ওসির দাপটে ফতুল্লার সংখ্যালঘুরা দিশেহারা

জমির দলিল দে, নইলে জীবন দে এমন হুমকি ধমকি প্রতিনিয়তই দিচ্ছেন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাহবুব আলম। তার দাপটে আতঙ্কিত সংখ্যালঘু পরিবার। শুধু জমি দখলই নয়, তার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই।
বিজ্ঞাপন
টাকা খেয়ে মামলা না নেওয়া, মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়াসহ বিস্তর অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। হয়রানির ভয়ে ভুক্তভোগী অনেকে মুখ খুলতে চান না। তবে এ নিয়ে সরব রয়েছেন সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্যরা। তারা বলছেন, জীবন যাবে জমি ছাড়বো না। পৈত্রিক সম্পত্তি ছাড়বো কেনো?
জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় দুবাই ফেরত এক প্রবাসী যুবককে অপহরণ, স্বর্ণ ও নগদ টাকা লুট এবং ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় ওসি মামলা নেয়নি। পরে মামলাটি সরাসরি এজাহার (এফআইআর) হিসেবে রেকর্ড করার নির্দেশ দেন আদালত। সেই নির্দেশ অমান্য করেন ওসি।
এমন রহস্যজনক ভূমিকার কারণে ২৪ মে বিকালে নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (ফতুল্লা আমলি আদালত) আদালতের বিচারক এম সাইফুল ইসলাম এক আদেশে ফতুল্লা মডেল থানার ওসিকে শোকজ করা হয়। একই সঙ্গে মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, মুন্সীগঞ্জ সদর থানার চর মুক্তারপুর এলাকার সাহিদা বেগমের ছেলে বাবু (২৫) দীর্ঘদিন দুবাইয়ে কর্মরত ছিলেন। গত ১৪ মে তিনি দুবাই থেকে দেশে ফেরার পথে রাত সাড়ে ১১টার দিকে ফতুল্লা থানাধীন কাশীপুর ব্রিজের পাশে আসামিরা পরিকল্পিতভাবে প্রবাসীর গাড়ি গতিরোধ করে।
বিজ্ঞাপন
অস্ত্রের মুখে বাবুকে (২৫) অপহরণ করে গোগনগরের লালচানের ছেলে সাদ্দাম হোসেন ও আকরাম প্রধানসহ অজ্ঞাতনামা ৫-৭ জন তাদের আস্তানায় নিয়ে আটকে রাখে। সেখানে তল্লাশি চালিয়ে প্রবাসীর কাছে থাকা নগদ ৫ পাঁচ লাখ টাকা এবং ১০ ভরি স্বর্ণালংকার লুটে নেয় এবং মুক্তিপণ বাবদ পরিবারের কাছে দশ লাখ টাকা দাবি করে।
নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই গুরুতর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিজ্ঞ আদালত ২৪ মে দুপুর ১২টায় ফতুল্লা মডেল থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন- ভিকটিম বাবুকে আসামিরা আদৌ অপহরণ করেছে কিনা, সেই বিষয়ে ৩ ঘণ্টার মধ্যে একটি প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার জন্য। কিন্তু আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ উপেক্ষা করে নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও ফতুল্লা ওসির পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি, এমনকি তদন্তের অগ্রগতি নিয়েও আদালতকে কিছু জানানো হয়নি। এদিকে আদালতের নির্দেশের পর পুলিশ তড়িঘড়ি করে অপহৃত প্রবাসী বাবুকে উদ্ধার করেন।
সম্প্রতি বিতর্কিত ইট ও বালু ব্যবসায়ী সালাউদ্দিন নামের এক আসামিকে ফতুল্লার মাসদাইর কবরস্থান এলাকা থেকে আটক করে প্রায় ১০ ঘণ্টা থানার হাজতে রাখা হয়। এরপর রাতের আঁধারে প্রায় ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকার লেনদেনের মাধ্যমে তাকে মুক্তি ছেড়ে দেন ওসি।
বিজ্ঞাপন
তবে এই ঘটনা নিয়ে মিডিয়ার সামনে অভিযোগ করেন সালাউদ্দিন। তিনি বলেন, মান-সম্মান যা যাওয়ার গেছে, সাড়ে ৪ লাখ টাকাও গেলে আমি মুক্তি পেয়েছি। আমাকে ষড়যন্ত্রের জালে ফেলে ওসির পকেট ভারী করেছেন।
তবে অভিযোগ রয়েছে, আকলিমা (ছদ্মনাম) নামের এক নারীকে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় জোরপূর্বক ধর্ষণ করে পরবর্তীতে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে বারবার নির্যাতন চালায় এই সালাউদ্দিন। ভুক্তভোগীর দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে তাকে আটক করা হলেও শেষ পর্যন্ত অর্থের বিনিময়ে ‘মীমাংসা’ দেখিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে ওই নারী জানিয়েছেন তার সঙ্গে কোনো মীমাংসা হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অতিরিক্ত পুলিশ পুপার বলেন, একজন থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ধরনের ভয়াবহ অভিযোগ শুধু পুলিশের ভাবমূর্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, বরং সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে। আইন রক্ষার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাই যদি আইনের অপব্যবহার করেন, তাহলে বিচার মিলবে কোথায়?
বিজ্ঞাপন
এ ব্যাপারে ওসি মাহবুব আলম ঘটনা অস্বীকার করে বলেন, আমি নিয়মের বাইরে কিছু করি না। ওপার থেকে যেভাবে নির্দেশনা আসবে সেই ভাবে কাজ করি। আমি কারো জমি দখল কিংবা বালু ফেলে এটা মিথ্যা কথা। এটা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। কিছু সময় পরেই ওসি পক্ষ হয়ে ফোন করেন ভুমিদস্যু শাহ আলম(ছন্দনাম)। তিনি বলেন, ওসির বিরুদ্ধে নিউজ বন্ধ করুন। না হলে ফল খুব খারাপ।
এ বিষয় নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সীর কাছে ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেনি।
এ বিষয় নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মনিরুল ইসলাম রবী বলেন, ওসি কাউকে মানতে চায় না। সম্প্রতি তিনি আশাপূর্ণ মন্ডল ও পশুরাম মন্ডলের পৈত্রিক সম্পত্তি দখল করেছে। এটা কি ওসির কাজ। পুলিশ মানুষ নিরাপত্তা দিবে। আর ওসিকে দেখলে মানুষ ভয় পায়।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, যে সংখ্যালঘু জমি দখল করেছে ওসি। সেই জমিতে ডা. সোহেল ভবন তুলবে জনশ্রুতি আছে। দেশে কি কোনো আইন নাই? তাহলে কি জোর যার মুল্লুক তার? ডা. বাছেদুর রহমান সোহেল দলিল মূলে মালিক হয় কিভাবে। যাদের ওয়ারিশ দেখিয়ে গত কয়েক মাস আগে দলিল করলো। তারা গত ৫০ বছর আগে মারা গেছে।
অন্যদিকে আরেক জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, থানায় মামলা মীমাংসার সুযোগ নেই। থানা শুধু মামলা নিতে পারবে। বিচারের দায়িত্ব আদালতের। এ বিষয় ডা. বাছেদুর রহমান সোহেল মুঠোফোনে কল দিলে উত্তর মেলেনি।
এ ব্যাপারে জমির মালিক সংখ্যালধু পরিবারের সদস্য আশাপূর্ণ মন্ডল ও পশুরাম মন্ডলের পৈত্রিক সম্পত্তি দাবি করেন, জমির ইতিহাস ও প্রমাণপত্র দেখান। তিনি বলেন, আমার বাপ-দাদা ভিটে মাটি আমি খেতে পারবো না। আমরা সংখ্যালঘু বলে আমাদের পাশে কেউ থাকবে না। আমি মানোনীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সু-দৃষ্টি কামনা করছি।








