Logo

ফিড ও বাচ্চার দামে অস্থিরতা, সংকটে দেশের পোলট্রি খাত

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৬ মে, ২০২৬, ১৮:২৮
ফিড ও বাচ্চার দামে অস্থিরতা, সংকটে দেশের পোলট্রি খাত
ছবি: সংগৃহীত

ফিডের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, এক দিনের বাচ্চার বাজারে অস্বাভাবিক দামের ওঠানামা, সিন্ডিকেটের প্রভাব এবং বাজারে দুর্বল নজরদারির কারণে দেশের পোলট্রি খাত গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়তে থাকায় ছোট ও মাঝারি খামারিরা টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন। অনেকে ইতোমধ্যে খামার বন্ধ করে দিয়েছেন। এর প্রভাব পড়ছে ডিম ও মুরগির বাজারেও, যেখানে ক্রমেই বাড়ছে মূল্য অস্থিরতা।

বিজ্ঞাপন

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কারণ দেখিয়ে সম্প্রতি সব ধরনের পোলট্রি ফিডের দাম আবারও বাড়ানো হয়েছে। একই সময়ে এক দিনের বাচ্চার বাজারেও অস্বাভাবিক মূল্য ওঠানামা করছে। কখনো বাচ্চার কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

খামারিদের অভিযোগ, উৎপাদন খরচ বাড়লেও তারা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। মধ্যস্বত্বভোগী ও বাজার নিয়ন্ত্রণকারী একটি চক্রের কারণে খামার পর্যায়ের দাম এবং ভোক্তা পর্যায়ের দামের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে হিমাগারে ডিম মজুতের প্রবণতাও বাজার অস্থিরতার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার সোল্লা ইউনিয়নের আওনা বাজার এলাকার খামারি মিরাজুল হাসান ভূঁইয়া জানান, দীর্ঘদিন লোকসানের কারণে তিনি তার ‘অরগানিক এগ্রো’ খামারের পাঁচটি শেড বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার ডিম উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও এখন পুরো খামার বন্ধ অবস্থায় রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, বাজারে ডিমের দাম বাড়লেও খামার পর্যায়ে উৎপাদন খরচের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের কোনো সমন্বয় নেই। প্রতি ডিমে লোকসান গুনতে হচ্ছে। তার মতে, সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে বাজার পরিচালিত হওয়ায় খামারিরা স্বাধীনভাবে পণ্য বিক্রি করতে পারছেন না।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন তরুণ উদ্যোক্তা কাওসার আহমেদ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ ও গাজীপুরের কালিয়াকৈরে তার মোট ১৮টি শেড ছিল। কিন্তু ফিডের বাড়তি দাম ও বাচ্চার বাজারের অস্থিরতায় তিনি বেশিরভাগ শেড বন্ধ করে দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ২০০৬ সাল থেকে খামার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এখন আর ব্যয় সামলানো সম্ভব হচ্ছে না। ফিড, বাচ্চা ও বাজার ব্যবস্থাপনার চাপ একসঙ্গে মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

একসময় নিম্ন ও মধ্যবিত্তের সহজলভ্য প্রোটিনের উৎস হিসেবে পরিচিত ব্রয়লার মুরগি ও ফার্মের ডিম এখন অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। রমজান ও ঈদের সময় মুরগির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। তখন সোনালি মুরগির দাম কেজিতে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত ওঠে এবং ব্রয়লার ২০০ টাকার বেশি দামে বিক্রি হয়।

বর্তমানে কিছুটা কমলেও বাজারে ব্রয়লার মুরগি ১৮০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে ডিমের দামও এক মাসের ব্যবধানে ডজনে ৩০ থেকে ৪০ টাকা বেড়ে ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকায় পৌঁছেছে। এতে নিম্ন আয়ের মানুষের পাশাপাশি মধ্যবিত্তরাও চাপে পড়েছেন।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সুমন হাওলাদার বলেন, ফিড ও বাচ্চার বাজার বর্তমানে একটি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। কখনো এক দিনের বাচ্চার দাম ৪৫ টাকা, আবার কখনো ৭৫ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত উঠছে। অনেক সময় বেশি দাম দিয়েও সাধারণ খামারিরা বাচ্চা পান না।

তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিদিন মোবাইল ফোনের বার্তার মাধ্যমে একটি চক্র ডিম, বাচ্চা ও মুরগির দাম নির্ধারণ করে দেয়। সেই দামে বাজার পরিচালিত হয়। পাশাপাশি হিমাগারে ডিম মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগও করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বাজারে বেশি দামে পণ্য বিক্রি হলেও তার সুফল খামারিরা পাচ্ছেন না। অতিরিক্ত হাতবদল ও বাজারে পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবে অনিয়ম বাড়ছে।

তার মতে, পোলট্রি খাতে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রভাব অনেক বেশি। একই প্রতিষ্ঠান ফিড ও বাচ্চা উৎপাদন করে আবার চুক্তিভিত্তিক খামার ব্যবস্থাও নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে স্বাধীন খামারিরা বেশি দামে উপকরণ কিনতে বাধ্য হন।

ফিড ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে ফিডের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। রাজধানীর ফুলবাড়িয়া এলাকার ব্যবসায়ীরা জানান, সম্প্রতি আবারও দাম বেড়েছে। বর্তমানে ৫০ কেজির ব্রয়লার গ্রোয়ার ফিডের বস্তা ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা পাঁচ বছর আগে ছিল প্রায় ১ হাজার ৬৫০ টাকা।

বিজ্ঞাপন

ফিড ব্যবসায়ী মো. শিহাব বলেন, শুধু ফিড নয়, সয়ামিল, ভুট্টা, গম, সরিষার খৈল, ক্যালসিয়াম ফসফেট, লাইম স্টোন ও ঝিনুক চূর্ণসহ প্রায় সব কাঁচামালের দাম বেড়েছে।

ফিড ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. আনোয়ারুল হক জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় দেশীয় বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। পাশাপাশি করের চাপও উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রিপন কুমার মণ্ডল মনে করেন, বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারের চাপ সামাল দিতে পারলেও ক্ষুদ্র খামারিরা দ্রুত ঝরে পড়ছেন।

তিনি বলেন, ফিডের কাঁচামাল আমদানিনির্ভর হওয়ায় এ খাতে কর ও শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় উদ্যোক্তা তৈরির জন্য সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন। ক্ষুদ্র খামারিদের টিকিয়ে রাখতে সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে কার্যকর মডেল গড়ে তোলারও পরামর্শ দেন তিনি।

এক দিনের বাচ্চার বাজার নিয়ন্ত্রণে আলাদা আইন বা ‘হ্যাচারি অ্যাক্ট’ প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, বর্তমানে কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান বাজার নিয়ন্ত্রণ করায় ছোট খামারিরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে দেশের পোলট্রি খাতে উৎপাদন আরও কমে যেতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রোটিনের জোগানে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD