‘মুগ্ধ যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল, তা এখনো অধরা’

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ নিহত হওয়ার প্রায় দুই বছর পার হতে চলেছে। কিন্তু এখনো তার হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে পরিবার। তাদের অভিযোগ, শহীদদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন যেমন হয়নি, তেমনি বিচারও এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
বিজ্ঞাপন
মুগ্ধের যমজ ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যে বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে তার ভাই জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, সেই বাংলাদেশ এখনো বাস্তবে দেখতে পাননি তারা। তার মতে, বিচারহীনতা শুধু একটি পরিবারের বেদনা নয়, বরং শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতিও অবিচারের শামিল।
‘দুই বছরেও বিচার এগোয়নি’
স্নিগ্ধ বলেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত, গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যাশা নিয়েই বহু মানুষ জীবন দিয়েছেন। কিন্তু দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সেই হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচার এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তার ভাষায়, শহীদ পরিবারের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার। কিন্তু এখন পর্যন্ত কেবল আশ্বাস মিলেছে, বাস্তবে বিচারিক প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র কাঠামোর পরিবর্তন এবং একটি জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। কিন্তু সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
‘বিচার বিলম্ব মানেই বিচার না পাওয়া’
বিজ্ঞাপন
বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্নিগ্ধ বলেন, একটি বহুল প্রচলিত নীতি হলো— ‘Justice delayed is justice denied’। অর্থাৎ, বিচার বিলম্বিত হলে অনেক সময় তা বিচার না পাওয়ারই সমান হয়ে দাঁড়ায়।
তার মতে, সময় যত গড়াচ্ছে, পরিবারের মধ্যে অনিশ্চয়তা ততই বাড়ছে। আদৌ সময়মতো বিচার সম্পন্ন হবে কি না, সে প্রশ্ন এখনো তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়।
উৎসব এখন পরিবারের কাছে শোকের স্মৃতি
বিজ্ঞাপন
মুগ্ধকে স্মরণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তার যমজ ভাই।
তিনি বলেন, একসময় ঈদ, রোজা কিংবা পারিবারিক যেকোনো উৎসব মানেই ছিল আনন্দে ভরা সময়। পরিবারের প্রাণ ছিলেন মুগ্ধ। তার উপস্থিতিতে সবসময় প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে থাকত ঘর।
কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তার মৃত্যুর পর পুরো পরিবারের জীবন পাল্টে গেছে।
বিজ্ঞাপন
স্নিগ্ধ জানান, বিশেষ করে ঈদ বা অন্য উৎসবের সময় ভাইয়ের অনুপস্থিতি সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। যেসব দিন একসময় আনন্দের ছিল, এখন সেগুলোই পরিবারের কাছে সবচেয়ে বেদনাময় হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, তাদের মা এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। প্রতিটি উৎসব এলেই হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে স্মরণ করে তিনি ভেঙে পড়েন।
‘পানি লাগবে পানি’ ভিডিও ঘিরে আলোড়ন
বিজ্ঞাপন
মুগ্ধ নিহত হওয়ার পরের ঘটনাপ্রবাহও তুলে ধরেন স্নিগ্ধ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ১৮ জুলাই মুগ্ধ নিহত হওয়ার কিছু সময় পরই ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়। পরে পরিবারের সদস্যরা মুগ্ধের নিজের মোবাইল ফোন থেকে সেই ভিডিওটি উদ্ধার করেন, যেখানে তাকে আন্দোলনকারীদের মধ্যে পানি বিতরণ করতে দেখা যায়।
দাফনের পর পরিবার সিদ্ধান্ত নেয় ভিডিওটি জনসম্মুখে প্রকাশ করবে। ইন্টারনেট চালু হওয়ার পর ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হলে তা দ্রুত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
সরকারের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান
বিজ্ঞাপন
স্নিগ্ধ দাবি করেন, ভিডিওটি প্রকাশের পর তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, কয়েকজন মন্ত্রী, উপমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাসহ একটি প্রতিনিধিদল তাদের বাসায় গিয়ে গণভবনে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার প্রস্তাব দেয়।
তবে পরিবার সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। স্নিগ্ধ বলেন, পরিবারের অবস্থান ছিল স্পষ্ট—যাদের তারা ভাইয়ের মৃত্যুর জন্য দায়ী মনে করেন, তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে তারা রাজি নন।
বিজ্ঞাপন
‘ব্ল্যাংক চেক’ প্রস্তাবের দাবিও পরিবারের
স্নিগ্ধ আরও দাবি করেন, গণভবনে যাওয়ার জন্য তাদের পরিবারকে ‘ব্ল্যাংক চেক’-এর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটিও তারা প্রত্যাখ্যান করেন।
তার অভিযোগ, এরপর বিভিন্ন সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়। এমনকি গণভবনে না গেলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না বলেও সতর্ক করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, পরিবার তখন জানিয়ে দেয়, যদি তাদের কোনো ক্ষতি করা হয়, তাহলে মুগ্ধ হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরের আরও গুরুত্বপূর্ণ ভিডিও এবং তথ্য প্রকাশ করা হবে।
আত্মগোপনে যেতে হয়েছিল পরিবারকে
পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় ২৮ জুলাই পরিবারের সদস্যরা আলাদা আলাদা স্থানে আশ্রয় নেন বলে জানান স্নিগ্ধ।
আরও পড়ুন
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাবা-মা এক জায়গায়, তিনি অন্যত্র এবং বড় ভাই ভিন্ন স্থানে অবস্থান করেন। ৫ আগস্টের পর পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে তারা আবার নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন।
বাবার অসুস্থতা, পরিবারের দীর্ঘ সংগ্রাম
স্নিগ্ধ জানান, সম্প্রতি তার বাবা হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন। পরে তার হৃদ্যন্ত্রে একাধিক রিং বসানো হয়। বর্তমানে তিনি চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে সুস্থ আছেন।
তবে পরিবারের সবচেয়ে বড় কষ্ট এখনো মুগ্ধকে হারানোর শোক এবং বিচার না পাওয়ার অপেক্ষা।
পরিবারের একটাই প্রত্যাশা
মুগ্ধ হত্যাকাণ্ডের দুই বছর পূর্তির প্রাক্কালে পরিবারের দাবি, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হোক এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।
স্নিগ্ধর ভাষায়, “যে বাংলাদেশের জন্য মুগ্ধ জীবন দিল, সেই বাংলাদেশ এখনো আমরা দেখতে পাইনি।”
তার মতে, শহীদদের আত্মত্যাগের যথার্থ সম্মান জানাতে হলে শুধু স্মরণ নয়, দ্রুত বিচার এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতিও বাস্তবে রূপ দিতে হবে।








