চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতায় ব্যর্থ ১৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

টানা ভারী বৃষ্টি ও জোয়ারের পানির প্রভাবে আবারও জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। নগরের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পগুলোর দীর্ঘসূত্রতা ও কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল ভোর থেকে আজ সকাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে ৩৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে জোয়ারের পানি বেড়ে যাওয়ায় নগরের বিভিন্ন এলাকায় পানি দ্রুত নেমে যেতে পারেনি।
সবচেয়ে বেশি জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে কালুরঘাট সি অ্যান্ড বি এলাকা, পতেঙ্গার আকমল আলী সড়ক, উত্তর পতেঙ্গা ধুমপাড়া, বড় দিঘীর পাড়, হাটহাজারী সড়ক, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চকবাজার, পশ্চিম বাকলিয়া, কাটালগঞ্জ, কাপাসগোলা ও আগ্রাবাদসহ বেশ কয়েকটি এলাকা। কোথাও কোথাও হাঁটু, আবার কোথাও কোমরসমান পানি জমে যায়।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
এদিকে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রাখা হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী ৭২ ঘণ্টাও ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।
জলাবদ্ধতার কারণে নগরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। অফিসগামী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় সড়কে আটকে থাকেন। অনেক এলাকায় গণপরিবহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। যেসব রিকশা চলাচল করেছে, সেগুলোতে স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণ ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

চকবাজারের বাসিন্দা ও সরকারি কর্মকর্তা মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, প্রধান সড়কে কোনো খালি রিকশা পাওয়া যাচ্ছিল না। আগের সন্ধ্যায় হাঁটুসমান পানি মাড়িয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। তাঁর ভাষায়, জলাবদ্ধতার মধ্যে চলাফেরা এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
কাটালগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা মো. হাবিব জানান, অল্প বৃষ্টিতেই তাদের বাসার নিচতলায় পানি ঢুকে পড়ে। সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যেতেও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
পশ্চিম বাকলিয়ার বাসিন্দা ফজলুল হক বলেন, কেবি আমান আলী সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তিনি অফিসে যেতে পারেননি।
ভারী বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার কারণে নগরের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজ ছুটি ঘোষণা করেছে।
বিজ্ঞাপন
এদিকে, নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান চারটি বড় প্রকল্প এখনো শেষ না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তাদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বর্ষা মৌসুমে নগরবাসী কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছেন না।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ৩৬টি খাল পুনর্খনন ও উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় শুরুতে ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা থাকলেও পরে তা বেড়ে ৮ হাজার ৬২৬ কোটিতে পৌঁছেছে। প্রকল্পটির প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে কাজ সম্পন্ন করতে আরও এক বছর সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের ব্যয় সংশোধনের পর ১ হাজার ৬২০ কোটি টাকা থেকে কমে ১ হাজার ৫০৮ কোটি টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি ও মুদ্রার বিনিময় হার পরিবর্তনের কারণে পরিকল্পিত ২৩টির পরিবর্তে ২১টি স্লুইসগেট নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রক্রিয়াও চলছে।
বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে কর্ণফুলী নদীর তীরে রিং রোড ও প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় ২ হাজার ৩১০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ৭৭৯ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের অগ্রগতি বর্তমানে প্রায় ৮৬ শতাংশ। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে এটি শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকার বড়াইপাড়া খাল খনন প্রকল্পের প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তবে খাল উন্নয়ন প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থানে গত এপ্রিল থেকে কাজ বন্ধ রয়েছে। হিজরা খাল, জামাল খান খাল ও চাকতাই খালের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অস্থায়ী মাটির বাঁধ অপসারণের সরকারি নির্দেশনার পর নির্মাণকাজ স্থগিত করা হয়। এসব বাঁধ বর্ষার শুরুতে পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
সিডিএর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী অক্টোবরের আগে এসব স্থানে কাজ পুনরায় শুরু করা সম্ভব হবে না। ফলে চলতি বর্ষা মৌসুমজুড়ে চকবাজার, কাটালগঞ্জ, আগ্রাবাদসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
প্রকৌশলীরা বলছেন, চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য যথাযথভাবে বিবেচনায় না নেওয়ায় ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলোর প্রত্যাশিত সুফল মিলছে না। উচ্চ জোয়ারের সময় সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি প্রায় পাঁচ মিটার পর্যন্ত উঠে যায়, অথচ নগরের অনেক আবাসিক এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র দুই থেকে তিন মিটার উঁচুতে অবস্থিত। এছাড়া নগরের বহু প্রাকৃতিক জলাধার ও ১০৪টি খালের মধ্যে ৪৭টি খাল বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
এদিকে জলাবদ্ধতা কবলিত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন শেষে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন দাবি করেন, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার এবং চলমান মেগা প্রকল্পগুলোর অগ্রগতির ফলে নগরের সামগ্রিক জলাবদ্ধতা প্রায় ৮০ শতাংশ কমেছে।
বিজ্ঞাপন
তবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দাদের দাবি, বাস্তবে এখনো তারা বড় ধরনের স্বস্তি পাননি। তাদের মতে, বর্ষা এলেই একই দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে এবং স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রকল্পগুলোর দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন।








