসেছে।
শুরুতেই একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—চীনা নাগরিককে বিয়ে করা মানেই প্রতারণা বা পাচার নয়। চীনে যাওয়া প্রতিটি বাংলাদেশি নারীও পাচারের শিকার—এমন কোনো তথ্য নেই। একইভাবে কিছু ব্যক্তির অপরাধের দায় পুরো চীনা জনগোষ্ঠী, চীনা নাগরিক বা বাংলাদেশে বৈধভাবে কাজ করা চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপানোর সুযোগ নেই।
তবে বৈধ বিয়ে এবং পারিবারিক ভিসার সুযোগকে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র অপরাধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে কি না, সেই প্রশ্নটি উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই।
বিজ্ঞাপন
২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে অন্তত ৪ হাজার ২২৬ জন বাংলাদেশি নারী চীনে যাওয়ার জন্য কিউ–১ বা পারিবারিক পুনর্মিলন ভিসা নিয়েছেন। মানবপাচারবিষয়ক আইন নিয়ে আয়োজিত সাম্প্রতিক এক কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৫।
পরের বছরই সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৬-তে। ২০২৪ সালে ১ হাজার ৩৭৮ এবং ২০২৫ সালে ১ হাজার ৭২১ জন নারী এই ভিসায় চীনে যান।
এই পরিসংখ্যানকে সরাসরি মানবপাচারের প্রমাণ হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে সংখ্যার এমন নাটকীয় বৃদ্ধি অবশ্যই অনুসন্ধানের দাবি রাখে। বিশেষ করে যখন এর পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকা থেকে দালালচক্রের মাধ্যমে বিদেশে বিয়ে এবং উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের চীনে পাঠানোর অভিযোগ সামনে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
রাঙামাটির একটি চাকমা পরিবারের অভিযোগ, তাদের এক তরুণীকে ঢাকায় এনে এক চীনা নাগরিকের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। খাগড়াছড়ির এক মারমা নারীর ক্ষেত্রেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। অন্য একটি ঘটনায় বাগেরহাটের এক তরুণীর অভিযোগ ছিল, তাকে মাদক খাইয়ে অচেতন করার পর ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। পরে তাকে চীনে পাঠানো হলে সেখানে তিনি নির্যাতনের শিকার হন বলে অভিযোগ করেন।
এসব অভিযোগ সত্য কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়া উচিত। কিন্তু ঘটনাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে—বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে বিয়ের প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে কি কোনো সংঘবদ্ধ দালালচক্র বাংলাদেশি নারীদের আর্থিক দুর্বলতা, অসহায়ত্ব কিংবা বিদেশে ভালো জীবনের আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগাচ্ছে?
মানবপাচারের অন্যতম পুরোনো কৌশল হলো মানুষের স্বপ্নকে পুঁজি করা। আর্থিকভাবে অনিশ্চিত পরিবারে বিদেশে বিয়ের প্রস্তাব অনেক সময় একটি নতুন জীবনের দরজা হিসেবে দেখা হয়। এই মানসিকতাকেই কাজে লাগাতে পারে পাচারকারী বা দালালচক্র।
বিজ্ঞাপন
কখনো বলা হয়, বিদেশে গেলে বড় বাড়িতে থাকা যাবে। স্বামী বিত্তশালী। সংসার হবে নিরাপদ। পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হবে। কোথাও আবার পরিবারের সদস্যদের অর্থ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। চাকরি, স্থায়ীভাবে বিদেশে বসবাস কিংবা উন্নত জীবনযাপনের সুযোগের কথাও বলা হতে পারে।
বিভিন্ন অভিযোগ ও তদন্তে ভুয়া ঠিকানা, জাল নথি এবং সন্দেহজনক বিয়ের কাগজপত্র ব্যবহারের বিষয়ও উঠে এসেছে। কোনো কোনো ঘটনায় মধ্যস্থতাকারীরা নারীকে চীনে পাঠানোর ব্যবস্থা করার জন্য ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আসে—এই বিয়েগুলো আসলে কতটা যাচাই করা হচ্ছে?
বিজ্ঞাপন
বিয়ের আগে পাত্র ও পাত্রী—উভয়ের পরিচয়, স্থায়ী ঠিকানা, বৈবাহিক অবস্থা, পেশা, আয় ও পারিবারিক তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করা হয় কি না, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি নারীটি নিজের ইচ্ছায় নিচ্ছেন কি না এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে তিনি জানেন কি না, সেটিও যাচাইয়ের আওতায় থাকা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে চীনের উপস্থিতি এখন আর শুধু বড় সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা অবকাঠামো প্রকল্পে সীমাবদ্ধ নেই। উৎপাদনশিল্প, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, ওষুধ, প্রযুক্তি ও শিল্পাঞ্চলসহ বিভিন্ন খাতে চীনা কোম্পানি ও বিনিয়োগের উপস্থিতি বাড়ছে।
এটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করছে। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই মানুষের চলাচল, অর্থের লেনদেন এবং স্থানীয়-বিদেশি যোগাযোগও বাড়বে।
বিজ্ঞাপন
কিন্তু বৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারের সঙ্গে অপরাধী চক্র যাতে সুযোগ নিতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানানো এবং বিদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি শিথিল করা এক বিষয় নয়। বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত কোনো প্রকল্প বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিক কে, প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা, অর্থের উৎস ও গন্তব্য কী এবং স্থানীয় মধ্যস্থতাকারীরা কারা—এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারি থাকা প্রয়োজন।
এই নীতি শুধু চীনের জন্য নয়; বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী সব দেশের নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই সমভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
বিজ্ঞাপন
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে কিছু চীনা নাগরিকের বিরুদ্ধে মাদক, সাইবার জালিয়াতি এবং অনলাইন জুয়ার মতো অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগও সামনে এসেছে।
গত মার্চ মাসে উত্তরা এলাকায় একটি অস্থায়ী কেটামিন তৈরির কারখানার সন্ধান পাওয়ার ঘটনায় তিন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তকারীরা প্রায় ৬ দশমিক ৩ কেজি কেটামিন উদ্ধারের কথা জানান এবং আন্তর্জাতিক মাদক নেটওয়ার্কের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলেন। অন্য কিছু ঘটনায় অনলাইন জুয়া ও সাইবার অপরাধের অভিযোগে বিপুলসংখ্যক সিম কার্ড ও টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম উদ্ধারের খবরও এসেছে।
তবে এসব ঘটনার বিচারও হতে হবে তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে। কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকার কারণে বাংলাদেশে বৈধভাবে কাজ করা অসংখ্য চীনা কোম্পানি, বিনিয়োগকারী ও নাগরিককে সন্দেহের চোখে দেখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বিজ্ঞাপন
তবু রাষ্ট্রের জন্য প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ—আন্তদেশীয় অপরাধের ধরন যখন বদলাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কি সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের প্রস্তুত করছে?
বিদেশি বিয়ের আড়ালে নারী পাচারের ঝুঁকি বাংলাদেশের একক কোনো সমস্যা নয়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও এমন ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
মিয়ানমার, ভিয়েতনাম ও লাওসের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল জনগোষ্ঠীর নারীদের প্রতারণা কিংবা জোরপূর্বক চীনে নিয়ে গিয়ে বিয়ে দেওয়ার অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
এই ধরনের অপরাধের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। দারিদ্র্য, লিঙ্গবৈষম্য, দুর্বল জন্মনিবন্ধন ও পরিচয় যাচাইব্যবস্থা, সীমান্তে নজরদারির ঘাটতি এবং শক্তিশালী দালালচক্র—সব মিলিয়ে শোষণের পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
চীনের কিছু অঞ্চলে নারী ও পুরুষের সংখ্যাগত ভারসাম্যহীনতার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। তবে এটিকে অপরাধের সরল কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জনসংখ্যাগত বাস্তবতা কোনো ব্যক্তিকে অপরাধে বাধ্য করে না। অপরাধের দায় অপরাধীরই।
মানবপাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশে আইনগত কাঠামো রয়েছে। নতুন আইন ও নীতিমালার পাশাপাশি বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে বিয়ের ক্ষেত্রে আরও কঠোর যাচাইয়ের জন্য একটি মানসম্মত কার্যপদ্ধতি তৈরির বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তবে শুধু আইন প্রণয়ন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়।
পুলিশ, সিআইডি, বিশেষ শাখা, ইমিগ্রেশন, স্থানীয় প্রশাসন এবং আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো বাংলাদেশি নারী বিদেশি নাগরিককে বিয়ে করে বিদেশে যাচ্ছেন—এই তথ্য যদি সংশ্লিষ্ট একাধিক সংস্থার কাছে থাকে, তাহলে অস্বাভাবিকতা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
একই সঙ্গে বিয়ে নিবন্ধনকারী বা কাজির কার্যালয়ের ভূমিকা নিয়েও নজরদারি বাড়াতে হবে। কেউ জেনেশুনে জাল কাগজপত্র বা প্রতারণামূলক বিয়েতে সহায়তা করলে তাকেও আইনের আওতায় আনতে হবে।
আর্থিক লেনদেনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। মানবপাচারের ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের অর্থ একাধিক ব্যক্তি ও মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে স্থানান্তর হতে পারে। তাই ব্যাংক এবং মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করার সক্ষমতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
মানবপাচার প্রতিরোধের নামে বিদেশগামী সব নারীকে সন্দেহের চোখে দেখা কোনো সমাধান হতে পারে না।
বাংলাদেশি নারীদের পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা, বিয়ে কিংবা পারিবারিক কারণে বিদেশ যাওয়ার অধিকার রয়েছে। এই অধিকার অযথা সীমিত করা উচিত নয়। বরং বিমানবন্দর ও ইমিগ্রেশনে নজরদারি হওয়া উচিত নির্দিষ্ট ঝুঁকি ও তথ্যের ভিত্তিতে।
বিয়ের কাগজপত্রে অসামঞ্জস্য আছে কি না, যাত্রীর সঙ্গে থাকা ব্যক্তি সন্দেহজনক কি না, ভ্রমণ পরিকল্পনায় অস্বাভাবিকতা রয়েছে কি না কিংবা যাত্রী ভয়, চাপ বা জবরদস্তির মধ্যে আছেন কি না—এ ধরনের আলামত শনাক্ত করতে কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
লক্ষ্য হওয়া উচিত নারী হওয়ায় কাউকে থামানো নয়; বরং সম্ভাব্য পাচারের নির্দিষ্ট লক্ষণ শনাক্ত করা।
বাংলাদেশি কোনো নারী চীনে গিয়ে পাচার বা নির্যাতনের শিকার হলে বাংলাদেশের একার পক্ষে সব তথ্য সংগ্রহ করা সবসময় সম্ভব নাও হতে পারে।
বিয়ের নথি, স্বামীর পরিচয়, বসবাসের ঠিকানা, ব্যাংক লেনদেন কিংবা সংশ্লিষ্ট দালালদের বিষয়ে তথ্য জানতে হলে দুই দেশের আইনশৃঙ্খলা ও তদন্তকারী সংস্থার মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ প্রয়োজন।
তাই চীনের সহযোগিতা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য বিনিময়, যৌথ তদন্ত, অর্থের গতিপথ অনুসরণ, ভুক্তভোগীকে শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করতে হবে।
বাংলাদেশে চীনা দূতাবাস এর আগে অবৈধ ‘ম্যাচমেকিং’ এবং বিদেশি স্ত্রী ‘কেনার’ মতো কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সতর্ক করেছে। এই অবস্থানকে শুধু বিবৃতি বা সতর্কবার্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব সহযোগিতা ও সমন্বিত পদক্ষেপে রূপ দেওয়া প্রয়োজন।
নারী পাচার প্রতিরোধের প্রথম ধাপ অনেক সময় পরিবার থেকেই শুরু হতে পারে।
বিদেশে বিয়ের প্রস্তাব এলে পরিবারের সদস্যদের জানতে হবে—পাত্র আসলে কে, তাঁর স্থায়ী ঠিকানা কোথায়, তিনি আগে বিবাহিত কি না, তাঁর পেশা ও আয় কী এবং বিয়ের ব্যবস্থা করছে কারা।
একই সঙ্গে ভিসার আবেদন কীভাবে করা হয়েছে এবং বিদেশে যাওয়ার পর কোথায় থাকা হবে, সে বিষয়েও পরিষ্কার তথ্য থাকা প্রয়োজন।
নারীদের জন্য একটি নিরাপদ ও গোপনীয় পরামর্শব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি। সেখানে তারা পারিবারিক বা সামাজিক চাপের বাইরে নিজেদের বিদেশযাত্রা ও বিয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে পরামর্শ নিতে পারবেন এবং সম্ভাব্য প্রতারণার ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে পারবেন।
সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে সহজে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
চীনে যাওয়ার জন্য ৪ হাজার ২২৬ জন বাংলাদেশি নারীর কিউ–১ ভিসা নেওয়ার তথ্যকে মানবপাচারের পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এই নারীদের মধ্যে কতজন পাচারের শিকার হয়েছেন, সেই সংখ্যাটিও এখনো স্পষ্ট নয়।
কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে ভিসা নেওয়ার সংখ্যায় যে দ্রুত বৃদ্ধি ঘটেছে এবং একই সময়ে বিদেশি বিয়ের আড়ালে প্রতারণা ও নির্যাতনের যেসব অভিযোগ সামনে এসেছে, সেগুলোকে আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখেও থেমে থাকা যায় না।
বাংলাদেশের এখনই বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। অবকাঠামো, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যসহ নানা ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে। সেই সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হওয়াও স্বাভাবিক।
কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হওয়ার অর্থ এই নয় যে, বাংলাদেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা, নিজস্ব আইন কিংবা জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো ছাড় দিতে হবে।
বরং সম্পর্ক যত গভীর হবে, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং পারস্পরিক দায়িত্ববোধের প্রয়োজনও তত বাড়বে।
পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনের ভিসার মতো একটি বৈধ অভিবাসনব্যবস্থার অপব্যবহার হচ্ছে কি না—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা এখন জরুরি। কারণ সতর্কতার অভাবের মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হতে পারে কোনো একটি পরিবারকে; যারা হয়তো মেয়েকে বিদেশে বিয়ে দিয়ে নতুন জীবনের আশায় বিদায় জানিয়েছিল, কিন্তু আর কখনো তার ফিরে আসা দেখেনি।








