Logo

বাংলাদেশে কীভাবে ঢুকছে বিদেশি সাপ-মাকড়সা?

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ জুলাই, ২০২৬, ১৭:৩১
বাংলাদেশে কীভাবে ঢুকছে বিদেশি সাপ-মাকড়সা?
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর মিরপুরের রূপনগরে সাম্প্রতিক এক অভিযানে বিপুলসংখ্যক বিদেশি প্রাণী উদ্ধারের পর দেশে অবৈধভাবে বন্যপ্রাণী আমদানি ও বিক্রির বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। বন বিভাগের অভিযানে বিষাক্ত ট্যারান্টুলা মাকড়সা, ম্যাক্সিকান ব্ল্যাক কিং স্নেকসহ বিভিন্ন প্রজাতির মোট ১ হাজার ১০৪টি বিদেশি প্রাণী উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠেছে, নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে এসব প্রাণী বাংলাদেশে প্রবেশ করছে এবং কেনই বা এগুলো আনা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া প্রাণীগুলোর মধ্যে বিষাক্ত ট্যারান্টুলা, কর্ন স্নেক, ডাম্পি ফ্রগ, লেপার্ড গেকো, সাইডনেক কচ্ছপসহ বিভিন্ন বিদেশি প্রজাতি রয়েছে। এসব প্রাণীর অনেকগুলোই বিষাক্ত বা পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। জীববৈচিত্র্যের ওপর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব এবং রোগ সংক্রমণের আশঙ্কায় বাংলাদেশে এসব প্রাণী আমদানির ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন কৌশলে বিদেশ থেকে এসব প্রাণী দেশে আনা হচ্ছে। বাংলাদেশ অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক আদনান আজাদ বলেন, বর্তমানে অনেকেই শখের বসে বিদেশি সাপ, ট্যারান্টুলা মাকড়সা এমনকি আফ্রিকার ব্যাঙও পালন করছেন। তাঁর মতে, বৈধভাবে আনা যায় এমন কিছু প্রাণীর চালানের আড়ালে অবৈধ প্রাণীও দেশে প্রবেশ করছে।

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, বিমানবন্দরে স্বর্ণ বা অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি থাকলেও পোষা প্রাণী আমদানির ক্ষেত্রে তদারকিতে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা বিদেশি প্রাণী দেশে আনছেন বলে তাঁর ধারণা।

অন্যদিকে বাংলাদেশ বন বিভাগ জানিয়েছে, বিমানবন্দর থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ বন্যপ্রাণী কেনাবেচা ও সংরক্ষণের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের বন্যপ্রাণী পরিদর্শক আব্দুল্লাহ-আস-সাদিক জানান, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বন্যপ্রাণী অবৈধভাবে আমদানি, রপ্তানি, ক্রয়-বিক্রয়, সংরক্ষণ কিংবা পরিবহন দণ্ডনীয় অপরাধ।

তিনি জানান, কয়েক দিন আগেও রাজধানীর মিরপুরে পৃথক অভিযানে আট প্রজাতির ৪২টি দেশীয় বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশ থেকে অবৈধভাবে আনা প্রাণীর বিরুদ্ধেও নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, রূপনগরের একটি আবাসিক ভবনের ছাদে অ্যাকুরিয়াম তৈরি করে বিক্রির উদ্দেশ্যে বিদেশি প্রাণীগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছিল। অভিযানে ১ হাজার ১০৪টি প্রাণী উদ্ধার হলেও সেখানে প্রায় ছয় হাজার প্রাণী ছিল বলে জানা গেছে। অর্থাৎ অভিযান চালানোর আগেই সাপ, মাকড়সা, ব্যাঙ ও কচ্ছপসহ প্রায় পাঁচ হাজার প্রাণী বিক্রি হয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের প্রাণী বাংলাদেশে আনার পেছনে দুটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমত, দেশে বিদেশি প্রাণী পোষার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশকে অনেক ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী দেশে প্রাণী পাচারের একটি ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আদনান আজাদের ভাষ্য, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রাণী এনে পরে স্থলপথে সেগুলো ভারতে পাচার করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া মনে করেন, বিদেশি প্রাণী অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করলে তা শুধু জীববৈচিত্র্যের জন্য নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি তৈরি করতে পারে। তাঁর মতে, কোনো বিদেশি প্রাণী নতুন পরিবেশে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে বা নতুন রোগ ছড়াবে কি না, তা যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পোষা প্রাণী নেওয়ার সুযোগ থাকলেও সেক্ষেত্রে কঠোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, কোয়ারেন্টাইন এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। কিন্তু বন্যপ্রাণী বা বিপন্ন প্রজাতির ক্ষেত্রে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই আরও কঠোর নিয়ম কার্যকর রয়েছে।

বিমানবন্দরে বন্যপ্রাণী শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে বিশেষায়িত ইউনিট গঠনেরও পরামর্শ দিয়েছেন আদনান আজাদ। তাঁর মতে, এতে বৈধ ও অবৈধ প্রাণী সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হবে এবং চোরাচালান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

বিজ্ঞাপন

তবে বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের দাবি, বিমানবন্দরে নিয়মিত তল্লাশি চালানো হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে অ্যাকুরিয়াম মাছ বা অর্কিডের চালানের ভেতরে লুকিয়ে আনা অবৈধ প্রাণীও জব্দ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী অবৈধভাবে বন্যপ্রাণী আমদানি, রপ্তানি বা পাচারের অপরাধে সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD