রিগ টেন্ডার জালিয়াতির : বাপেক্সের অনিয়মের রাজা পিডি আনিস

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম অনুসন্ধান ও উৎপাদন কোম্পানি (বাপেক্স)-এর ২০০০ অশ্বশক্তির খননযন্ত্র ক্রয়কে কেন্দ্র করে অনিয়ম, অস্বচ্ছতা ও যোগ্যতা নির্ধারণে বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। রিগ টেন্ডার জালিয়াতির অনিয়মের মুকুট বিহীন সম্রাট প্রকল্প পরিচালক আনিসুর রহমান। রাষ্ট্রীয় অর্থে পরিচালিত শতকোটি টাকার এই ক্রয় প্রক্রিয়াকে ঘিরে একের পর এক প্রশ্ন উঠলেও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ না হওয়ায় বাড়ছে বিতর্ক।
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে একাধিক ঠিকাদার সাক্ষরিত এক অভিযোগ জমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
গত ২৩ জুন দৈনিক জনবাণী পত্রিকায় “বাপেক্সেও টেন্ডারের সচ্ছতা নিয়ে সংশয়” শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। সেই সংবাদের বিপরীতে দৈনিক জববাণীকে একটি প্রতিবাদ লিপি পাঠান বাপেক্স মহাব্যবস্থাপক ও কোম্পানি সচিব মো. মঞ্জুরুল হক। সেখানে তিনি দাবি করেছে, রিগ ক্রয় প্রকল্প একটি প্রকৌশল, সংগ্রহ ও নির্মাণভিত্তিক প্রকল্প নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ দায়িত্বভিত্তিক প্রকল্প।
তবে সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, আন্তর্জাতিকভাবে পূর্ণাঙ্গ দায়িত্বভিত্তিক প্রকল্পেও প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি সাধারণত মূল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেই সংগ্রহ করা হয়। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এই খননযন্ত্রের মূল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা, কারিগরি সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং কোন নীতিমালার ভিত্তিতে যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এদিকে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়েও দেখা দিয়েছে নানা সংশয়। জানা গেছে, ১৫টি প্রতিষ্ঠান দরপত্রের নথি সংগ্রহ করলেও শেষ পর্যন্ত কতটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে, কতটি বিভিন্ন মূল্যায়ন ধাপে বাদ পড়েছে এবং কী কারণে তাদের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই তথ্য প্রকাশ না করায় প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হয়েছিল কি না, তা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে। আরও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদস্য এডভোকেট বেলায়েত বেলালের একটি আইনি নোটিশ।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগ রয়েছে, যোগ্যতার শর্ত ব্যাখ্যা চেয়ে পাঠানো নোটিশের কোনো লিখিত জবাব সংশ্লিষ্ট আবেদনকারী পাননি। যদিও বাপেক্স দাবি করেছে, যথাযথ জবাব প্রদান করা হয়েছে। এই দুই বিপরীত অবস্থানের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন সংশ্লিষ্টদের। তারা বলছে, এখনো নোঠিশের কোনো জবাব পাইনি। যদি দিয়ে থাকে সেই ক্ষেত্রে লুকোচুরির কিছু নেই। প্রকাশ্যে আনা উচিত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অতীতে একই ধরনের খননযন্ত্র প্রকল্পে যেসব প্রকৌশল, সংগ্রহ ও নির্মাণভিত্তিক ঠিকাদারকে যোগ্য বিবেচনা করে কাজ দেওয়া হয়েছিল, বর্তমান মূল্যায়নে তাদের মধ্যেই কেউ কেউ অযোগ্য হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন। যদি এমনটি হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠছে অতীতের মূল্যায়ন কি ত্রুটিপূর্ণ ছিল, নাকি বর্তমান মূল্যায়নের মানদণ্ড পরিবর্তন করা হয়েছে? পরিবর্তন হয়ে থাকলে তার নীতিগত ও লিখিত ভিত্তি কী?
এ পরিস্থিতিতে অতীত ও বর্তমানের যোগ্যতা নির্ধারণের মানদণ্ড একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পুনর্মূল্যায়নের দাবি উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
এদিকে একাধিক ঠিকাদার দাবি করেছেন বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. ফজলুল হক ও প্রকল্প পরিচালক আনিসুর রহমান টেন্ডার জালিয়াতি করেছেন। তারা তাদের পছন্দের দুই ঠিকাদারের মধ্যে যে কোনো একজনকে টার্গেট করেই কাজ দিয়ে সুবিধা আদায় করবেন।
আরও পড়ুন: ওসির দাপটে ফতুল্লার সংখ্যালঘুরা দিশেহারা
এ ব্যাপারে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদস্য এডভোকেট বেলায়েত বেলাল বলেন, নোটিশের জবাব এখনো পাইনি। জবাব না দিয়ে বাপেক্সেও এমডি ও প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না।
বিজ্ঞাপন
এ বিষয় বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. ফজলুল হক এর মুঠো ফোনে কল দিলে উত্তর মেলেনি। প্রকল্প পরিচালক আনিসুর রহমানের মুঠো ফোনে কল দিলে তিনি ফোন কেটে দেন। এমকি ক্ষুদেবার্তা পাঠিয়ে উত্তর মেলেনি।
জনক্রয় ও সুশাসন বিশ্লেষক জান্নাতুর রহমান মতে, রাষ্ট্রীয় অর্থে পরিচালিত বৃহৎ ক্রয়প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা আইনগত ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা। তার ভাষ্য, যোগ্যতা নির্ধারণের মানদণ্ড, মূল্যায়নের ভিত্তি, অযোগ্য ঘোষণার কারণ এবং আইনি নোটিশের লিখিত জবাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলে অধিকাংশ বিতর্কের অবসান ঘটতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রকল্পে নথিভিত্তিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ন হয় না, বরং জনগণের করের অর্থ ব্যবহারের ওপরও আস্থার সংকট তৈরি হয়। তাই বৃহৎ আর্থিক প্রকল্পে প্রতিটি সিদ্ধান্তের লিখিত ব্যাখ্যা ও মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করাই হওয়া উচিত সুশাসনের অন্যতম প্রধান অনুশীলন। রাষ্ট্রীয় অর্থ জনগণের সম্পদ। সেই অর্থে পরিচালিত প্রতিটি প্রকল্পে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, বরং সাংবিধানিক দায়বদ্ধতারও অংশ। তাই বক্তব্য নয়, নথিভিত্তিক তথ্য প্রকাশের মাধ্যমেই সব প্রশ্নের জবাব দেওয়া উচিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।








