Logo

গণপূর্তে হাসিনার আশির্বাদে হাতিলের সাম্রাজ্য

profile picture
বশির হোসেন খান
১ জুলাই, ২০২৬, ১২:১৫
গণপূর্তে হাসিনার আশির্বাদে হাতিলের সাম্রাজ্য
ফাইল ছবি।

বঙ্গভবন থেকে হাসপাতাল, আদালত থেকে সার্কিট হাউজ সরকারি স্থাপনার আসবাবপত্র ও ইন্টেরিয়র সরবরাহ খাতে যেন অঘোষিত একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে হাতিল ফার্নিচার।

বিজ্ঞাপন

আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার আর্শিবাদে হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক স্বৈরাচারের দোসর খোরশেদ আলম গড়ে তুলেন কালো টাকার সম্পদ।গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গণপূর্ত অধিদপ্তরের বড় বড় প্রকল্পে প্রতিষ্ঠানটির ধারাবাহিক উপস্থিতি এখন সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

সাম্প্রতিক জেলা হাসপাতাল উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্রে দেশের জেলা হাসপাতালগুলোকে ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ ও সংস্কার প্রকল্পের ১২টির মধ্যে ৮টিতে সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়ার পরও সব কার্যাদেশ না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে প্রতিষ্ঠানটি। ১২টির কাজের মধ্যে ৮টি পেলেও বাকি ৭টি না পেয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর ওপর খেপেছেন হাতিলের ব্যবস্থপনা পরিচালক। তাদের একচেটিয়া ব্যবসার হাতিয়ার হলেন বেশ কয়েকজন দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীরা।

জানা গেছে, ২০২৬ সালে দেশের জেলা হাসপাতালগুলোকে ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ ও সংস্কার প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করে গণপূর্তের ই/এম কাঠের কারখানা বিভাগ। গত ৮ জুন পর্যন্ত আহ্বান করা মোট ১২টি দরপত্রের ৮টিতেই সর্বনিম্ন দরদাতা হয় হাতিল ফার্নিচার। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি ১টি কাজের কার্যাদেশ দিলেও বাকি ৭টি কাজের আদেশ ঝুলে আছে।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগ উঠেছে, কাজ আটকে যাওয়ার ঘটনায় প্রভাব খাটাতে ঊর্ধ্বতন দপ্তরে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে তারা। যে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর সরকারি কাজের সিংহভাগ বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ, সেই প্রতিষ্ঠানই এখন কার্যাদেশ না পেয়ে প্রশাসনিক মহলে চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে শুরু করে মডেল মসজিদ প্রকল্প, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সার্কিট হাউজ এবং বিভিন্ন বিচারিক স্থাপনার আসবাবপত্র সরবরাহে বারবার দেখা গেছে একই প্রতিষ্ঠানের নাম। ফলে প্রশ্ন উঠেছে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় কি সত্যিই উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা রয়েছে, নাকি একটি প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হয়েছে বিশেষ সুবিধার বলয়?

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গণপূর্তের কিছু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদে হাতিল এমন অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে অধিকাংশ বড় প্রকল্পে তাদের উপস্থিতি প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠেছে। ফলে অন্য প্রতিযোগীরা কার্যত অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন।

বিজ্ঞাপন

এদিকে গণপূর্তের (ই/এম) নির্বাহী প্রকৌশলী জোবায়ের বিন হায়দার এসব অভিযোগ নাকচ করে বলেছেন, দরপত্র মূল্যায়নের প্রক্রিয়া এখনও চলমান এবং চূড়ান্ত অনুমোদন ছাড়া কোনো কাজের কার্যাদেশ দেওয়া সম্ভব নয়। তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে বছরের পর বছর সরকারি প্রকল্পের পর প্রকল্প নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হলো? এর পেছনে কি শুধুই প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা, নাকি রয়েছে প্রভাব, যোগাযোগ ও প্রশাসনিক আশীর্বাদের দীর্ঘ ছায়া? সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি। নিজের দুর্নীতি আড়াল করতেই নির্বাহী প্রকৌশলী জোবায়ের বিন হায়দারের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলে গণপূর্তের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) জোন আশ্রাফুল হকের কাছে আবেদন করেন। সেখানে তিনি জেলা হাসপাতালগুলোকে ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ ও সংস্কার প্রকল্পের পরিচালক থেকে শুরু করে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীসহ মন্ত্রী সচিবের টেবিলে লিখিত ভাবে নালিশ করেন হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেডের কোম্পানি সেক্রেটারি মো. রেজাউল করিম।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী বলেন, হাতিলের সঙ্গে গণপূর্তের বেশ কয়েকজন প্রকৌশলীরা জড়িত রয়েছে। হাতিল যখন গণপূর্তে প্রথম কাজ শুরু করেন তখন টাকার বিনিময়ে ভুয়া কাজপত্র তৈরি করে কাজ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এর পর থেকে শুরু হয় হাতিলের গণপূর্তে একচেটিয়া দখল দারিত্ব। টার্গেট করেন নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে শুরু প্রধান প্রকৌশলীকে টাকার দিয়ে ম্যানেজ করা। আর সেটা করতে সক্ষম হয়েছেন হাতিল। তাদের কাজের গুণগত মান ঠিক না থাকলে কাজ পেতেন তারা।

এ বিষয়ে হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক খোরশেদ আলমের মুঠো ফোনে কল দিলে তিনি রিসিভ করেনি।

বিজ্ঞাপন

এ ব্যাপারে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, একটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি টেন্ডারে ক্রয়ে বড় অংশ পেলে তা সঠিক ভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। একচেটিয়া কাজ মানেই স্বচ্ছতার অভাব। তাই সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় ও টেন্ডারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

সুশাসন বিশ্লেষক জান্নাতুর রহমান বলেন, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় প্রকৃত প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে দরপত্র মূল্যায়ন, কার্যাদেশ প্রদান এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়ম বা প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠলে তা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD