Logo

ইডকলে এনামুলের লুটপাটের রাজত্ব

profile picture
বশির হোসেন খান
১৮ জুন, ২০২৬, ২১:১৭
ইডকলে এনামুলের লুটপাটের রাজত্ব
ইডকলের মো. এনামুল করিম পাভেল। ফাইল ছবি

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশির্বাদপুষ্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) মো. এনামুল করিম পাভেল লুটপাটের স্বর্গরাজ্য গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকার পরিবর্তনের পরে শাস্তি স্বরূপ ডেপুটেশন হওয়া ওই কর্মকর্তার ক্ষমতার দাপট বিন্দুমাত্র কমেনি। স্বাভাবিক কারণেই তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত থাকা দুর্নীতির অভিযোগ যেন সহনীয় হয়ে পড়েছে সংশ্লিষ্টদের কাছে। যার কারণেই ডেপুটেশন হওয়ার পরেও ক্ষমতার দাপট কমছে না।

বিজ্ঞাপন

এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চাকরির শুরু থেকেই বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তিনি সে সময় থেকেই অনিয়ম করলেও শেখ পরিবারের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতো সাহস পেতো না। এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। তারা বলছেন, হাসিনা পালালেও দাপট কমেনি এই কর্মকর্তার। তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও সংবাদ নিয়ন্ত্রণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ইডকলের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলা সিন্ডিকেট বাণিজ্যের অন্যতম হোতা হিসেবে তার নাম উঠে এসেছে। প্রভাবশালী রাজনীতিকের ছত্রছায়ায় সিন্ডিকেট রাজত্ব এই কর্মকর্তার হাতে।

এ বিষয় দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। সরকারি মালিকানাধীন এ অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানে টানা ২২ বছর ধরে ‘হেড অব রিনিউয়েবল এনার্জি’ পদে রয়েছেন মো. এনামুল করিম পাভেল। এতো দীর্ঘ সময় একই পদে থাকার সুবাদে ইডকলের ভেতরে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলায় সফল হয়েছেন তিনি।

এই সিন্ডিকেট কার্যত প্রতিষ্ঠানের ভেতরে একটি ‘অদৃশ্য ক্ষমতাকাঠামো’ হিসেবে কাজ করছে। নিজেদের পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা ইপিসি (ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন) নিয়োগ ছাড়া প্রকল্পে অর্থায়ন পাওয়া কঠিন এমন অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বাতাস অনেকটাই ভারী এখন। অভিযোগ সূত্র বলছে, এনামুল করিম পাভেল স্কিউব টেকনোলজিসকে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের ঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।

বিজ্ঞাপন

প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শামীম আহসান মহাবুল্লাহ সাবেক মন্ত্রী ম.খা. আলমগীরের ভাগ্নে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্কিত সাবেক ভিসি নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ’র আপন ভাই। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ইডকল’কে জিম্মি করে রেখেছেন শামীম আহসান মহাবুল্লাহ।

নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৭ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ৩০১ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ৭৬টি রুফটপ সোলার প্রকল্পে ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৯১ মেগাওয়াট ক্ষমতার ২৩টি প্রকল্পে ইপিসি ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে স্কিউব, যা মোট অনুমোদিত সক্ষমতার প্রায় ৩০ শতাংশ।

অন্যদিকে, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনুমোদিত রুফটপ সোলার প্রকল্পের ৪১ শতাংশেরও বেশি কাজ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সরকার পরিবর্তনের পর স্কিউবের প্রভাব কিছুটা কমলেও সিন্ডিকেটের দাপট থেমে নেই। খাত সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, দেশে প্রায় দুই শতাধিক ইপিসি প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও সীমিত কয়েকটি কোম্পানির হাতে অধিকাংশ কাজ কেন কেন্দ্রীভূত হচ্ছে?

