রাষ্ট্রায়ত্ত ৫০ পাট-বস্ত্রকলের ৪১টিতেই ঘুরছে না চাকা

একসময় দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে রাষ্ট্রায়ত্ত পাট ও বস্ত্রকল ঘিরে ছিল কর্মচাঞ্চল্য ও অর্থনৈতিক প্রাণচাঞ্চল্য। হাজারো শ্রমিকের পদচারণায় মুখর থাকা সেই কারখানাগুলোর অধিকাংশই এখন পরিত্যক্ত ও অচল।
বিজ্ঞাপন
দীর্ঘদিন ধরে লোকসানের বোঝা বহন করতে না পেরে সরকার ধাপে ধাপে এসব মিলের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। ফলে শত শত একর জমি, অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি পড়ে থাকে ব্যবহারহীন অবস্থায়। পরে এসব প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে ইজারা দিয়ে পুনরায় উৎপাদনে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও অগ্রগতি খুবই সীমিত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি) ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন (বিটিএমসি)-এর অধীনে মোট ৫০টি মিল রয়েছে। এর মধ্যে ২৫টি পাটকল এবং ২৫টি বস্ত্রকল। দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকা এসব মিলের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৯টিতে উৎপাদন কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হয়েছে। যদিও আরও কয়েকটি মিল ইজারা দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলো এখনো উৎপাদনে ফিরতে পারেনি।
সরকারি পর্যায়ে মিল ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় প্রায় এক যুগ আগে। ২০১৪ সালে বস্ত্রকল এবং ২০২০ সালে পাটকল বেসরকারি খাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কিছু মিল ইজারা দেওয়া হলেও কার্যকর অগ্রগতি ছিল ধীরগতির। পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত উদ্যোগ নিলেও কাঙ্ক্ষিত ফল মেলেনি। বর্তমানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ জোরদার করেছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন: দেশের বাজারে ফের কমল সোনার দাম, ভরি কত?
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, শুরুতে ৩৫টি মিল বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এর মধ্যে ১৮টি মিল ইতোমধ্যে ইজারা দেওয়া হয়েছে। তবে উৎপাদনে ফিরেছে মাত্র ৯টি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে ইজারা নেওয়া তিনটি প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে অপারগতা প্রকাশ করায় সংশ্লিষ্ট চুক্তিও বাতিল করা হয়েছে।
সম্প্রতি বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম জানিয়েছেন, বন্ধ থাকা সব পাট ও বস্ত্রকল ধাপে ধাপে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তিনি বলেন, বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের মাধ্যমে এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবিত করার কাজ চলছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি মিলের ইজারার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং মূল্যায়ন কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বিজেএমসির আওতাধীন ২৫টি পাটকলের মধ্যে ২০টি ইজারার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১৪টি মিল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে সচল হয়েছে মাত্র ৭টি। বাকি মিলগুলো চালুর প্রক্রিয়ায় থাকলেও নানা প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতায় উৎপাদন শুরু করা যায়নি।
ইজারার অপেক্ষায় থাকা আরও ছয়টি মিলের জন্য বিজ্ঞপ্তি ও মূল্যায়ন চলছে। অন্যদিকে, পাঁচটি মিলের মধ্যে খুলনা অঞ্চলের দুটি কারখানাকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া কিছু মিল আদালতের মামলার কারণে এখনো ইজারা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
চালু হওয়া সাতটি পাটকলের মধ্যে চারটিতে পাটজাত পণ্য উৎপাদন হচ্ছে। বাকি তিনটিতে তৈরি হচ্ছে সোয়েটার, জুতা, ছাতা, তাঁবু ও স্পেয়ার পার্টস। এসব কারখানায় বর্তমানে প্রায় ৯ হাজার ৫২০ জন শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করছেন।
বিজ্ঞাপন
পাটপণ্য উৎপাদনকারী চারটি কারখানায় প্রতিদিন প্রায় ১৬০ টন পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে বলে জানা গেছে। এসব পণ্য রপ্তানি করে বছরে প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ মিলিয়ন ডলার আয় হচ্ছে। উৎপাদন চালানো প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে জুট অ্যালায়েন্স লিমিটেড, আকিজ জুট, রিগাল জুট লিমিটেড এবং আটলান্টিক জুট লিমিটেড।
অন্যদিকে, ইউএমসি জুট মিলকে পোশাক কারখানায় রূপান্তর করেছে বেস্ট সোয়েটার লিমিটেড। সেখানে পরীক্ষামূলকভাবে সোয়েটার উৎপাদন শুরু হয়েছে এবং প্রায় ৩০০ শ্রমিক কাজ করছেন।
রাজশাহী জুট মিল ইজারা নিয়ে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বঙ্গ বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস লিমিটেড জুতা, ছাতা ও তাঁবু উৎপাদন করছে। সেখানে প্রায় এক হাজার ৩০০ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। প্রতিদিন কয়েক হাজার জোড়া জুতা ও বিভিন্ন পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
এছাড়া গালফ্রা হাবিব লিমিটেডের ইজারা নেওয়া একটি মিলে পরীক্ষামূলকভাবে স্পেয়ার পার্টস উৎপাদন করছে শফি মোটরস লিমিটেড।
বিজেএমসির মুখ্য পরিচালন কর্মকর্তা মামনুর রশিদ জানিয়েছেন, ইজারা নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারখানা আধুনিকায়ন ও যন্ত্রপাতি স্থাপনের জন্য ৩০ মাস সময় দেওয়া হয়েছে। যেসব মিল চালু হয়েছে, সেগুলো ইতোমধ্যে কর্মসংস্থান ও রপ্তানিতে ইতিবাচক অবদান রাখতে শুরু করেছে।
বিজ্ঞাপন
বিটিএমসির ২৫টি বস্ত্রকলের মধ্যে বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় মাত্র দুটি মিল উৎপাদনে রয়েছে। এগুলো হলো আহমেদ বাওয়ানী টেক্সটাইল মিলস এবং রাজশাহী টেক্সটাইল মিলস।
এছাড়া ভালিকা উলেন মিলস ও সিলেট টেক্সটাইল মিলস বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হলেও এখনো উৎপাদন শুরু হয়নি।
আহমেদ বাওয়ানী টেক্সটাইল মিল পরিচালনা করছে তাঞ্জিনা ফ্যাশন। প্রতিষ্ঠানটি সেখানে প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী নিয়ে রপ্তানিমুখী ডেনিম জিন্স ও সোয়েটার উৎপাদন করছে। অন্যদিকে, রাজশাহী টেক্সটাইল মিল পরিচালনা করছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। সেখানে প্রায় দুই হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং ট্রলি ব্যাগ ও চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ জানিয়েছে, রাজশাহী টেক্সটাইল মিলকে পরিবেশবান্ধব শিল্প পার্কে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে উৎপাদিত সব পণ্য হবে রপ্তানিমুখী। পাশাপাশি নারীদের কর্মসংস্থান বাড়াতে টেলিমার্কেটিংসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ চললেও বাস্তব অগ্রগতি এখনো সীমিত। অধিকাংশ কারখানাই এখনো উৎপাদনের বাইরে থাকায় সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে প্রত্যাশিত গতি ফেরেনি।








