Logo

অস্ত্র ও বিলাসী গাড়িতে বাড়লেও কমছে নিত্যপণ্যে করের বোঝা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৪ মে, ২০২৬, ১৪:৪৯
অস্ত্র ও বিলাসী গাড়িতে বাড়লেও কমছে নিত্যপণ্যে করের বোঝা
ছবি : এআই দিয়ে তৈরি

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কিছুটা কমাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। একই সঙ্গে বিলাসবহুল জীবনযাপন নিরুৎসাহিত করতে আগ্নেয়াস্ত্র, দামি গাড়ি, জিপ, হেলিকপ্টার ও বিমানের ওপর কর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো ব্যাটারিচালিত রিকশাকে করের আওতায় আনার চিন্তাভাবনাও চলছে।

বিজ্ঞাপন

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, আটা, ময়দা, পেঁয়াজ ও বিভিন্ন ধরনের মসলার ওপর বর্তমানে থাকা ১ শতাংশ উৎস কর প্রত্যাহার এবং ১ শতাংশ টার্নওভার কর কমিয়ে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সরকারের ধারণা, এতে আমদানি ও সরবরাহ ব্যয় কমলে বাজারে কিছুটা হলেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

মূল্যস্ফীতির চাপে স্বস্তির খোঁজ

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। সীমিত আয়ের মানুষ ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। চাল, ডাল, চিনি, ভোজ্যতেল ও মসলার মতো দৈনন্দিন পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে উঠেছে অনেকের জন্য।

বিজ্ঞাপন

এই বাস্তবতায় সরকার করনীতিতে পরিবর্তন এনে ভোক্তা পর্যায়ে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার পথ খুঁজছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, কর কমানো হলে ব্যবসায়ীদের ব্যয় কিছুটা হ্রাস পাবে, যা খুচরা বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে শুধু কর ছাড় দিলেই বাজার নিয়ন্ত্রণে আসবে না বলে মনে করছেন তারা। কারণ পরিবহন ব্যয়, মজুতদারি, সিন্ডিকেট, আমদানিনির্ভরতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতার মতো বিষয়গুলোও পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে।

এ কারণে কর ছাড়ের সুবিধা যাতে সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পৌঁছায়, সেজন্য বাজার তদারকি আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

অস্ত্রের লাইসেন্স নবায়নে বাড়তি কর

অন্যদিকে, আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সধারীদের ওপর করের চাপ বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। বর্তমানে পিস্তল, রিভলভার বা শটগানের লাইসেন্স নবায়নে কোনো অগ্রিম আয়কর দিতে হয় না। তবে নতুন বাজেটে অস্ত্রের ধরন অনুযায়ী ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অগ্রিম আয়কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

বর্তমানে পিস্তল বা রিভলভারের লাইসেন্স নবায়ন ফি ২০ হাজার টাকা এবং শটগান বা রাইফেলের জন্য ১০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ১০ শতাংশ উৎসে কর। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে লাইসেন্স নবায়নের খরচ আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।

বিজ্ঞাপন

এছাড়া ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিকভাবে আমদানি করা অস্ত্রের ওপর বর্তমানে ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক রয়েছে। এর সঙ্গে সম্পূরক শুল্ক ও অগ্রিম আয়কর যুক্ত হওয়ায় অস্ত্র আমদানিতে বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায় হয় সরকারের।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স রয়েছে প্রায় ৫৩ হাজার ৭০২টি। এর মধ্যে ব্যক্তি পর্যায়ে রয়েছে ৪৮ হাজার ২৮৩টি লাইসেন্স। বাকি লাইসেন্স বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের নামে ইস্যু করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন কর কাঠামো বাস্তবায়িত হলে শুধুমাত্র লাইসেন্স নবায়ন থেকেই বছরে ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে। নতুন লাইসেন্স ফি ও অন্যান্য কর যোগ হলে এ অঙ্ক আরও বাড়বে।

বিজ্ঞাপন

আগেই বেড়েছে অস্ত্র লাইসেন্সের ফি

২০২৫ সালের নীতিমালায় আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ফি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছিল। ব্যক্তি পর্যায়ে পিস্তল ও রিভলভারের লাইসেন্স ইস্যু ফি ৩০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০ হাজার টাকা করা হয়। নবায়ন ফি ১০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয় ২০ হাজার টাকা। একইভাবে রাইফেল ও শটগানের লাইসেন্স ইস্যু ফি ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা এবং নবায়ন ফি ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়।

এছাড়া অস্ত্র ব্যবসায়ী ও মেরামতকারীদের লাইসেন্স ফিও দ্বিগুণ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সরকার অস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রেও উচ্চ আয়ের শর্ত আরোপ করেছে। বর্তমানে পিস্তল বা রিভলভারের আবেদনকারীদের গত তিন বছরে বছরে কমপক্ষে ৫ লাখ টাকা আয়কর দেওয়ার প্রমাণ দেখাতে হয়। আগে এই সীমা ছিল ৩ লাখ টাকা। শটগানের ক্ষেত্রে ন্যূনতম আয়কর সীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে।

বিলাসবহুল গাড়ি ও উড়োজাহাজেও বাড়তি কর

বাজেটে বিলাসবহুল জীবনযাপনের ওপর কর বাড়ানোর অংশ হিসেবে দামি প্রাইভেটকার, জিপ, হেলিকপ্টার ও বিমানের ওপর অতিরিক্ত আয়কর আরোপের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব হলেও উচ্চমূল্যের বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রেও অগ্রিম আয়কর বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তবে মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য গাড়ি কেনা যেন আরও কঠিন হয়ে না পড়ে, সে কারণে সাধারণ সিসিভিত্তিক কর কাঠামো অপরিবর্তিত রাখার চিন্তা করছে সরকার।

ব্যাটারিচালিত রিকশা আসছে করের আওতায়

বিজ্ঞাপন

প্রথমবারের মতো ব্যাটারিচালিত রিকশাকে আনুষ্ঠানিকভাবে কর ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বছরে ৫ হাজার টাকা এবং পৌরসভা এলাকায় ২ হাজার টাকা কর নির্ধারণ করা হতে পারে।

তবে এই খাতকে নিয়মের মধ্যে আনা এবং কার্যকরভাবে কর আদায় করাই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কারণ বর্তমানে ব্যাটারিচালিত রিকশার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বা নিবন্ধন ব্যবস্থা নেই।

এ বিষয়ে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সরকারের লক্ষ্য সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়া এবং উচ্চবিত্ত ও বিলাসী খাতে করের চাপ বাড়ানো। একই সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশাকে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে এ খাতেও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা যায়।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD