প্রায় দেড়শ বছর ধরে হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিস্টানদের একই স্থানে সমাধি
জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৪:৪২ পিএম, ৩০শে আগস্ট ২০২৫

একই স্থানের মধ্যে পাশাপাশি কবরস্থান, সমাধিস্থান আর শ্মশানঘাট। এটাই প্রমাণ করে, বাংলাদেশ একটি চেতনার দেশ।”
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী মাধবপুর ইউনিয়নের ন্যাশনাল টি কোম্পানীর মালিকানাধীন পাত্রখোলা চা বাগানে। প্রায় দেড়শ বছর ধরে সম্প্রীতির নিদর্শন বহন করছে পাশাপাশি গড়ে ওঠা মুসলমানদের কবরস্থান, হিন্দুদের শ্মশান আর খ্রিস্টানদের সমাধিস্থল।
একইস্থানে তিনটি ধর্মের সমাধিস্থল স্থাপন করা হয়েছে, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মিলেমিশে বসবাস করে এবং মৃত্যুর পর তাদের শেষকৃত্যও পাশাপাশি সম্পন্ন হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে একই সমাজে নানা ধর্ম-বর্ণের মানুষ বসবাস করে। তবে সাধারনত: মৃত্যুর পর তাদের জন্য থাকে আলাদা আলাদা সমাধির ব্যবস্থা। কিন্তু বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের মৌলভীবাজারে রয়েছে এমন একটি কবরস্থান যেখানে ধর্ম-নির্বিশেষে মুসলমান, হিন্দু এবং খ্রিস্টানদের মরদেহ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ীই দাফন কিংবা সৎকার করা হচ্ছে। সব ধর্মের মানুষের মাঝে সৌহার্দের দৃষ্টান্ত হিসেবেই এই সমাধিস্থলটি গড়ে উঠেছে।
জানা যায়, একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতির এক উদাহরণ, যেখানে বিভিন্ন ধর্মের শেষ আশ্রয়স্থল পাশাপাশি অবস্থিত।১৮৭৫ সালে পাত্রখোলা চা বাগান প্রতিষ্ঠা করা হয়। এখানে ৪.৯৪ একর ১৫ বিঘা জমির উপর সকল ধর্মের লোকদের মৃত্যুর পর সৎকারের জন্য জায়গা বরাদ্দ করা হয়। পাত্রখোলা চা বাগানে বিভিন্ন ধর্মের প্রায় ১৬ হাজার মানুষের বসবাস। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এমন একটা সৌহার্দ্য, এমন একটা সুসম্পর্ক রেখে যাব, যাতে পরবর্তীতে এটা তাদের ওপর ভাল সুফল বয়ে আনবে। যার যার ধর্ম সে সে পালন করে।’
পাত্রখোলা চা বাগান সার্বজনীন মন্দিরের পুরোহিত রাজেশ প্রসাদ শর্মা পাত্রখোলা চা বাগান মন্দিরের পুরোহিত জানান, শ্মশানের পাশেই মুসলমান ধর্মের কবরস্থান আছে এবং সেইসঙ্গে খ্রিস্টান ধর্মের গির্জা আছে। ১৮৭৫ সাল থেকে আমাদের দাদার আমল থেকে বাগানের ময়মুরুব্বি ছিলেন, হিন্দু-মুসলমান সবাই মিলে চিন্তা করেন যে কি একটা দৃষ্টান্ত করা বা রাখা যায়। এই দেশকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়।
পাত্রখোলা চা বাগানের মসজিদের ইমাম মাওলানা আব্দুল আজিজ জানান, আমার মনে হয় না পৃথিবীর কোনো জায়গায় এমন দৃষ্টান্ত আছে। ভাই ভাই হিসেবে আমরা বসবাস করছি। মৃত্যুর পর আমরা একসঙ্গে থাকব। মৃত্যুর পর তো আর কিছু থাকে না। বাংলাদেশের জনগণ যারা আছে তারা যেন এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি মেনে চলে। তাদের এলাকায় যেন এই রকম কিছু সৃষ্টি করে।
পাত্রখোলা চা বাগান গীর্জার পরিচালক ধর্ম যাজক যোসেফ বিশ্বাস বলেন, আমরা তিন ধর্মের মানুষ এখানে বসবাস করি। আমাদের শরীরে যে ভাই-বোনের রক্ত। আমাদের সবার শরীরে কিন্তু একই রক্ত ভয়ে যায়। আমি বলতে চাই, আমরা যেন ধর্ম নিয়ে মারামারি না করি।
পাত্রখোলা চা বাগান তিন ধর্মের প্রতিনিধিরা জানান, যুগ যুগ ধরে একইস্থানে কবর, শ্মশান ও সমাধি রেখে তিন ধর্মের মানুষ সম্প্রীতির বন্ধনে থেকে নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি পালন করে আসছেন। এ নিয়ে কখনও কোনো বাকবিতণ্ডা হয়নি বলে স্থানীয় চা শ্রমিকদের দাবি। মরলে এক জায়গাই যেতে হবে। পাকিস্তান আমল থেকে। আমাদের পূর্ব পুরুষরা ও এমন ছিল যে তাদের মধ্যে এমন কিছু ছিল না। একসঙ্গে চলছে। বাপ-দাদার আমলে থেকে, মনে করেন ৬০-৭০ বছর ধরে এভাবেই আছে। সবাই সুন্দরভাবে বসবাস করছি। বরং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হওয়ায় এখানকার মানুষ খুবই খুশি। সামাধিস্থলে সীমানা দেয়াল নির্মাণ, রাস্তা তৈরিসহ রক্ষণাবেক্ষণ কাজে সরকারি সহায়তার দাবি রয়েছে স্থানীয়দের।
মাধবপুর ইউনিয়ন পরিষদ সাবেক চেয়ারম্যান পুষ্প কুমার কানু বলেন, পাত্রখোলা চা বাগান পূর্ব পুরুষরা ছিল তখন থেকে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সম্প্রীতির যে একটা বন্ধন ছিলও এখন পর্যন্ত তা ধারাবাহিকভাবে আছে। আর আমার বিশ্বাস পূর্ব পুরুষরা যে সম্প্রীতির বন্ধন তৈরি করে দিয়ে গেছে, তা বর্তমান জেনারেশন এই বন্ধনকে তারা লালন করে ও ধরে রাখবে। এই দৃষ্টান্তে বাংলাদেশের সবার সামনে তুলে ধরার জন্য সুন্দর দৃষ্টান্ত হবে। যদি এখানে সুন্দর ডেভেলপমেন্ট করে যদি এটাকে সুন্দর করা যায়।
পাত্রখোলা চা বাগান ম্যানজার উসুফ খান বলেন, এখান থেকে শিক্ষা যায় যে, একই জায়গায় যে তিনটি কবরস্থান। কতটুকু সম্প্রীতি থাকলে একই জায়গায় তিনটি কবরস্থান থাকতে পারে।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাখন চন্দ্র সূত্রধর জানান, একই স্থানের তিনটি ধর্মের কবরস্থান রয়েছে। প্রত্যেক ধর্মের মানুষের শেষ আশ্রয় স্থান। এটা একটি আমাদের বড় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নিদর্শন। এ জায়গা থেকে বুঝা যায় যে আমাদের সকলের শুরু এবং শেষটা এক জায়গা থেকে। যারা ধর্মীয় অপচেষ্টা করতে যায় তাদের এক স্থানটা দেখা উচিত এবং শেখা উচিত।
এসএ/