গ্রামে গ্রামে নারীরা তৈরি করছেন রংবেরঙের শীতল পাটি


Janobani

আজাহারুল ইসলাম সুজন

প্রকাশ: ০৮:২৪ অপরাহ্ন, ১৭ই মার্চ ২০২৪


গ্রামে গ্রামে নারীরা তৈরি করছেন রংবেরঙের শীতল পাটি
ছবি: প্রতিনিধি

বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামে শীতল পাটি তৈরীর জন্য বিখ্যাত এর মধ্যে রয়েছে দড়িয়াল ইউনিয়নের কাজলাকাঠী, রঙ্গশ্রী ইউনিয়নের কাঠালিয়া, রাজাপুর ও গারুড়িয়া ইউনিয়নের সুখী নীলগঞ্জ ও হেলেঞ্চা গ্রাম। এই উপজেলায় এখন এক হাজারের বেশি পরিবার এই শীতল পাটি তৈরী করে সংসার চালাচ্ছে। 


উপজেলার রঙ্গশ্রী ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ড কাঁঠালিয়া গ্রামে গেলেই যতদূর দুচোখ যায় দেখা মিলে পাইত্রাগাছের বাগান। গ্রামীণ সড়কের দুই পাশে দেখা মিলল বড় বড় পাইত্রা বা মোর্তাগাছের ঝোপ। বাড়ির আঙিনা, পরিত্যক্ত ফসলি জমি, পুকুরপাড়- সব জায়গাতেই বর্ষজীবী উদ্ভিদ তরতাজা পাইত্রাগাছ মাথা তুলে আছে। গ্রামীণ জনপদের আভিজাত্যের স্মারক শীতলপাটি তৈরি হয় এই পাইত্রাগাছের বেতি দিয়ে।


জানা যায়, কাঁঠালিয়া গ্রামে পাইত্রাগাছের আবাদ হয়ে আসছে শত শত বছর ধরে। পাটিকরদের পূর্বপুরুষরা যে পেশায় নিয়োজিত ছিলেন, আজও সেই পেশা ধরে রেখেছেন উত্তর পূরুষ কাঁঠালিয়াবাসী। এখনো এই গ্রামে পাটিকর পেশায় টিকে আছে প্রায় ৩ শত পরিবার। আর তাদের সবার পেশাই শীতল পাটি বুনন। ফলে ইউনিয়নের কাঁঠালিয়া গ্রামটি ‘পাটিকর গ্রাম’ নামে পরিচিত।


১৭ মার্চ (রবিবার) কাঁঠালিয়া গ্রামের সরু গ্রামীণ সড়ক দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলেই ছোট ছোট টিন সেট ও আধাপাকা ঘর গুলোর বারান্দায় নারী-পুরুষ ও শিশুদের দেখা যায় নানান রঙ্গের শীতল পাটি বুনতে। ঘরের বারান্দায় কথা হয় ছবিতা রানির সঙ্গে। বারান্দার মেঝেতে পরিবারের সবাই মিলে বৈশাখী মেলা সামনে রেখে ব্যস্ত পাটি তৈরির কাজে বলে জানান তিনি।


আরও পড়ুন: কুয়াকাটায় দুইমাস পর্যটন ব্যবসা ভালো চললেও আবারও মন্দা

 

একটু সামনে গেলেই কথা হয় পিওলাল পাটিকরের সঙ্গে তিনি বলেন, পরিবারের ৫ সদস্য মিলে একটি পাটি তৈরি করতে কয়েকদিন চলে যায়। প্রতিজনে দৈনিক মজুরি ১০০ টাকা করেও আসে না। তারপরও করার কিছু নেই। বাপ-দাদার পেশা হিসেবে এখনো শীতল পাটি বুনে যাচ্ছি। পাটি বুনে জীবন সংসার কেমন কাটছে? শীতলপাটি বুনে এখন আর লাভ নেই। বাপ-দাদারা এই পেশায় থেকে আমাদেরও অশিক্ষিত রেখে গেছেন! আমাদের ছেলে-মেয়েরা এখন স্কুলে যাচ্ছে। তবে তারা ঠিক মতো লেখাপড়ার পিছনে সময় দিতে পারছে না। শিক্ষিত করতে হলে তো টাকার দরকার আমাদের তো তেমন কোন টাকা-পয়সা নেই। তাই টাকার অভাবে ছেলে-মেয়েরাও এখন শীতলপাটি বুনছে। একদিকে এখন গরম বেরেছে অপরদিকে বৈশাখ মাস আসছে দেশের বিভিন্ন জেলা উপজেলায় বৈশাখী মেলা সহ বিভিন্ন রকমের মেলায় শীতল পাটির চাহিদা থাকে পাইকাররা এসে আমাদের এলাকা থেকে ক্রয় করে নিয়ে যায়। তাই এখন পাটিপাড়ায় ব্যস্ত সময় পার করতেছি আমরা।


আরও পড়ুন: পিরোজপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় বাসের চাপা, নিহত ৭


স্থানীয় পাটিকরেরা বলেন, আমাদের তৈরি শীতল পাটি আন্তর্জাতিক মানের। কিন্তু প্লাস্টিক পাটির কারণে বাজারে চাহিদা কমে গেছে। সরকার যদি বিদেশে শীতল পাটি রপ্তানির কোনো ব্যবস্থা করত, তাহলে পাটিকরদের জীবন-জীবিকা ভালো থাকত। দেশেরও আয় হতো। শীতলপাটি টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারের ক্ষুদ্রঋণ দেওয়া উচিত। ঋণ নিয়ে আমরা শীতল পাটি তৈরি ও বিক্রি করে সেই টাকা পরিশোধ করতাম।নয়তো এই পেশায় টিকে থাকা দুঃসাধ্য। একটি পাটি তৈরি করতে যে খরচ হয়, তা বিক্রি করে মূলধনই ওঠে না। এ জন্য অনেকেই পেশা পরিবর্তন করেছেন।


বাকেরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুর রহমান বলেন, আমাদের উপজেলা প্রশাসন মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সহ জাইকা সংস্থার মাধ্যমে উপজেলার পাটিকরদের মাঝে বিভিন্ন রকম প্রশিক্ষণ দিয়েছি। যাতে নুতন নুতন ডিজাইনের শীতলপাটি তারা নির্মাণ করতে পারে। পাশাপাশি আমরা তাদেরকে সরকারি বিভিন্ন রকম সহায়তা দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছি। 


জেবি/এসবি