Logo

যেসব দেশে আজও নেই সাপ; কেন পৌঁছতে পারেনি সরীসৃপ?

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
৫ জুলাই, ২০২৬, ১৭:৩০
যেসব দেশে আজও নেই সাপ; কেন পৌঁছতে পারেনি সরীসৃপ?
ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীর প্রায় সব মহাদেশ ও দেশে কোনো না কোনো প্রজাতির সাপের দেখা মিললেও কয়েকটি দেশ ও অঞ্চল আজও স্বাভাবিকভাবে স্থল সাপশূন্য। নিউজিল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, আইসল্যান্ড, গ্রিনল্যান্ড, অ্যান্টার্কটিকা এবং হাওয়াইয়ের মতো স্থানে স্থানীয় সাপের অস্তিত্ব নেই। এর পেছনে কোনো পৌরাণিক কাহিনি নয়, বরং ভূগোল, জলবায়ু, বিবর্তন এবং প্রাকৃতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বে বর্তমানে চার হাজারেরও বেশি প্রজাতির সাপ রয়েছে। তবুও পৃথিবীর কিছু বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ও মেরু অঞ্চলে এ প্রাণী কখনোই স্থায়ীভাবে বসতি গড়তে পারেনি। গবেষকদের মতে, দীর্ঘ সময়ের বিবর্তন, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং প্রতিকূল পরিবেশই এর মূল কারণ।

নিউজিল্যান্ড: সমুদ্রই সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক বাধা

সাপমুক্ত দেশের তালিকায় সবচেয়ে পরিচিত নাম নিউজিল্যান্ড। প্রায় আট কোটি বছর আগে দেশটি প্রাচীন সুপারকন্টিনেন্ট গন্ডওয়ানা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সে সময় আধুনিক সাপের বিস্তার এখনকার মতো ছিল না। ফলে সাপ সেখানে পৌঁছানোর সুযোগই পায়নি।

বিজ্ঞাপন

পরবর্তীতে চারপাশের বিশাল সমুদ্র স্থল সাপের জন্য অতিক্রম করা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। বর্তমানে দেশটির কঠোর বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থার কারণে সাপ আমদানি আইনত নিষিদ্ধ। কারণ, সাপ প্রবেশ করলে নিউজিল্যান্ডের অনন্য পাখি, টিকটিকি ও অন্যান্য দেশীয় প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে।

যদিও মাঝে মধ্যে সমুদ্রের সাপ উপকূলীয় পানিতে ভেসে আসে, তারা স্থলভাগে স্থায়ীভাবে বসবাস করে না।

আয়ারল্যান্ড: সেন্ট প্যাট্রিক নয়, বরফ যুগের প্রভাব

বিজ্ঞাপন

জনপ্রিয় লোককাহিনিতে বলা হয়, সেন্ট প্যাট্রিক আয়ারল্যান্ড থেকে সব সাপ তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তবে বিজ্ঞানীরা এই গল্পকে ঐতিহাসিকভাবে গ্রহণযোগ্য মনে করেন না।

গবেষকদের মতে, শেষ বরফ যুগে আয়ারল্যান্ডের অধিকাংশ এলাকা বরফে আচ্ছাদিত ছিল। পরে বরফ গললেও দ্বীপটি দ্রুত ইউরোপের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে সাপ সেখানে পৌঁছাতে পারেনি। এ পর্যন্ত আয়ারল্যান্ডে স্থানীয় সাপের কোনো জীবাশ্মও পাওয়া যায়নি।

আইসল্যান্ড: অতিরিক্ত ঠান্ডা পরিবেশ

বিজ্ঞাপন

সাপ শীতল-রক্তের প্রাণী। অর্থাৎ শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য তারা পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। আইসল্যান্ডের দীর্ঘ শীত, কম তাপমাত্রা এবং বিশেষ ভূপ্রকৃতি সাপের বেঁচে থাকার জন্য অনুকূল নয়। তাই সেখানে কখনোই স্বাভাবিকভাবে সাপের জনসংখ্যা গড়ে ওঠেনি।

গ্রিনল্যান্ড: বরফে ঢাকা বিশাল দ্বীপ

বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডের অধিকাংশ অংশ বরফে আচ্ছাদিত। বছরের বেশির ভাগ সময় তীব্র ঠান্ডা বিরাজ করে। পাশাপাশি খাদ্যেরও পর্যাপ্ত উৎস নেই। ফলে সাপের মতো সরীসৃপের জন্য সেখানে টিকে থাকা কার্যত অসম্ভব।

বিজ্ঞাপন

অ্যান্টার্কটিকা: সরীসৃপশূন্য একমাত্র মহাদেশ

পৃথিবীর একমাত্র মহাদেশ যেখানে কোনো স্থানীয় সরীসৃপ নেই, সেটি অ্যান্টার্কটিকা। বছরের অধিকাংশ সময় তাপমাত্রা হিমাঙ্কের অনেক নিচে থাকে। এমন পরিবেশে শুধু সাপ নয়, অধিকাংশ সরীসৃপের বেঁচে থাকাই সম্ভব নয়।

হাওয়াই: বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বিশেষত্ব

বিজ্ঞাপন

প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে অবস্থিত হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জেও স্থানীয় স্থল সাপ নেই। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে সাপ সেখানে স্বাভাবিকভাবে পৌঁছাতে পারেনি। স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় বর্তমানে সাপ আমদানি বা পালনেও কঠোর আইনি বিধিনিষেধ রয়েছে। মাঝে মধ্যে সমুদ্রের সাপ উপকূলীয় জলে দেখা গেলেও তারা স্থলভাগে বসতি গড়ে না।

কেন কিছু দেশে সাপ নেই?

বিজ্ঞানীদের মতে, চারটি প্রধান কারণ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে—

বিজ্ঞাপন

ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা: সমুদ্রবেষ্টিত দ্বীপে স্থল সাপ পৌঁছাতে পারেনি।

বরফ যুগের প্রভাব: বরফ গলার পর অনেক অঞ্চল মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

প্রতিকূল জলবায়ু: অত্যন্ত ঠান্ডা পরিবেশে সাপের টিকে থাকা সম্ভব নয়।

বিজ্ঞাপন

কঠোর বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থা: বিশেষ করে নিউজিল্যান্ড ও হাওয়াইয়ে সাপ প্রবেশ রোধে কঠোর আইন কার্যকর রয়েছে।

বিবর্তনের সময়কালও গুরুত্বপূর্ণ

গবেষকদের মতে, পৃথিবীতে সাপের বিবর্তন শুরু হয় প্রায় ১২ থেকে ১৬ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে। আধুনিক সাপের পূর্বপুরুষ ছিল টিকটিকি-জাতীয় সরীসৃপ। দীর্ঘ বিবর্তনের মাধ্যমে তাদের পা বিলুপ্ত হয় এবং দেহ লম্বা ও নমনীয় হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞাপন

তবে পৃথিবীর সব স্থানে সাপ সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। কোনো দ্বীপ যদি মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এমন সময়ে, যখন সেখানে সাপ এখনো পৌঁছায়নি, তাহলে পরবর্তী সময়েও স্বাভাবিকভাবে সেখানে সাপের বসতি গড়ে ওঠার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে। বিজ্ঞানীরা এটিকে ইভোলিউশনারি টাইমিং বলে অভিহিত করেন।

বরফ যুগ বদলে দিয়েছে ইউরোপের ইতিহাস

প্রায় ২৬ লাখ বছর আগে শুরু হওয়া প্লাইস্টোসিন বরফ যুগে উত্তর ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বরফে ঢাকা পড়ে। আয়ারল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। পরে বরফ গলার পর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় এসব অঞ্চল মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে ইউরোপে সাপ থাকলেও তারা ওই দ্বীপগুলোতে পৌঁছাতে পারেনি।

বিজ্ঞাপন

ঠান্ডা আবহাওয়া কেন বড় বাধা?

সাপ নিজের শরীরের তাপ উৎপন্ন করতে পারে না। দীর্ঘ সময় কম তাপমাত্রায় থাকলে তাদের বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যায়, খাদ্য হজম ব্যাহত হয়, চলাচল ও শিকার করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং প্রজননেও সমস্যা দেখা দেয়। ফলে স্থায়ী জনসংখ্যা গড়ে ওঠে না।

খাদ্য ও বাস্তুতন্ত্রের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ

কেবল উপযুক্ত জলবায়ু থাকলেই কোনো প্রাণী টিকে থাকতে পারে না। তাদের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য, নিরাপদ আশ্রয় এবং প্রজননের অনুকূল পরিবেশও প্রয়োজন। ইঁদুর, ব্যাঙ, টিকটিকি, ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী কিংবা পাখির ডিমের মতো খাদ্যের অভাবে অ্যান্টার্কটিকার মতো অঞ্চলে সাপের টিকে থাকার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই।

জীববিজ্ঞানীদের মতে, কোনো দেশে সাপ থাকবে কি না, তা মূলত চারটি বিষয়ে নির্ভর করে— অঞ্চলটি কখন মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে, সেই সময় সাপ সেখানে পৌঁছেছিল কি না, স্থানীয় জলবায়ু সাপের উপযোগী কি না এবং সেখানে পর্যাপ্ত খাদ্য ও বাস্তুতন্ত্র রয়েছে কি না।

অর্থাৎ, কোনো দেশে সাপ না থাকার পেছনে অলৌকিক কোনো কারণ নেই। কোটি কোটি বছরের বিবর্তন, মহাদেশের স্থানান্তর, বরফ যুগ, জলবায়ুর পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারাবাহিক প্রভাবই আজকের এই বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা তৈরি করেছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD