বিআরটিএর নামে ভুয়া জরিমানার ফাঁদ, লিংকে ক্লিক করলেই বিপদ

ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে জরিমানা পরিশোধের নামে ভুয়া এসএমএস ও জাল ওয়েবসাইট ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে প্রতারক চক্র। এ ধরনের সাইবার প্রতারণা থেকে নাগরিকদের সুরক্ষিত রাখতে সতর্কবার্তা জারি করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও সচিবদের কাছে পাঠানো এক জরুরি চিঠিতে সংস্থাটি জানায়, কিছু অসাধু ব্যক্তি ট্রাফিক জরিমানা বকেয়া রয়েছে বা দ্রুত জরিমানা পরিশোধ করতে হবে—এ ধরনের বার্তা বিভিন্ন মোবাইল নম্বর থেকে পাঠাচ্ছে। এসব বার্তার সঙ্গে সংযুক্ত করা হচ্ছে একাধিক ভুয়া ওয়েবসাইটের লিংক, যা দেখতে অনেকটা বিআরটিএর অফিসিয়াল অনলাইন সেবার মতো।
এই বার্তাগুলোর সঙ্গে ‘bsbrtcar-bdpay.sbs’, ‘bspbrtcar-govbd.online’, ‘bspbrtn-gov.cc’, ‘bspbrtcar-payfeebd.icu’, ‘bsp.brtagov.top’, ‘bsp.brta.vu/bd’, ‘bsp.brtas.vuwbd’, ‘bspbrtai-gov.cc’, ‘bsapqzc.lat’ কিংবা ‘bsp.brtas.cfd’- এর মতো বিভিন্ন ফিশিং লিংক পাঠানো হচ্ছে। এসব লিংক হুবহু বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টাল (বিএসপি)-এর আদলে তৈরি। তবে, এসব জাল ওয়েবসাইট বা পোর্টালের সঙ্গে বিআরটিএর প্রকৃত সার্ভিস পোর্টালের লিংক (bsp.brta.gov.bd) কিংবা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা নেই।
বিজ্ঞাপন
বিআরটিএ জানিয়েছে, প্রতারণার উদ্দেশ্যে তৈরি এসব ওয়েবসাইটের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রকৃত সার্ভিস পোর্টালের আদলে তৈরি হওয়ায় অনেক ব্যবহারকারী বিভ্রান্ত হয়ে সেখানে প্রবেশ করছেন এবং নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য শেয়ার করছেন। এর ফলে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ব্যাংকিং তথ্যসহ বিভিন্ন সংবেদনশীল তথ্য প্রতারকদের হাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
সংস্থাটি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, সন্দেহজনক কোনো এসএমএসে থাকা লিংকে ক্লিক করা, ব্যক্তিগত তথ্য প্রদান কিংবা আর্থিক লেনদেন করা থেকে বিরত থাকতে হবে। পাশাপাশি এ ধরনের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটকে জানাতে অনুরোধ করা হয়েছে।
বিআরটিএর সতর্কবার্তার পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তর তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সচেতন করার উদ্যোগ নিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইতোমধ্যে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে যাতে কেউ সন্দেহজনক কোনো ওয়েবসাইট বা লিংকে প্রবেশ না করেন।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বিষয়টিকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, এটি সাধারণ বাল্ক এসএমএস নয়; বরং নির্দিষ্ট যানবাহন মালিকদের লক্ষ্য করেই বার্তাগুলো পাঠানো হচ্ছে। ফলে যানবাহন নিবন্ধনসংক্রান্ত কোনো তথ্যভান্ডার থেকে তথ্য অপব্যবহার বা ফাঁসের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য বিআরটিএর অটোমেশন ব্যবস্থা, প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সিস্টেম পরিচালনাকারীদের ভূমিকা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা উচিত। একই সঙ্গে কীভাবে ব্যবহারকারীদের তথ্য প্রতারকদের হাতে পৌঁছেছে, তা খুঁজে বের করতে হবে।
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ব্যবহারকারী ফিশিং কৌশল সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। কেউ কেউ ভুয়া ওয়েবসাইটে গিয়ে অর্থ পরিশোধ করছেন, আবার কেউ ব্যাংক কার্ড বা অন্যান্য আর্থিক তথ্য দিয়ে ক্ষতির মুখে পড়ছেন। অভিযোগ দায়েরের পরও অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনার তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায় না বলেও মন্তব্য করেন তারা।
তানভীর হাসান জোহা বলেন, নাগরিকদের তথ্য সুরক্ষার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বর্তায়। তাই তথ্যভান্ডারে কোনো নিরাপত্তা দুর্বলতা থাকলে তা দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি ফিশিং ওয়েবসাইট, অবৈধ পেমেন্ট গেটওয়ে এবং প্রতারণামূলক বার্তার উৎস শনাক্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনাও জরুরি।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, সাইবার অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর সতর্কবার্তা দেওয়ার চেয়ে আগেভাগে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা অধিক কার্যকর। নিয়মিত প্রচারণা চালানো হলে সাধারণ মানুষ এ ধরনের প্রতারণার ঝুঁকি থেকে অনেকটাই নিরাপদ থাকতে পারবেন।
এদিকে নাগরিকদের উদ্দেশে, অচেনা বা সন্দেহজনক কোনো লিংকে ক্লিক না করা, ওটিপি, পাসওয়ার্ড, ব্যাংক কার্ডের তথ্য কিংবা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পিন নম্বর কারও সঙ্গে শেয়ার না করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সচেতনতা ও সতর্কতাই এমন প্রতারণা থেকে সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।