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্টদের দাবি, স্কিউব টেকনোলজিসে এনামুল করিম পাভেলের গোপন অংশীদারিত্বের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেন, দীর্ঘ সময় ধরে একই পদে থাকায় তিনি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে একটি প্রভাবশালী প্রশাসনিক বলয় তৈরি করেছেন।

ভিন্নমত পোষণকারীদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, মন্ত্রণালয় থেকে ডেপুটেশনে আসা এনামুল করিম পাভেল সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রভাব বিস্তার করেন ধীরে ধীরে। রুফটপ সোলার প্রকল্প বরাদ্দে স্কিউবকে অগ্রাধিকার দিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চাপ প্রয়োগ করা হতো বলে জানিয়েছেন কয়েকজন কর্মকর্তা ও উদ্যোক্তা।

এমনকি স্কিউব কাজ না পেলে কিছু ক্ষেত্রে অর্থায়ন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার অভিযোগ রয়েছে পাভেলের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেখানোর বিস্তর অভিযোগ এখন আর নতুন কিছু নয়। এসব অনিয়ম আর দুর্নীতির মাধ্যমে কালো টাকার পাহাড় গড়েছেন এনামুল কবির পাভেল। গুলশানে কয়েক কোটি টাকা দিয়ে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন তিনি। যা তার আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এছাড়া কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় টাকা পাচারের বিষয়ে ব্যাপক জনশ্রুতি রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

বিজ্ঞাপন

এ ব্যাপারে মো. এনামুল করিম পাভেল বলেন, ইডকল থেকে ৩০০ মেগাওয়াটের বেশি প্রকল্পে অর্থায়ন করা হয়েছে। এখানে স্কিউব টেকনোলজিস ২০ শতাংশের (৬০ মেগাওয়াট) মতো করেছে। স্কিউব ২৫০ মেগাওয়াটের সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করেছে যা আমাদের অর্থায়ন ছাড়াই। ওরা (স্কিউব) বড় অংশ বাস্তবায়ন করেছে আমাদের অর্থায়ন ছাড়া। কেউ অভিযোগ করতেই পারে তবে স্কিউবকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার তথ্য সত্য নয়। বিপুল পরিমাণ কালো টাকার মালিক হওয়া প্রসঙ্গে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জবাবে বলেন, “একদম ভুল কথা। আমার যা সম্পদ রয়েছে সব ঘোষিত।”

এদিকে, এনামুল করিম পাভেলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন সোলার ইরিগেশন বিভাগের প্রধান মো. আব্দুল্লাহ আল মতিন, ভাইস প্রেসিডেন্ট (নবায়নযোগ্য জ্বালানি) রাসেল আহমেদ ও এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড সোশ্যাল সেইফগার্ড ইউনিটের প্রধান আহমেদুল হাই চৌধুরী। তারা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের সময়ে একেকজন একেক মন্ত্রীর নাম ভাঙ্গিয়ে ফায়দা হাসিল করতেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

আহমেদুল হাই চৌধুরী পলাতক সাবেক মন্ত্রী ড. হাছান মামুদের নাম ব্যবহার করতেন। সহকর্মীরা তার ভয়ে থাকতেন তটস্থ। এমনকি জ্যেষ্ঠ অনেক কর্মকর্তাও তাকে সমঝে চলতেন।

বিজ্ঞাপন

সবচেয়ে বেশ দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে টিআর, কাবিটা প্রকল্পের সোলারে। যার দায়িত্বে ছিলেন আহমেদুল হাই চৌধুরী। ওই প্রকল্পের মাধ্যমে নিম্নমানের সোলার প্যানেল সরবরাহ করে বিপুল পরিমান অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পুরো সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে।

এ বিষয়ে আহমেদুল হাই চৌধুরী বলেন, আমি কখনও আওয়ামী লীগ নেতা ড. হাছান মাহমুদের নাম ভাঙাইনি।

জানা যায়, বেইলি রোডের গ্রীন কোজি কটেজে অবস্থিত ফুকো রেস্তোরাঁয় বিনিয়োগের কারণেও আলোচনায় আসেন সিন্ডিকেট সদস্য আব্দুল্লাহ আল মতিন ও রাসেল আহমেদ। ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি ওই রেস্তোরাঁয় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বহু মানুষের প্রাণহানির পর দায়ের হওয়া মামলার তদন্তে উঠে আসে তাদের নাম।

বিজ্ঞাপন

পুলিশি প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই রেস্তোরাঁটি পরিচালিত হচ্ছিল। পরে গত ১৯ এপ্রিল ঢাকার একটি আদালত রাসেল আহমেদসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। অভিযোগের বিষয়ে পুরোপুরি এড়িয়ে যান রাসেল আহমেদ। তিনি বলেন, “মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলার জন্য আমাদের নির্দিষ্ট কর্মকর্তা রয়েছেন। আমি কোনো মন্তব্য করতে পারবো না।” এমনকি বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য করতে রাজ হননি।

ইডকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমগীর মোর্শেদের মুঠো ফোনে কল দিলে রিসিভ করেননি তিনি। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সৌরবিদ্যুতের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সিন্ডিকেটভিত্তিক অনিয়ম, সীমিত প্রতিযোগিতা ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে অশুভ প্রভাবের কারণে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ব্যহত হচ্ছে।

সরকারের নির্ধারিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। অনেক আগ্রহ নিয়ে ইডকলে এলেও শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে ফিরে গেছেন বলে হতাশা প্রকাশ করেছেন বেশ কয়েকজন বিনিয়োগকারী। ওই সিন্ডিকেটের কারণে ইডকলে’র খেলাপী ঋণ ক্রমাগত বাড়ছে বলে আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের(বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, “আমাদের সংগঠনে দুই শতাধিক সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে দেড় শতাধিক সরাসরি সৌরবিদ্যুৎ খাতে কাজ করে। কিন্তু ইডকলে কাজ পায় হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।”

তিনি আরও বলেন, ইডকলে সিন্ডিকেটের বাইরে কেউ কাজ পায় না। ঘুরেফিরে তারাই কাজ পায়। দেখা যায়, এক-দুইটি প্রতিষ্ঠানই ৮০ শতাংশ কাজ করছে। ইডকলের সংস্কার না হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।

এদিকে শুধু নির্দিষ্ট কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দেওয়াই নয়, প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়ায় নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগও উঠেছে রয়েছে ইডকলের ওই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। প্রকল্পে ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে স্বাধীন প্রকৌশলী বা ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার (আইই) নিয়োগ বাধ্যতামূলক হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি।

বিজ্ঞাপন

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে আইই নিয়োগ ছাড়াই ৬৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১৫টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মেগারুফ লিমিটেডের একটি রুফটপ সোলার প্রকল্পে অর্থায়নের ক্ষেত্রেও গুরুতর বিধিলঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা কেএফডব্লিউয়ের অর্থায়নে পরিচালিত শিল্প ও বাণিজ্যিক সোলার প্রকল্পে স্বাধীন প্রকৌশলী নিয়োগ বাধ্যতামূলক। কিন্তু ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান মেগারুফ লিমিটেডের কর্নধার দিদার আহমেদকে একই প্রকল্পে আইই হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যা নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

এনামুল করিম পাভেলের প্রত্যক্ষ সহায়তায় একই প্রতিষ্ঠানকে একদিকে ঋণগ্রহীতা, অন্যদিকে স্বাধীন প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার শর্ত লঙ্ঘনের চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা বলেন, কোনো উদ্যোক্তা প্রকল্প নিয়ে ইডকলে গেলে, অধিকাংশ সময়ই তাকে নির্দিষ্ট কিছু ইপিসি প্রতিষ্ঠানের নাম প্রস্তাব করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রতিষ্ঠানের নাম স্কিউব টেকনোলজিস লিমিটেড। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প নির্বাচন ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটিয়ে আওয়ামী ঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানটিকে ধারাবাহিকভাবে কাজ পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রকল্প ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD