কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কাটছে না ঢাকার জলাবদ্ধতা

বছরের পর বছর উন্নয়ন প্রকল্প, হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যয় এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার দায়িত্ব পরিবর্তনের পরও রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার কার্যকর সমাধান মিলছে না। বর্ষা মৌসুম পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই সামান্য বৃষ্টিতে নগরীর বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীরা আশঙ্কা করছেন, আষাঢ়-শ্রাবণের ভারী বর্ষণে এবারও রাজধানীবাসীকে চরম ভোগান্তির মুখে পড়তে হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতা এখন আর একক কোনো সমস্যার ফল নয়; বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং পরিবেশগত ক্ষতির সম্মিলিত পরিণতি। ক্যাচপিট আবর্জনায় বন্ধ হয়ে যাওয়া, ড্রেনে পলি জমে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া, খাল দখল ও সংকুচিত হয়ে পড়া, পাম্পিং স্টেশনের অকার্যকারিতা এবং আশপাশের নদীগুলোর নাব্যতা কমে যাওয়া—সব মিলিয়ে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের পুরো প্রক্রিয়াই ব্যাহত হচ্ছে।
বৃষ্টিতেই ডুবে যাচ্ছে নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা
সাম্প্রতিক কয়েক দফা বৃষ্টির পর রাজধানীর বহু এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। নিউমার্কেট, আজিমপুর, নীলক্ষেত, বকশিবাজার, মালিবাগ, শান্তিনগর, সায়েদাবাদ, শনির আখড়া, পুরান ঢাকা, বংশাল, ধানমন্ডি, মিরপুর, শেওড়াপাড়া, মতিঝিল, বনানী, খিলক্ষেত, উত্তরা, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি, আগারগাঁও, ফার্মগেট, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর, মেরুল বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক ও অলিগলিতে পানি জমে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
যদিও এসব এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই জলাবদ্ধতার জন্য পরিচিত, তবুও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ দৃশ্যমান নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দক্ষিণ সিটির ২৯ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত
বিজ্ঞাপন
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) সম্প্রতি জলাবদ্ধতাপ্রবণ ২৯টি গুরুত্বপূর্ণ হটস্পট শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে পশ্চিম মালিবাগ, খিলগাঁও, মানিকনগর, মুগদা, কমলাপুর, শাপলা চত্বর, পল্টন, ফকিরাপুল, ধানমন্ডি-২৭, গ্রিন রোড, নিউমার্কেট, ইস্কাটন, শান্তিবাগ, জুরাইন এবং সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল সংলগ্ন এলাকা।
সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব এলাকায় পানি নিষ্কাশন সক্ষমতা বাড়াতে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ডিএসসিসির পরিকল্পনায় কী আছে?
বিজ্ঞাপন
দক্ষিণ সিটি সূত্রে জানা গেছে, স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগের আওতায় ড্রেন, বক্স কালভার্ট ও খাল পরিষ্কার, পলি ও বর্জ্য অপসারণ, পোর্টেবল পাম্পের ব্যবহার এবং জরুরি সাড়া প্রদানকারী টিম গঠনের কাজ চলছে। পাশাপাশি ৫৭টি ওয়ার্ডের জন্য সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রয়েছে খাল পুনরুদ্ধার, ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক উন্নয়ন, নতুন আউটলেট নির্মাণ এবং পাম্পিং স্টেশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি। বিশেষ করে জিয়া সরণি খাল ও শ্যামপুর খালের পানি সরাসরি বুড়িগঙ্গায় নিষ্কাশনের জন্য নতুন অবকাঠামো তৈরির কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে।
পাম্প স্টেশন ও স্লুইসগেটের দুর্বলতা বড় বাধা
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজধানীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান দুর্বলতা হচ্ছে পাম্পিং স্টেশন ও স্লুইসগেটের অকার্যকারিতা। অনেক স্থাপনা দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট অবস্থায় রয়েছে। একই সঙ্গে খালগুলোতে অবৈধ দখল, আবর্জনা এবং মাটি জমে পানি চলাচল মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর দক্ষিণ অংশে কার্যকর পানি নিষ্কাশনের জন্য অন্তত ১০টি পাম্পিং স্টেশন প্রয়োজন হলেও বর্তমানে রয়েছে মাত্র তিনটি। এর মধ্যেও হাতিরঝিলের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্টেশন কার্যকরভাবে কাজ করছে না। ফলে ভারী বর্ষণে দক্ষিণ ঢাকার বড় অংশে জলাবদ্ধতা তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্লাস্টিক বর্জ্যে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ড্রেন ও খাল
বিজ্ঞাপন
ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এলাকায় প্রতিদিন প্রায় সাত হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ প্লাস্টিকজাত বর্জ্য। এসব বর্জ্য ড্রেন, নালা ও খালে জমে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খালগুলোর স্বাভাবিক প্রশস্ততা ও গভীরতা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারছে না।
নদীগুলোর নাব্যতা সংকটও বাড়াচ্ছে সমস্যা
পানি নিষ্কাশনের শেষ গন্তব্য হিসেবে রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় সেগুলো আগের মতো পানি ধারণ করতে পারছে না। ফলে অতিরিক্ত বৃষ্টির সময় স্লুইসগেট খুলেও কাঙ্ক্ষিত হারে পানি নিষ্কাশন সম্ভব হচ্ছে না।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন: জমি দখলের মহারাজ ফতুল্লার ওসি মাহবুব
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) জানিয়েছে, বর্ষার আগেই শত শত কিলোমিটার স্টর্ম ওয়াটার ড্রেন ও বক্স কালভার্ট পরিষ্কার করা হয়েছে। পাশাপাশি রাস্তা ও নর্দমা উন্নয়ন, খাল খনন এবং কল্যাণপুর রিটেনশন পন্ড থেকে বিপুল পরিমাণ পলি অপসারণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
ডিএনসিসির আওতায় বর্তমানে পাঁচটি পাম্পিং স্টেশন রয়েছে এবং সেগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বিজ্ঞাপন
নাগরিকদের ক্ষোভ
জলাবদ্ধতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা। নিউমার্কেট এলাকার ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ভারী বৃষ্টি হলেই দোকানে পানি ঢুকে মূল্যবান পণ্য নষ্ট হয়। বারবার অভিযোগ করেও স্থায়ী সমাধান না পাওয়ায় তারা হতাশ।
অন্যদিকে মিরপুরের বাসিন্দারাও অভিযোগ করেছেন, বর্ষা এলেই রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে যায় এবং স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়। তাদের প্রশ্ন, বছরের পর বছর একই সমস্যা থাকলেও কেন কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
বিজ্ঞাপন
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জলাবদ্ধতা নিরসনে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে। খাল সংস্কার, নতুন ড্রেন নির্মাণ, পাম্পিং সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন সংযুক্ত ওয়ার্ডগুলোর ড্রেনেজ উন্নয়নের বিষয়গুলোও পরিকল্পনায় রয়েছে।
স্থায়ী সমাধান এখনও দূরে
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, কেবল প্রকল্প গ্রহণ নয়, বরং সমস্যার মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। খাল উদ্ধার, ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, নদীর নাব্যতা রক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং পর্যাপ্ত পাম্পিং সুবিধা ছাড়া ঢাকার জলাবদ্ধতা সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
বিজ্ঞাপন
তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা চিহ্নিত হলেও বাস্তবায়নের ঘাটতির কারণে রাজধানী এখনো প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হচ্ছে। তাই কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া আষাঢ়-শ্রাবণেও ঢাকাবাসীকে আবারও জলাবদ্ধতার চরম ভোগান্তি পোহাতে হতে পারে।








