ডলারের দামে ঊর্ধ্বগতি, সতর্ক অবস্থানে বাংলাদেশ ব্যাংক

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ সময় ধরে চলা সংঘাত সাময়িকভাবে থেমে গেলেও এর প্রভাব ধীরে ধীরে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে এসে পড়েছে। গত পাঁচ সপ্তাহে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মান কিছুটা কমেছে। যদিও পতনের হার খুব বেশি নয়, তবুও বাজারে চাপ তৈরি হওয়ার আভাস পেয়ে আগেভাগেই সতর্ক অবস্থানে গেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বিজ্ঞাপন
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, প্রয়োজনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হয়ে উঠলে বাজারে প্রায় ২০ কোটি ডলার ছাড়ার প্রস্তুতি রয়েছে। তাদের লক্ষ্য, কোনোভাবেই টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন হতে না দেওয়া।
পাঁচ সপ্তাহে টাকার মান কমেছে
ব্যাংকিং খাতের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ সপ্তাহে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমেছে প্রায় ০ দশমিক ৪৪ শতাংশ। এই সময়ে প্রতি ডলারে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৫৫ পয়সা।
বিজ্ঞাপন
গত ১ মার্চ আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি ডলারের দর ছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা। বুধবার (৮ এপ্রিল) সেই দর বেড়ে সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৮৫ পয়সায় পৌঁছায়। অর্থাৎ খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে ডলারের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
এর আগে বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় টাকার মান কিছুটা শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। তখন বিনিময় হার কমে যাওয়ার আশঙ্কায় বাংলাদেশ ব্যাংক উল্টো বাজার থেকে ডলার কিনতে শুরু করে।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর সবশেষ ২ মার্চ বাজার থেকে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার কেনা হয়। ওই সময় ডলারের কাট-অফ রেট ছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব বলছে, চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত বাজার থেকে মোট ৫৪৯ কোটি ৩৫ লাখ ডলার বা প্রায় ৫ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে বাজার স্থিতিশীল
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজার এখনও স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। টাকার ওপর বড় ধরনের অবমূল্যায়নের চাপ নেই বলেও দাবি করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এক পর্যালোচনামূলক প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ব্যাংকিং খাতে বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকগুলোর হাতে বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য ছিল প্রায় ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। এক মাসেরও কম সময়ে তা বেড়ে ৬ এপ্রিল দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ এক মাসে তারল্য বেড়েছে প্রায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।
বিজ্ঞাপন
এছাড়া ব্যাংকগুলোর হাতে নগদ বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণও কিছুটা বেড়েছে। ২৬ ফেব্রুয়ারি যেখানে ব্যাংকগুলোর কাছে নগদ ডলার ছিল ৪৭ দশমিক ৬ মিলিয়ন, সেখানে ৬ এপ্রিল তা বেড়ে প্রায় ৪৯ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজার বর্তমানে ভারসাম্যপূর্ণ রয়েছে এবং এই মুহূর্তে টাকার ওপর তাৎক্ষণিক অবমূল্যায়নের চাপ নেই।
বাজারের বাস্তব চিত্র কিছুটা ভিন্ন
বিজ্ঞাপন
যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারকে স্থিতিশীল বলছে, তবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে আমদানিকারকদের কাছে ডলার বিক্রির দাম প্রায় ১ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
এক মাস আগে যেখানে আমদানির জন্য ডলার বিক্রি হতো ১২২ টাকা ৩০ পয়সায়, সেখানে বর্তমানে অনেক ব্যাংক ১২৩ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত দাম নিচ্ছে।
আরও পড়ুন: আজকের মুদ্রার দর : ৯ এপ্রিল ২০২৬
বিজ্ঞাপন
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, ভবিষ্যতে ডলারের দাম আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই কিছু ব্যাংক ডলার মজুত করছে। ফলে বাজারে সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে এবং ডলারের সরবরাহ কিছুটা কমে গেছে।
বর্তমানে ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক দায় বাদ দিলে নেট ওপেন পজিশন দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কিনে থাকে। কিন্তু এবার ব্যাংকগুলো নিজেরাই ডলার ছাড়তে আগ্রহী নয়।
এবার বাজারে ডলার বিক্রির প্রস্তুতি
বিজ্ঞাপন
গত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনলেও এখন পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কারণে ব্যাংকগুলো ডলার ধরে রাখছে।
এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বিনিময় হারে আরও চাপ তৈরি হতে পারে। সে কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনে বাজারে ডলার বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, অর্থনৈতিক যেকোনো অনিশ্চয়তার সুযোগ নিয়ে কিছু গোষ্ঠী অতিরিক্ত মুনাফা করতে চায়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে নানা গুজব ছড়িয়ে বাজারে আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের প্রতিটি দিক নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
বিজ্ঞাপন
রেমিট্যান্সে বড় স্বস্তি
ডলারের বাজারে সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে ডলারের সরবরাহও বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাসে দেশে এসেছে ৩ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স। এটি একক মাসে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়।
বিজ্ঞাপন
চলতি এপ্রিলের প্রথম সাত দিনে দেশে এসেছে আরও ৮২৩ মিলিয়ন ডলার। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যা প্রায় ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।
গত বছরের ১ থেকে ৭ এপ্রিল সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ৬৩৬ মিলিয়ন ডলার। সেই হিসাবে এবার প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২৭ দশমিক ০৩ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ২২ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে প্রবাসী আয় বেড়েছে প্রায় ২০ দশমিক ৬ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, রেমিট্যান্সের এই শক্তিশালী প্রবাহ ডলারের বাজারে চাপ অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে এবং টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন ঠেকাতে সহায়তা করছে।
রিজার্ভ এখনও স্বস্তিদায়ক
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩৪ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভের পরিমাণ প্রায় ২৯ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার।
গত মাসেই সরকার প্রায় ১ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলারের আকু বিল এবং আরও প্রায় ১৮ কোটি ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করেছে। এত বড় অঙ্কের দায় পরিশোধের পরও রিজার্ভ সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কেন ডলার বিক্রি করছে না ব্যাংকগুলো
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে ডলারের দর আরও বাড়তে পারে—এমন ধারণা থেকেই অনেক ব্যাংক ডলার বিক্রি না করে নিজেদের কাছে রেখে দিচ্ছে।
আরও পড়ুন: দেশে সোনা ও রুপার দামে বড় পতন, ভরি কত?
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাজারে যখন ধারণা তৈরি হয় যে বিনিময় হার বাড়তে পারে, তখন যাদের কাছে ডলার আছে তারা সহজে তা ছাড়তে চান না। ব্যাংকগুলোও ভবিষ্যৎ দায় ও বৈশ্বিক ঝুঁকি বিবেচনায় ডলার ধরে রাখছে।
ব্যাংকিং খাতের তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো তাদের নেট ওপেন পজিশন বাড়াচ্ছে। অর্থাৎ তারা ভবিষ্যতের কথা ভেবে আরও বেশি ডলার নিজেদের কাছে রাখছে।
তেলের দামও বাড়াচ্ছে চাপ
ডলারের বাজারে চাপ বাড়ার পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিও বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তেলের দাম বাড়লে আমদানির খরচও বেড়ে যায়। ফলে একই পরিমাণ পণ্য আমদানিতে আগের তুলনায় বেশি ডলার প্রয়োজন হয়।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, আমদানির পরিমাণ খুব বেশি না বাড়লেও ব্যয় বেড়ে গেছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় ডলারের চাহিদা বেড়েছে। পাশাপাশি অনেক রেমিট্যান্স হাউসও ভবিষ্যতে দাম আরও বাড়বে—এমন আশায় ডলার ধরে রাখছে।
সামনে কী হতে পারে
অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্স ও রিজার্ভের বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় বাংলাদেশে এখনই বড় ধরনের মুদ্রা সংকটের আশঙ্কা নেই। তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে কিংবা ব্যাংকগুলো ডলার মজুতের প্রবণতা বাড়ালে বাজারে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
সে কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন একদিকে যেমন বাজার পর্যবেক্ষণ করছে, অন্যদিকে প্রয়োজনে দ্রুত ডলার বিক্রির মাধ্যমে বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশলও প্রস্তুত রেখেছে।








