Logo

মাজারের দানের অর্থ যায় কোথায়, কীভাবে হয় এর ব্যবস্থাপনা?

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৮ জুলাই, ২০২৬, ১৮:২৬
মাজারের দানের অর্থ যায় কোথায়, কীভাবে হয় এর ব্যবস্থাপনা?
ছবি : জনবাণী গ্রাফিক্স

বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনা সিলেটের শাহজালাল (রহ.) মাজারে আসা দানের অর্থের ব্যবস্থাপনা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মাজারের দানের অর্থ ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত এবং আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর বিষয়টি জনমনে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় সামনে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—মাজারে দান করা অর্থ আসলে কোথায় ব্যয় হয় এবং এর পরিচালনাব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হয়ে থাকে?

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি সিলেট জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, মাজারে জমা হওয়া অর্থের সুনির্দিষ্ট হিসাব সংরক্ষণ করা হয় না এবং আয়-ব্যয়ের বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে অভিযোগ ওঠে, কিছু ব্যক্তি দানের অর্থ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে ব্যয় করেন। তবে মাজারের খাদেমরা এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন।

এ ঘটনার পর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মাজারে দানের জন্য ব্যবহৃত কয়েকটি বড় ডেগ বা পাতিল সিলগালা করা হয় এবং নতুন একটি দানবাক্স স্থাপন করা হয়। পাশাপাশি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জেলা প্রশাসন, ওয়াকফ এস্টেট এবং মাজার কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে দানের অর্থের আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করবে। একই সময়ে দানের অর্থ জমা রাখার জন্য একটি ব্যাংক হিসাবও খোলা হয়েছে, যেখানে ভবিষ্যতে মাজারে আসা অর্থ সংরক্ষণ করা হবে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

এই পদক্ষেপের পর প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মতামত সামনে আসে। একদল মনে করেন, বিপুল পরিমাণ দানের অর্থের স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার জন্য প্রশাসনিক নজরদারি প্রয়োজন। অন্যদিকে খাদেমদের দাবি, শতাব্দীপ্রাচীন এই ব্যবস্থাপনা উত্তরাধিকার সূত্রে পরিচালিত হয়ে আসছে এবং এটি তাদের ঐতিহ্যগত দায়িত্ব।

সম্প্রতি প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে মাজারের দানবাক্স ও ডেগ খুলে অর্থ গণনা করা হয়। মাত্র চার দিনের ব্যবধানে সেখানে প্রায় সাড়ে ১৭ লাখ টাকা, বিদেশি মুদ্রা এবং স্বর্ণালংকার পাওয়া যায়। এরপর থেকেই মাজারে বছরে মোট কত পরিমাণ অর্থ দান আসে এবং সেই অর্থ কোথায় ব্যয় হয়—এ নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়ে ওঠে।

মাজারের এক খাদেম জানান, প্রায় সাতশ বছর ধরে তাদের পূর্বপুরুষরা শাহজালাল (রহ.)-এর দরগার খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাজারের দানের অর্থ অতিথি আপ্যায়ন, ধর্মীয় কার্যক্রম এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ব্যয় করা হয়। তারা মনে করেন, মাজার রাষ্ট্রীয় সম্পদ নয়; বরং এটি ঐতিহ্যগতভাবে খাদেম পরিবারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়ে আসছে।

বিজ্ঞাপন

ইতিহাসবিদ ও স্থানীয় গবেষকদের মতে, শাহজালাল (রহ.) সিলেটে আগমনের পর তার সঙ্গীদের পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে দরগার সেবার দায়িত্ব পালন করে আসছে। সময়ের সঙ্গে সেই পরিবারগুলোর সংখ্যা বেড়ে বর্তমানে প্রায় ৩০০-তে পৌঁছেছে। প্রচলিত ব্যবস্থায় বছরে প্রতিটি পরিবার নির্দিষ্ট একদিনের জন্য মাজারের তত্ত্বাবধান করে থাকে। সেদিনের আয়ের একটি অংশ মাজার অফিসে জমা দেওয়া হয় এবং বাকি অংশ সংশ্লিষ্ট পরিবার গ্রহণ করে থাকে বলে জানা যায়।

খাদেমদের দাবি, দানের অর্থ দিয়ে মাজারের নিরাপত্তাকর্মীদের বেতন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ইমাম-মুয়াজ্জিনের সম্মানী, লঙ্গরখানার খাবারের ব্যয়, রমজানে গণইফতার আয়োজন, বার্ষিক ওরস, ভবন নির্মাণ, মসজিদ উন্নয়ন এবং বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজ পরিচালিত হয়ে থাকে। তাদের মতে, এসব ব্যয়ের বড় অংশই দানের অর্থ থেকে বহন করা হয়।

অন্যদিকে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সময়ে সময়েই মাজার ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনার উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ফলে সরকারি সহায়তা এবং মাজারের নিজস্ব তহবিল—দুই উৎস থেকেই বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ পরিচালিত হয়।

বিজ্ঞাপন

শুধু শাহজালাল (রহ.) মাজার নয়, দেশের বিভিন্ন মাজারেও দানের অর্থের ব্যবস্থাপনায় ভিন্ন ভিন্ন কাঠামো অনুসরণ করা হয়। যেমন কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের দানবাক্সের অর্থ জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত গণনা করা হয় এবং সেই অর্থ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হয়। অন্যদিকে অনেক মাজারে আয়-ব্যয়ের দায়িত্ব খাদেম বা পরিচালনা কমিটির হাতেই থাকে।

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের ইয়ারউদ্দিন খলিফার মাজারের পরিচালনা কমিটির তথ্যমতে, তাদের মাজারে মানুষের দান ও মানতই আয়ের প্রধান উৎস। সেই অর্থ দিয়ে মাদ্রাসা, মসজিদ, শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন, উন্নয়নমূলক কাজ এবং প্রতিদিন শত শত মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে পরিচালনা কমিটি পুরো কার্যক্রম তদারকি করে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বাগেরহাটের খান জাহান আলী (রহ.) মাজারেও পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে দানের অর্থ ব্যবস্থাপনা করা হয়। তবে এসব মাজারে নগদ অর্থ ছাড়াও গবাদিপশু বা অন্যান্য মানতের সামগ্রী কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে, সে বিষয়ে এখনো একক কোনো জাতীয় নীতিমালা নেই।

বিজ্ঞাপন

ওয়াকফ প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মাজার, মসজিদ, ঈদগাহ ও কবরস্থান আইনগতভাবে ওয়াকফ সম্পত্তির আওতায় পড়ে এবং এসব সম্পদের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। ওয়াকফ প্রশাসক জানান, শাহজালাল (রহ.) মাজারও নিবন্ধিত ওয়াকফ সম্পত্তি। ফলে এর সম্পদ ও তহবিল ব্যবস্থাপনায় আইনগত কাঠামো বিদ্যমান থাকলেও বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন ধরনের চর্চা দেখা যায়।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রায় ২২ হাজার নিবন্ধিত ওয়াকফ এস্টেট রয়েছে, যার আওতায় রয়েছে কয়েক লাখ একর সম্পত্তি। এসব সম্পদের যথাযথ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টি বর্তমানে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানের অর্থ ব্যাংক হিসাবে সংরক্ষণ এবং আয়-ব্যয়ের হিসাব আরও সুসংগঠিতভাবে পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, এর মাধ্যমে একদিকে যেমন স্বচ্ছতা বাড়বে, অন্যদিকে বহু বছরের ঐতিহ্যও যথাযথভাবে সংরক্ষিত থাকবে।

বিজ্ঞাপন

তথ্য সূত্র: বিবিসি বাংলা

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD