গ্রামবাসীর উদ্যোগে সাটুরিয়ায় ধলেশ্বরী নদীর ওপর নির্মিত হচ্ছে সেতু


Janobani

উপজেলা প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৩:৫৬ পিএম, ৩০শে আগস্ট ২০২৫


গ্রামবাসীর উদ্যোগে সাটুরিয়ায় ধলেশ্বরী নদীর ওপর নির্মিত হচ্ছে সেতু
ছবি: প্রতিনিধি

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার গ্রামবাসী একদল দেশ স্বাধীন হবার ৫৩ বছর পার হবার পর সরকারি সহায়তা না পেয়ে নিজেদের গ্রামের চেষ্টায়, নিজেদের টাকায়, একজোট হয়ে নির্মাণ কাজ শুরু করেছেন বহু প্রত্যাশিত ৮০ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ৮ ফুট প্রস্থ বিশিষ্ট সেতু। যা গাজিখালি নদীর উপর সেতুটির নির্মাণ কাজ শেষ হলে গ্রামের মানুষের যোগাযোগ এবং কৃষি পণ্য পরিবহন সহজ করবে। 


মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া উপজেলার ধানকোড়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কান্দাপাড়া-কৃষ্ণপুড়া নামক স্থানে গাজিখালি নদী ওপর এই সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। চলতি বছরের ১ এপ্রিল সেতুটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে বলে জানান এলাকাবাসী।  




সরেজমিনে দেখা যায়, এই সেতু নির্মাণ করা হলে ঢাকা জেলার ধামরাই উপজেলার গাঙ্গুটিয়া, সাটুরিয়া উপজেলার ধানকোড়া, মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষ্ণপুর ও আটিগ্রাম ইউনিয়নের প্রায় ১০টি গ্রামের মানুষের যাতায়াত সহজ হবে। এই রাস্তা দিয়ে ওই কান্দাপাড়া এলাকার বাসিন্দারা বারোবাড়িয়া বাজারসহ কয়েকটি হাট-বাজারে যাতায়াত করেন। সেতু না থাকায় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও গ্রামের বাসিন্দাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে দুর্ভোগের সীমা থাকে না। কমপক্ষে এক থেকে দেড় কিলোমিটার ঘুরে অন্য রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। সেতুর কাজ শেষ  হলে নদীর এই অংশে মানিকগঞ্জ ও ঢাকা জেলার মধ্যে যোগাযোগ সহজ হবে।


এলাকাবাসী বলেন, গ্রামের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া গাজিখালী নদী বহুদিন ধরেই যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা ছিল। বর্ষাকালে নৌকা ছাড়া চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। স্কুল, কলেজ, বাজার কিংবা হাসপাতাল সব জায়গায় পৌঁছানো ছিল সময়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য। দেশ স্বাধীন হবার ৫৩ বছর অপেক্ষা করছেন। প্রতি জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন এলেই জনপ্রতিনিধি প্রার্থীরা আশ্বাস দিতেন। কিন্তু তা আর বাস্তবায়ন করেননি। কান্দাপাড়াবাসী আর অপেক্ষা করেননি। নিজেরা অর্থ সংগ্রহ করে, শ্রম দিয়ে শুরু করেছেন সেতু নির্মাণের কাজ। বর্তমানে নদীর দুই পাশে সেতুর পিলার দাঁড়িয়ে গেছে।  এখন সেতুর উপরের অংশ শেষ করার জন্য টাকা সংগ্রহ চলছে। 




ইতোমধ্যে নিজের টাকায় নদীর ওপর সেতু নির্মাণ কাজ শুরু করেছেন। সেটা আবার দৃশ্যমান হয়েছে। এমন ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সাটুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে উপজেলা প্রকৌশলী ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের একটি টিম সেতু নির্মাণের স্থান পরিদর্শন করেছেন।


ধানকোড়া ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য মন্টুা বলেন, সরকারি সাহায্য না পেয়ে আমরা হতাশ হলেও বসে থাকিনি। সবাই মিলে চাঁদা তুলে এই সেতুর কাজ শুরু করেছি। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যাতে কষ্ট না পায়, সেই চিন্তা থেকেই এই উদ্যোগ। গ্রামের তরুণদের পাশাপাশি বৃদ্ধরাও শ্রম দিয়েছেন নির্মাণ কাজে। স্থানীয় রাজমিস্ত্রী, ইঞ্জিনিয়ার ও সাধারণ মানুষ এক হয়ে এগিয়ে নিচ্ছেন কাজটি।


তিনি আরও বলেন, এই সেতু কেবল যোগাযোগের মাধ্যমই নয়, এটি এই এলাকার অর্থ-সামাজিক উন্নয়ন তথা শিক্ষা প্রসার ও দুই পাড়ের মানুষের মাঝে আত্মিক সেতুবন্ধন সৃষ্টি করেছে।


নাহিদ নামে এক যুবক বলেন, কৃষ্ণপুর-কান্দাপাড়ার গাজীখালি নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের দাবি ছিল প্রায় চারটি ইউনিয়নের বাসিন্দাদের। কিন্তু তাদের দীর্ঘদিনের এ দাবির প্রতি নজর দেননি কোনো জনপ্রতিনিধি। এ অবস্থায় সম্মিলিতভাবে নিজ উদ্যোগে সেতু নির্মাণে কাজ শুরু করেছে গ্রামবাসী। 




স্থানীয় বাসিন্দা সুমন বলেন, গাজীখালী নদীর ওপর একটি সেতুর অভাবে দুই পাড়ের লক্ষাধিক মানুষ বছরের পর বছর ধরে সীমাহীন দুর্ভোগে ভুগছেন। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে স্কুলগামী শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে রোগী, সবাইকে পার হতে হতো বাঁশের সাঁকো বা খেয়া নৌকায়, যা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ ও কষ্টকর। স্বাধীনতার পর থেকেই আমরা বারবার সরকারিভাবে সেতুর দাবি জানিয়ে এসেছি। বারবার আশ্বাস পেয়েছি, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান, এমনকি ইউপি চেয়ারম্যানের কাছেও ধর্ণা দিয়েছি, কিন্তু আমাদের স্বপ্ন আজও স্বপ্নই থেকে গেছে। তাই আর প্রতীক্ষা নয় আমরাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি নিজেদের উদ্যোগেই সেতু নির্মাণের।


মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের শিক্ষার্থী রাসেল বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো পার হয়ে কলেজে যেতে হতো। কেউ অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে নিতে প্রায় দুই কিলোমিটার ঘুরে পথ পাড়ি দিতে হতো। এই সেতু আমাদের মুক্তি দেবে।


সেতু নির্মাণ তহবিলের ক্যাশিয়ার শরিফুল ইসলাম জানান, আমার ৪০ বছর বয়সে কমপক্ষে ১০-১২ বার নদীর পাড়ে মাপা মাপি করেছে। এই যে সয়েল টেষ্ট হবে। কিন্তু দেখেন দেশ স্বাধীন হয়েছে ৫৩ বছর। আমরা এখনও কোথায় পড়ে আছি। তাই গ্রামবাসীর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে আর বসে থাকিনি। যে যা পাড়েন। তাই দিয়ে চলতি ২০২৫ এর ইদুল ফিতরের পরের দিন সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করি। ইতোমধ্যে প্রায় ২০ লাখ টাকা সংগ্রহ করে কাজ করা চলমান রয়েছে। দুটি পিলারের কাজ শেষ হয়েছে। এখন পাটাতন ঢালাইয়ের জন্য আরও অর্থ সংগ্রহের কাজ চলছে। ঠিকমত টাকা পেলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই কাজ শেষ করতে পারব। 


এ ব্যাপারে ধানকোড়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি রফিকুল ইসলাম জুয়েল বলেন, এই সেতুটি নির্মাণ খুব জরুরি ছিল। কিন্তু গ্রামবাসীর নিজ উদ্যোগে শুরু করেছেন। বিষয়টি আমি জেলা বিএনপির আহবায়ক আফরোজা খানম রিতা আপার নজরে আনব। যাতে তার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে এই সাহসি কাজে শামিল থাকতে পারে। 


সাটুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ইকবাল হোসেন বলেন, গ্রামবাসীর উদ্যোগে সেতু নির্মাণ হচ্ছে এমন ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখে আমি সেতুর নির্মাণ কাজ পরিদর্শন করেছি। আমি গ্রামবাসীকে বলে এসেছি। যেহেতু পিলার কাজ শেষ। তাই উপরের কাজটুকু উপজেলা প্রকৌশলীকে দিয়ে ডিজাইন করে বাকি কাজ যেন শুরু করে। আমার উপজেলা প্রশাসন থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব বিধি মোতাবেক আর্থিকভাবে সাহায্য করতে। 


এসএ/