Logo

লাইনম্যান ফিরোজের অনিয়মের অন্ধকার সাম্রাজ্য

profile picture
বশির হোসেন খান
২৯ জুন, ২০২৬, ১৮:৫৯
লাইনম্যান ফিরোজের অনিয়মের অন্ধকার সাম্রাজ্য
ফাইল ছবি।

ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি)-এর মাতুয়াইল ডিভিশনকে ঘিরে নতুন করে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। অনুসন্ধানে লাইনম্যান মেট মো. ফিরোজ শেখ (পরিচিতি নম্বর-২১২৮৩)-এর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, মিটার টেম্পারিং, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ, সরকারি রাজস্ব ফাঁকি এবং বহিরাগতদের মাধ্যমে অফিসের কারিগরি কার্যক্রম পরিচালনার মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি ফিরোজ।

বিজ্ঞাপন

অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, মাতুয়াইল ডিভিশনে যোগদানের পর থেকে ফিরোজ শেখকে কেন্দ্র করে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু গ্রাহককে অবৈধ সুবিধা দেওয়া, অনিয়মিতভাবে মিটার টেম্পারিং, অনুমোদন ছাড়াই সংযোগ স্থানান্তর এবং ফিডার পরিবর্তনের মতো কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

বিনিময়ে নিয়মিত মাসোয়ারা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। একাধিক অভিযোগকারী দাবি, সানারপাড়, দক্ষিণ ডেমরা ও সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার বিভিন্ন গ্রাহকের কাছ থেকে মাসিক ভিত্তিতে টাকা নেওয়া হচ্ছে। কয়েকটি বাণিজ্যিক মিটারের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক অটোরিকশা চার্জিং, আবাসিক সংযোগে বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং অনুমোদনহীন লোড বৃদ্ধির অভিযোগ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন ও বিদ্যুৎ মন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন একাধিক ভুক্তভুগি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডিপিডিসির দুই উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আবুল বাশার তালুকদার ও মো. মঞ্জুরুল কাদের, লাইনম্যান মেট মো. ওবাইদুর রহমান টিপু এবং ড্রাইভার মো. উজ্জ্বল মিয়া। তারা সবাই এই সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য। গ্রাহকদের জিম্মি করে অবৈধ সুবিধা আদায় করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়াও এই সব কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নীরবে সংযোগ, মিটার পরিবর্তন ও অন্যান্য কারিগরি কাজ সম্পন্ন করছেন। সরজমিন ঘুরে এ সব বিষয়ের সত্যতাও পাওয়া যায়। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব অনিয়মের ফলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং নিয়ম মেনে চলা গ্রাহকরা বৈষম্যের শিকার হয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মচারীর অভিযোগ, টাকা ছাড়া অনেক সেবা মেলে না মাতুয়াইল ডিভিশনে। এর কেউ প্রতিবাদ করলে প্রশাসনিক কিংবা সামাজিক চাপের মুখে পড়ার আশঙ্কা থাকায় অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চান না। এ মো. ফিরোজ শেখ তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।

তিনি বলেন, দীর্ঘ চাকরি জীবনে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর দাবি, সম্পদের উৎস বৈধ। তবে অতীতে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত কমিটির সদস্যরা টাকা ম্যানেজ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে ডিপিডিসি’র কোম্পানি সচিব(অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ হাসনাত চৌধুরীর নেতৃত্বে মাতুয়াইল ডিভিশনে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পড়ে তুলেছেন। সিন্ডিকেটের সদস্যরা মাসোয়ারা দিয়ে চেয়ার টিকিয়ে রেখেছেন বলে জানা গেছে। মো. ফিরোজ শেখ নিজেও স্বীকার করেন। হাসনাত স্যার পাশে আছে বলে কোনো কিছুতেই চিন্ত করি না। আমার সম্পর্কে জানতে হলে স্যারকে জিজ্ঞেস করেন। তাহলেই বুঝবেন আমার অবস্থা।

অভিযোগ উঠেছে, দুর্নীতি করে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন ফিরোজ শেখ। তার গ্রামে রয়েছে আলিশান বাড়ি, ১০ বিঘা ফসলি জমি ও ঢাকায় রয়েছে নামে বেনামে বিপুল সম্পদ। ফিরোজ শেখের ব্যাংক হিসেবেও রয়েছে অস্বাভাবিক নেনদেন। মাতুয়াইল ডিভিশনে যোগ দিয়ে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

বিজ্ঞাপন

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২২ সালের ফিরোজ শেখ শীতলক্ষ্যা ডিভিশন থেকে মাতুয়াইল ডিভিশনে বদলি হয়। আর মাতুয়াইল ডিভিশনের লাইনম্যান ফিরোজ শেখ। আগের থেকে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রিত করতেন তিনি। মাতুয়াইল ডিভিশনে সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাড়িয়ে থাকে ফিরোজ এর নেতৃত্বে একটি দালাল চক্র। সেবা দিতে গ্রাহকরা নানা কৌশলী এই চক্রের ফাঁদে পড়তে হয়। নতুন সংযোগ নিতে হয়রানির স্বীকার হচ্ছে বলে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে গতকাল শনিবার সকালে মো. হারুন অর রশিদ রিকশা গ্যারেজে গিয়ে দেখা যায় সানারপাড়, ডেমরা গ্রাহক নম্বর ৩৫৭৩০৭১৮, বাণিজ্যিক মিটার ৭০ থেকে ৮০ টি অটোরিকশা চার্জ দিচ্ছেন। রিচার্জ করেন নাম মাত্র টাকা। মো. আনোয়ার আলী (গ্রাহক নম্বর ৩০০১৫৭৫০) সানারপাড়, সিদ্ধিরগঞ্জ। এই বাণিজ্যিক মিটার দিয়ে চলছে একটি কারখানা। মিসেস সুফিয়া খাতুন(গ্রাহক নাম্বার ৩৫৭১৪৮৬২) দক্ষিণ ডেমরা, মো. শামসুদ্দিন(গ্রাহক নাম্বার ৩০২৮৩৬২০) ১১৫ সানারপাড় নারায়ণগঞ্জ। আবাসিক দিয়ে প্রতি মাসে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা রিচার্জ করা হত। আর সেই মিটার টেম্পারিং করা হয়েছে অফিসের অনুমতি ছাড়াই। এ সব মিটার থেকে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকায় আয় করেন ফিরোজ শেখ ও তার চক্রের সদস্যরা।

এ বিষয় ডিপিডিসি’র কোম্পানি সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ হাসনাত চৌধুরীর মুঠো ফোনে কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD