Logo

স্বামী হত্যার পর মেয়ের ওপরও নেমে আসে নির্যাতন, ট্রাইব্যুনালে রুমা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২১:২১
স্বামী হত্যার পর মেয়ের ওপরও নেমে আসে নির্যাতন, ট্রাইব্যুনালে রুমা
ছবি: সংগৃহীত

জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে স্বামীকে হারানোর পর মেয়েকেও হারিয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জানিয়েছেন রুমা বেগম। তাঁর অভিযোগ, স্বামী হত্যার ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দি দিতে ঢাকায় আসার সুযোগে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা তাঁর মেয়েকে ধর্ষণ করেন। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে তাঁর মেয়ে আত্মহত্যা করে।

বিজ্ঞাপন

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মোহাম্মদপুরে নয়জন নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সপ্তম সাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দেন রুমা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী তাঁর সাক্ষ্য রেকর্ড করেন।

প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্যরা।

৪১ বছর বয়সী রুমা পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার বাসিন্দা। তিনি গৃহিণী। তাঁর স্বামী শহীদ মো. জসিম উদ্দিন একটি এনজিওতে চালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

জবানবন্দিতে রুমা বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই তাঁর স্বামী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিতে বের হন। সে সময় তাঁরা আদাবর থানার শেখেরটেক ৬ নম্বর সড়কে ভাড়া বাসায় থাকতেন। ওই দিন আন্দোলন থেকে ধাওয়া খেয়ে ফেরার সময় তাঁর স্বামী আহত হন এবং ধানমন্ডির কোনো একটি স্থানে গাড়ি রেখে আসেন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

পরদিন ১৯ জুলাই শুক্রবার সকালে স্বামীকে আর বাইরে যেতে দিতে চাননি রুমা। তবে জুমার নামাজ পড়ার কথা বলে তিনি বাসা থেকে বের হন। পরে আর ফিরে না আসায় মোবাইলে ফোন করেন রুমা। কিন্তু ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

বিজ্ঞাপন

সন্ধ্যার দিকে প্রতিবেশী কোহিনুর বেগমের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, তাঁর ছেলে উজ্জ্বলের মাধ্যমে খবর এসেছে—জসিম আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পড়ে আছেন। খবর পেয়ে স্বামীকে খুঁজতে ছোটাছুটি শুরু করেন রুমা।

বাসায় থাকা অল্প টাকার সঙ্গে প্রতিবেশীর কাছ থেকে আরও ১০ হাজার টাকা নিয়ে চাচা-শ্বশুর সালাম গাজীর সঙ্গে তিনি হাসপাতালে রওনা হন। কিছু দূর যাওয়ার পর রিকশা পেলেও পুলিশ তাঁদের বাধা দেয় বলে জানান তিনি।

হাসপাতালে পৌঁছে অপারেশন থিয়েটারের সামনে একটি ট্রলিতে রক্তাক্ত অবস্থায় স্বামীকে দেখতে পান রুমা। তখনও জসিমের জ্ঞান ছিল এবং তিনি স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। রুমার ভাষ্য অনুযায়ী, গুলিতে তাঁর স্বামীর দুটি আঙুল উড়ে যায়। বুকেও গুলি লাগে, যা বুক দিয়ে ঢুকে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যায়। ক্ষতস্থানে গজ দিয়ে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করা হলেও রক্তপাত অব্যাহত ছিল।

বিজ্ঞাপন

রুমার দাবি, জুমার নামাজের পর আন্দোলনে অংশ নিতে মোহাম্মদপুরের আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে গিয়েছিলেন জসিম। সেখানেই পুলিশ ও ছাত্রলীগের গুলিতে তিনি আহত হন।

হাসপাতালে সাইফুল নামে এক আন্দোলনকারীর সঙ্গে রুমার পরিচয় হয়। তিনিই জসিমকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন বলে জানান তিনি। চিকিৎসকেরা অপারেশনের জন্য রক্তের প্রয়োজনের কথা জানালে সাইফুল টাকা নিয়ে দুই ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করেন।

সেদিন হাসপাতালে বিপুলসংখ্যক গুলিবিদ্ধ আন্দোলনকারীকে চিকিৎসার জন্য আনা হয়েছিল। রোগীর চাপ সামলাতে চিকিৎসক ও নার্সদের হিমশিম খেতে হয়। জ্ঞান থাকায় জসিমের অস্ত্রোপচার শেষের দিকে করা হয়। রাত আড়াইটার দিকে অপারেশন শেষ হলে তাঁকে পর্যবেক্ষণ কক্ষে রাখা হয়।

বিজ্ঞাপন

রুমা বলেন, ২০ জুলাই বেলা ১১টার দিকে তিনি পর্যবেক্ষণ কক্ষে গিয়ে দেখেন, স্বামীর শরীর থেকে রক্ত বের হচ্ছে এবং কোনোভাবেই তা বন্ধ করা যাচ্ছে না। হাতের ব্যান্ডেজ খুলে দেখতে পান, দুটি আঙুল নেই এবং সেখানে পচন ধরেছে। চিকিৎসকদের জানালে তাঁরা আঙুলের গোড়া থেকে কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। পরদিন অস্ত্রোপচার করে আঙুল দুটি কেটে ফেলা হয়।

২২ জুলাই জসিমের অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে আইসিইউ না থাকায় অনেক চেষ্টা করে তাঁকে বক্ষব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাঁর বুকে আরেক দফা অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর আর জ্ঞান ফেরেনি তাঁর। পরে রুমার অনুরোধে স্বামীকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়।

২৯ জুলাই রাত ৯টার দিকে জসিম মারা যান বলে ট্রাইব্যুনালে জানান রুমা। এ সময় স্বামীর মৃত্যুর বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

বিজ্ঞাপন

স্বামীর মরদেহ পাওয়ার ক্ষেত্রেও নানা জটিলতার মুখে পড়ার কথা জানান রুমা। পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ছাড়া মরদেহ হস্তান্তর করা হবে না জানানো হলে তিনি বনানী থানায় যান। তবে হাসপাতাল মহাখালী এলাকায় হওয়ায় বনানী থানা তাঁকে মোহাম্মদপুর থানায় যেতে বলে। সেখানে গেলে তাঁকে জানানো হয়, ওই এলাকায় কোনো গুলির ঘটনা ঘটেনি এবং আবার বনানী থানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়।

এভাবে ২৯ জুলাই রাতভর এক থানা থেকে অন্য থানায় ঘুরেও ক্লিয়ারেন্স পাননি বলে জানান রুমা। পরদিন বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করে তিন সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালের সামনে কান্নাকাটি করেন তিনি। পরে হাসপাতাল পরিচালকের কক্ষে গেলে বনানী ও মোহাম্মদপুর থানায় দুটি চিঠি পাঠানো হয়।

রুমার ভাষ্য, চিঠি নিয়ে মর্গের এক কর্মীর সঙ্গে বনানী থানায় গেলে তাঁকে জানানো হয়, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ছাড়া ক্লিয়ারেন্স দেওয়া সম্ভব নয়। পরে মোহাম্মদপুর থানায় একটি মামলা করার পর শর্তসাপেক্ষে মরদেহ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া এগোয়। নানা জটিলতার পর ৩১ জুলাই স্বামীর মরদেহ পান তিনি।

বিজ্ঞাপন

সেদিন সন্ধ্যায় মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন রুমা। ফজরের আজানের সময় সেখানে পৌঁছানোর পর দুমকি থানার পুলিশ ফোন করে দ্রুত দাফনের কথা জানায়। সকাল ৮টার দিকে স্বামীকে দাফন করেন তিনি।

এরপর মেয়ের মৃত্যুর ঘটনাও ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেন রুমা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ স্বামী হত্যার ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দি দিতে তিনি ঢাকায় আসেন। সঙ্গে ছিলেন ভাই বেলাল মৃধা, মেজো মেয়ে বুশরা ও ছোট ছেলে জুবায়ের ইসলাম। বড় মেয়ে লামিয়া তখন দুমকি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী হওয়ায় তাকে বাড়িতে রেখে আসেন।

রুমা জানান, ১৮ মার্চ বাবার কবর জিয়ারত করে বাড়ি ফেরার পথে লামিয়াকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা ধর্ষণ করেন বলে তিনি জানতে পারেন। তাঁর অভিযোগ, তিনি ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে ঢাকায় আসায় প্রতিশোধ হিসেবে মেয়ের ওপর এই নির্যাতন চালানো হয়।

বিজ্ঞাপন

ঘটনার কথা ছড়িয়ে পড়ার পর লামিয়া মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং পরে আত্মহত্যা করেন বলে ট্রাইব্যুনালে জানান রুমা।

জবানবন্দির শেষ পর্যায়ে স্বামী জসিম উদ্দিনের হত্যার পাশাপাশি মেয়ের মৃত্যুর ঘটনারও বিচার দাবি করেন তিনি।

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD