Logo

তীব্র দাবদাহে বড় ঝুঁকিতে দেশের শ্রমজীবী মানুষ

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৬ জুলাই, ২০২৬, ১৭:১৫
তীব্র দাবদাহে বড় ঝুঁকিতে দেশের শ্রমজীবী মানুষ
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন আরও প্রকট হয়ে উঠছে। অতিবৃষ্টি, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা বজ্রপাতের মতো দুর্যোগের পাশাপাশি এখন চরম তাপপ্রবাহও শ্রমজীবী মানুষের জীবনের জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতিকে শুধু মৌসুমি অস্বস্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি এখন জনস্বাস্থ্য, শ্রম অধিকার এবং অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট।

বাংলাদেশে কৃষক, দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালক, পরিবহনকর্মী, ইটভাটার শ্রমিক, গার্মেন্টসকর্মী ও পথের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বড় একটি অংশ খোলা আকাশের নিচে অথবা উচ্চ তাপমাত্রার পরিবেশে কাজ করেন। ফলে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের সবচেয়ে বড় ধাক্কা তাদের ওপরই এসে পড়ে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত গরমে শরীর থেকে দ্রুত পানি ও লবণ বেরিয়ে যাওয়ার কারণে পানিশূন্যতা, হিট এক্সহসশন, হিটস্ট্রোক, কিডনি জটিলতা, হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি এবং দীর্ঘমেয়াদি নানা স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ইতোমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কর্মক্ষেত্রে তাপজনিত ঝুঁকিকে অন্যতম বড় পেশাগত নিরাপত্তা সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তবে বাস্তবতা হলো, দেশের অধিকাংশ শ্রমজীবী মানুষের কাজ বন্ধ রাখার সুযোগ নেই। একদিন কাজ না করলে অনেক পরিবারের খাবারের ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অসুস্থতা কিংবা তীব্র গরম উপেক্ষা করেই জীবিকার তাগিদে কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য হন তারা।

বিশ্লেষকদের মতে, তাপপ্রবাহের প্রভাব কেবল পরিবেশগত নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচার ও শ্রম অধিকারেরও বিষয়। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যাদের অবদান সবচেয়ে কম, তারাই এখন এর সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি তাপজনিত অসুস্থতা মোকাবিলায় একটি জাতীয় নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছে, যেখানে প্রতিরোধ, চিকিৎসা প্রস্তুতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ, কাজের সময়সূচি, বাধ্যতামূলক বিরতি, নিয়োগকর্তার দায়িত্ব এবং কর্মস্থলে তাপঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো এখনো শ্রম আইন ও নীতিমালায় পর্যাপ্তভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যে তাপমাত্রাভিত্তিক কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, বাধ্যতামূলক বিশ্রাম, আগাম সতর্কবার্তা, হিট অ্যাকশন প্ল্যান এবং প্রচণ্ড গরমে কাজ সীমিত বা স্থগিত রাখার মতো ব্যবস্থা চালু হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো তাপপ্রবাহকে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।

বর্তমান শ্রম আইনে কর্মস্থলে "সহনীয় তাপমাত্রা" বজায় রাখার কথা বলা হলেও সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য তাপমাত্রা নির্ধারণ করা হয়নি। একই সঙ্গে তাপজনিত ঝুঁকি প্রতিরোধে বাধ্যতামূলক নীতিমালা, নির্দিষ্ট বিশ্রামের সময়, ছায়াযুক্ত বিশ্রামকেন্দ্র, পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা কিংবা শীতলায়নের সুবিধা নিশ্চিত করার আইনি বাধ্যবাধকতাও নেই। তাপজনিত অসুস্থতা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা মৃত্যুর ঘটনাগুলো নিয়মিত নথিভুক্ত করার ব্যবস্থাও এখনও গড়ে ওঠেনি।

বিজ্ঞাপন

এ ধরনের নীতিগত ঘাটতির প্রভাব শুধু শ্রমিকদের স্বাস্থ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর অর্থনৈতিক ক্ষতিও বড়। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে তাপজনিত শারীরিক ও মানসিক সমস্যার কারণে বাংলাদেশে প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে। এর ফলে দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ১৭৮ কোটি মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় শূন্য দশমিক চার শতাংশের সমান। উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া, কর্মঘণ্টা হারানো, চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি এবং শ্রমক্ষমতা হ্রাস—সব মিলিয়ে এ ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের নগর পরিকল্পনা ও অবকাঠামোও তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। কংক্রিট, টিনের ছাউনি, পিচঢালা সড়ক এবং ঘনবসতিপূর্ণ ভবনের কারণে শহরে তাপমাত্রা আরও বেড়ে যায়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিসে কর্মরত মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেলেও রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক কিংবা পথের বিক্রেতাদের দীর্ঘ সময় খোলা রোদে কাজ করতে হয়। অধিকাংশ এলাকায় বিশুদ্ধ পানীয় জল, ছায়াযুক্ত বিশ্রামস্থান বা জরুরি শীতলায়ন কেন্দ্র না থাকায় তাদের ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পায়।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এ পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের প্রতি বেশ কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শ্রম আইন ও পেশাগত নিরাপত্তা কাঠামোতে তাপঝুঁকিকে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাপমাত্রাভিত্তিক কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, নির্দিষ্ট সময়ে বাধ্যতামূলক বিশ্রাম, অতিরিক্ত গরমে কাজ সীমিত বা বন্ধ রাখার নির্দেশনা, কর্মস্থলে বিশুদ্ধ পানীয় জল, ছায়াযুক্ত বিশ্রামকেন্দ্র ও শীতলায়নের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিক ও নিয়োগকর্তাদের জন্য তাপজনিত অসুস্থতা, পানিশূন্যতা এবং প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও জরুরি।

বিজ্ঞাপন

এছাড়া শহর পরিকল্পনা, শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন এবং ভবন নির্মাণে তাপসহনশীল নকশাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। রিকশাচালক, পরিবহনকর্মী ও পথের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বিশ্রামকেন্দ্র এবং পানীয় জলের ব্যবস্থা এবং কৃষি খাতে মধ্যাহ্নের তীব্র গরম এড়িয়ে কাজের সময় পুনর্বিন্যাসের ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে শ্রমিক সুরক্ষা আর কেবল কল্যাণমূলক উদ্যোগ নয়; এটি মৌলিক মানবাধিকার। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে দেশের উন্নয়নের অর্জনও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD