জালিয়াতির মাস্টার বাশার ও মঞ্জুরুল সিন্ডিকেট

রাজধানীর মাতুয়াইল এলাকায় ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)-এর একটি অফিসকে ঘিরে ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এনওসিএস, মাতুয়াইল কার্যালয়ের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ বাণিজ্য, অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগে বলা হয়, তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন দুই উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আবুল বাশার তালুকদার ও মো. মঞ্জুরুল কাদের, লাইনম্যান মেট মো. ওবাইদুর রহমান টিপু এবং ড্রাইভার মো. উজ্জ্বল মিয়া। তারা সবাই মিলে একটি সুসংগঠিত চক্র গড়ে তুলে গ্রাহকদের জিম্মি করে অবৈধ সুবিধা আদায় করছে। মাতুয়াইল ডিভিশন থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন বদলি হলেও এখনো শক্তিশালী রয়েছে ওই সিন্ডিকেট। প্রতিদিনই চলছে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বানিজ্য। আর সিন্ডিকেটের নতুন নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাশার তালুকদার ও মঞ্জুরুল কাদের।
সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রীর কাছে তুষারধারা এলাকার গ্রাহক মো. শরিফ নামে এক ব্যক্তি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে বলা হয়, নির্বাহী প্রকৌশলী হেলাল উদ্দীনের সাবেক কর্মস্থলের সহকর্মীরা তার ইশারায় পূর্বের কর্মস্থল এনওসিএস, কাজলা থেকে বদলি হয়ে বর্তমান কর্মস্থলে পদায়ন নেন।
ইতোপূর্বে উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আবুল বাশার তালুকদার (১১৩৬০) ও মো. মঞ্জুরুল কাদের (২০১৩৯)-এর বিরুদ্ধে নানাবিধ অপরাধ ও অনিয়মের কারণে তাদের গ্রিডে বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু বদলির পর পুনরায় নির্বাহী প্রকৌশলীর ইশারায় তারা একই কর্মস্থলে পদায়ন নিয়ে পূর্বের ন্যায় ঘুষ, দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। অভিযোগে আরও বলা হয়, লাইনম্যান টিপু ও ড্রাইভার উজ্জ্বল অফিস সময়ে অধিকাংশ সময় প্রকৌশলীদের কক্ষে অবস্থান করতেন এবং বিভিন্ন অনিয়মে সহযোগিতা করেছেন বলে তথ্য রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, সাবিনা ইয়াসমিন (দাগ নং ৪৩৫৯২, তুষারধারা, গ্রাহক নং-৩৫৮৫০১৫৫, বিল নং-৫১৫৯২৯৩)-এর ৮০ কিলোওয়াট এবং আরেকটি একাউন্টে (গ্রাহক নং-৩৫৭৯০৯৭৬) ১৮ কিলোওয়াটসহ মোট ৯৮ কিলোওয়াট লোড থাকা সত্ত্বেও ভবনটিতে দুটি সার্ভিস দিয়ে, নিচে ডাচ বাংলা ব্যাংক থাকা অবস্থায় ৯ তলা ভবনে এইচটি সংযোগের পরিবর্তে ১৪ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে এলটি সংযোগ প্রদান করা হয়েছে।
এছাড়া, মেসার্স রহমান রাবার এন্ড টায়ার (দাগ নং ১৬৯১, জনতাবাগ, রায়েরবাগ, গ্রাহক নং-২২৭৫০০৮৮)-এ ২০২৫ সালের মার্চ মাসে মিটার পরিবর্তন হলেও বিল করা হয়েছে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে। এই সময়ে একটি ডুপ্লিকেট মিটার দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি চালু রাখা হয়। সুলতানা রাজিয়া (স্বামীবাগ, কদমতলি, গ্রাহক নং-৪৩৬০৩৩৮৫)-এর ৮ম তলা ভবনের পূর্বের নির্মাণ মিটার রিডিংসহ সরিয়ে ফেলা হয়েছে এবং নতুন একটি মিটার স্থাপন করা হয়েছে (গ্রাহক নং-৩৫৫০০৯১০, বিল নং-৩৪৭৫০৮০)।
তুষারধারা লক্ষীপুর টাওয়ার সংলগ্ন গ্রাহক (গ্রাহক নং-৩৫৮৫৭১৮)-এর ক্ষেত্রে ১০ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে এইচটি গ্রাহককে এলটি গ্রাহকে রূপান্তর করা হয়েছে এবং প্ল্যানের বাইরে ৮টি অতিরিক্ত মিটার প্রদান করা হয়েছে। সেকান্দার আলী (দাগ নং ৯২০৭, পলাশপুর)-এর ১০ তলা ভবনেও এইচটির পরিবর্তে এলটি সংযোগ দেওয়া হয়েছে। মোহাম্মদ নুরুজ্জামান হাওলাদার (আরএস ৪২৭, তুষারধারা)-এর ১০ তলা ভবনে এইচটির পরিবর্তে এলটি সংযোগ প্রদান করা হয় এবং পূর্বের নির্মাণ মিটারটি রিডিংসহ অপসারণ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এছাড়া, সোলার ও পিএফআইবিহীন সংযোগ দেওয়া হয়েছে। মাতুয়াইল ডগাইর নূর মসজিদের পেছনে একটি কয়েল কারখানার ক্ষেত্রে ব্যাংক ডিপোজিট ছাড়াই এলটি পোল উত্তর পাশ থেকে দক্ষিণ পাশে স্থানান্তর করা হয়েছে। আনোয়ার প্লাস্টিক, ওলামা নগর, ডগাইরে ১২ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে নিম্নমানের মালামাল দিয়ে সাবস্টেশন নির্মাণ এবং সোলারবিহীন সংযোগ প্রদান করা হয়েছে।
মেসার্স বিএলসি টোল রুম এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস (দাগ নং ৫৩, মেডিকেল রোড, গ্রাহক নং-৩৫৫০০৯১০, বিল নং-৩৫৯৮৯৪৬, লোড-৪৮ কিলোওয়াট)-এ সোলার ও পিএফআই ছাড়া সংযোগ দেওয়া হয়েছে এবং অন্য একটি ডিভিশন থেকে ৩ পিন মিটার এনে স্থাপন করা হয়েছে (মিটার নং-০২০৪৩০০০৪৯২৬)।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, ঘুষ বাণিজ্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টরা নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন ও নারীঘটিত নানা সমস্যায় জড়িত। আবুল বাশার তালুকদার শ্যামপুরে এক নারী দালালের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের ঘটনায় হাতেনাতে ধরা পড়ে বিয়ে করতে বাধ্য হন। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে মো. মঞ্জুরুল কাদেরের বিরুদ্ধেও; তিনিও একাধিক বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
এছাড়া, তিনি নিজেকে সাবেক সংসদ সদস্য ও ডেপুটি স্পিকার সামসুল হক টুকুর ভাতিজা পরিচয় দিয়ে কর্মস্থলে প্রভাব বিস্তার করেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বহুতল ভবনে উচ্চ ক্ষমতার এইচটি সংযোগ দেওয়ার পরিবর্তে বিপুল অঙ্কের ঘুষ নিয়ে এলটি সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। একাধিক ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৪ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। এতে একদিকে সরকারের রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ বিদ্যুৎ ঝুঁকি।
একাধিক প্রতিষ্ঠানে ডুপ্লিকেট মিটার ব্যবহার করে মাসের পর মাস বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হলেও বিল প্রদানে গড়িমসি ও কারসাজির অভিযোগ উঠেছে। কিছু ক্ষেত্রে পুরনো মিটার সরিয়ে ফেলে নতুন মিটার স্থাপন করে পূর্বের ব্যবহার গোপন করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে সোলার সিস্টেম ও পাওয়ার ফ্যাক্টর ইমপ্রুভমেন্ট (পিএফআই) ছাড়াই সংযোগ প্রদান করা হয়েছে, যা বিদ্যুৎ নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এমনকি অন্য ডিভিশন থেকে মিটার এনে সংযোগ দেওয়ার মতো গুরুতর অনিয়মের ঘটনাও ঘটেছে।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পূর্বে নানা অনিয়মের অভিযোগে বদলি করা হলেও রহস্যজনকভাবে তারা পুনরায় একই কর্মস্থলে ফিরে এসে আগের চেয়েও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের দাবি, নির্বাহী প্রকৌশলীর প্রত্যক্ষ মদদেই এই সিন্ডিকেট অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে।
নিবাহী প্রকৌশলী হেলাল বদলি হলেও তার বলায় রয়ে গেছে। দুর্নীতির পাশাপাশি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মাদক সেবন, অসামাজিক কার্যকলাপ এবং ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারির অভিযোগও রয়েছে, যা সরকারি কর্মকর্তাদের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে। এ অবস্থায় স্থানীয় ভুক্তভোগীরা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এখনই ব্যবস্থা না নিলে পুরো বিদ্যুৎ ব্যবস্থা একটি দুর্নীতির জালে আটকে পড়বে।
বিজ্ঞাপন
এ বিষয় উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আবুল বাশার তালুকদার বলেন, আমি এই বিষয় জানি না। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হানিফ ও সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী হেলাল স্যার জানেন। তারা যেভাবে বলেন, সেই ভাবে কাজ করি। পুরো বিষয়টি এড়িয়ে যান এই প্রকৌশলী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রকৌশলী বলেন, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হানিফ উদ্দিন স্যারের নির্দেশের বাইরে কিছু করা সম্ভব নয়। কারণ স্যার টাকা ছাড়া কিছু বুঝে না। বাশার-মঞ্জুলের সিন্ডিকেটের বাইরে গিয়ে কেউ কাজ করতে পারে না। তাদের সঙ্গে চুক্তি করলেই মিলে সংযোগ। তাছাড়া বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়া কঠিন।
অভিযুক্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মঞ্জুরুল কাদের বলেন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য নয়। আমি নিয়ম এর বাইরে কোনো কাজ করি না। বড় স্যারেরা যে ভাবে বলেন, সেই ভাবে কাজ করি।
বিজ্ঞাপন








