Logo

কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশি তরুণদের সাইবার দাসত্ব!

profile picture
আল-আমিন
২১ জুন, ২০২৬, ১৪:৫৩
কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশি তরুণদের সাইবার দাসত্ব!
ছবি : জনবাণী গ্রাফিক্স

বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে বাংলাদেশি তরুণদের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নিয়ে গিয়ে সাইবার প্রতারণার চক্রে জড়িয়ে দেওয়ার ভয়াবহ চিত্র সামনে আসছে। বিশেষ করে কম্বোডিয়াকেন্দ্রিক একাধিক স্ক্যাম সেন্টারে বাংলাদেশিদের আটকে রেখে অনলাইন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

ভুক্তভোগীদের দাবি, পুরো প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক মানবপাচার ও সাইবার অপরাধচক্রের সমন্বয়ে পরিচালিত হয় এবং এর সঙ্গে জড়িতরা নানা কৌশলে বিদেশগামীদের ফাঁদে ফেলে।

মানিকগঞ্জের এক তরুণ এমনই এক ঘটনার শিকার হন। পরিচিত একজনের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, কম্বোডিয়ায় অনলাইন কাস্টমার কেয়ার ও কল সেন্টারে আকর্ষণীয় বেতনের চাকরি রয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, বিএমইটির ছাড়পত্র এবং বৈধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ থাকায় তিনি বিষয়টিকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন। প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় করে ২০২৫ সালের নভেম্বরে কম্বোডিয়ার উদ্দেশে রওনা হন।

তবে সেখানে পৌঁছানোর কয়েক দিনের মধ্যেই তার ধারণা বদলে যায়। তিনি বুঝতে পারেন, প্রতিশ্রুত চাকরির কোনো অস্তিত্ব নেই। বরং তাকে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে নেওয়া হয়েছে, যেখানে বিদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করে অনলাইন প্রতারণা পরিচালিত হয়।

বিজ্ঞাপন

ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে নারী পরিচয় ব্যবহার করে বিদেশিদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগ করতে বাধ্য করা হতো। টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে প্রতিদিন অসংখ্য ব্যক্তিকে বার্তা পাঠানো ছিল নিয়মিত কাজ। সাড়া পাওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব, আবেগী সম্পর্ক এবং বিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করে পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগের নামে প্রতারণার ফাঁদে ফেলতে বলা হতো।

তিনি জানান, পুরো কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পূর্বনির্ধারিত স্ক্রিপ্ট দেওয়া থাকত। কখন কী বলতে হবে, কীভাবে আস্থা অর্জন করতে হবে এবং কোন পর্যায়ে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিতে হবে— সবকিছুই আগে থেকে নির্ধারণ করা থাকত।

এক সপ্তাহের মধ্যে তিনি বুঝতে পারেন, এটি একটি সংঘবদ্ধ প্রতারণা চক্রের অংশ। এরপর কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালেও বেরিয়ে আসার কোনো সুযোগ ছিল না। কারণ, তাদের পাসপোর্ট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে রাখা হতো এবং কর্মীদের সার্বক্ষণিক নজরদারির মধ্যে রাখা হতো।

বিজ্ঞাপন

আরেক ভুক্তভোগী জানান, কাজে অনীহা প্রকাশ করলে অনেককে নির্যাতন কক্ষে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ভয় ও নির্যাতনের মুখে অনেকেই বাধ্য হয়ে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকতেন।

ভুক্তভোগীদের মতে, এসব স্ক্যাম সেন্টার কার্যত বন্দিশিবিরের মতো পরিচালিত হয়। বাইরে যাওয়ার স্বাধীনতা নেই, যোগাযোগের সুযোগ সীমিত এবং প্রতিনিয়ত চাপের মধ্যে কাজ করতে হয়। কেউ পালানোর চেষ্টা করলে বা নির্দেশ অমান্য করলে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়।

‘আম-জাম-তেঁতুল’ কোডের রহস্য

বিজ্ঞাপন

বিদেশে পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়ায় বিশেষ কোড-নেম ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের দাবি, যাত্রাপথে প্রত্যেককে একটি নির্দিষ্ট কোড দেওয়া হতো। কারও নাম ছিল ‘আম’, কারও ‘জাম’, আবার কারও ‘তেঁতুল’। এই পরিচয় ব্যবহার করেই তারা বিমানবন্দরের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করতেন।

মানিকগঞ্জের ওই তরুণের কোড-নেম ছিল ‘তেঁতুল’। তার দাবি, এই কোড ব্যবস্থার মাধ্যমে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই বিদেশযাত্রার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছিল।

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কম্বোডিয়াগামীদের ক্ষেত্রে এমন কোড ব্যবহারের বিষয়টি এখনো তদন্তে স্পষ্টভাবে নিশ্চিত হয়নি। যদিও অন্য কিছু মানবপাচার মামলায় অনুরূপ কৌশলের তথ্য পাওয়া গেছে।

বিজ্ঞাপন

বৈধ কাগজপত্রের আড়ালেও প্রতারণা

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অনেক ক্ষেত্রে বিদেশগামীদের কাছে থাকা বিএমইটি কার্ড ও অন্যান্য নথি বৈধ পাওয়া গেলেও চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ কাগজপত্রের একটি অংশ সত্য হলেও পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রতারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠতে পারে।

সাইবার প্রতারণা চক্রগুলো সাধারণত প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ, ইংরেজিতে যোগাযোগ করতে সক্ষম এবং অনলাইনভিত্তিক কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন তরুণদের টার্গেট করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ কিংবা পরিচিতজনের মাধ্যমে উচ্চ বেতন, উন্নত জীবনযাপন, দ্রুত পদোন্নতি ও আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের লোভ দেখিয়ে তাদের আকৃষ্ট করা হয়।

বিজ্ঞাপন

উদ্ধার অভিযানে বেরিয়ে আসছে বাস্তবতা

সম্প্রতি কম্বোডিয়ায় কয়েকটি স্ক্যাম কম্পাউন্ডে অভিযান চালায় দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ভুক্তভোগীদের দাবি, ওই অভিযানের সময় অনেক অপারেটর পালিয়ে গেলে তারা মুক্ত হওয়ার সুযোগ পান।

ফেরত আসা বাংলাদেশিদের তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ জুন ৩৭ জন, ১৩ জুন ৫৪ জন এবং ১৭ জুন আরও ৭৮ জন দেশে ফিরে এসেছেন। এর আগে মিয়ানমারের সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকেও একাধিক বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য বলছে, গত দেড় বছরে প্রায় ১৫ হাজার ৯২১ জন বাংলাদেশি কর্মী চাকরির উদ্দেশ্যে কম্বোডিয়ায় গেছেন। ফলে সেখানে অবস্থানরত কর্মীদের নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

মানবপাচারের নতুন রূপ

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়ের সঙ্গে মানবপাচারের ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে। আগে যেখানে অনিয়মিত অভিবাসন বা শ্রমপাচার বেশি দেখা যেত, এখন তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে শিক্ষিত তরুণদের টার্গেট করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কম্পিউটার অপারেটর, কল সেন্টার কর্মী কিংবা অনলাইন কাস্টমার সার্ভিসের চাকরির বিজ্ঞাপন দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান, নিয়োগপত্র, ভিসা এবং সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির বৈধতা ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি।

তাদের মতে, বিদেশে যাওয়ার আগে সরকারি অনুমোদিত মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা এবং কোনো ধরনের সন্দেহজনক প্রস্তাব সম্পর্কে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ, বৈধ কাগজপত্রের আড়ালেও প্রতারণার ফাঁদ লুকিয়ে থাকতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সাইবার প্রতারণা চক্র সক্রিয় রয়েছে। তাই বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলেই যাচাই-বাছাই ছাড়া সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD