Logo

রেকর্ড সাফল্যে আঞ্চলিক হাবের পথে চট্টগ্রাম বন্দর

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৯ জুন, ২০২৬, ১৮:৩২
রেকর্ড সাফল্যে আঞ্চলিক হাবের পথে চট্টগ্রাম বন্দর
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলের অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট এবং আন্তর্জাতিক বন্দরগুলোতে অপারেশনাল চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ধারাবাহিক সাফল্যের নজির গড়েছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর। কনটেইনার হ্যান্ডলিং, কার্গো পরিবহন, জাহাজ পরিচালনা এবং রাজস্ব আয়ে নতুন নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করে বন্দরটি দেশের অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চলমান আধুনিকায়ন কার্যক্রম ও বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম বন্দর বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রান্সশিপমেন্ট হাবে পরিণত হতে পারে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ এক বছরে বন্দরের রাজস্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২৮৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, যা সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ অর্জনের অন্যতম। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা, ইয়ার্ড পরিচালনায় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং লজিস্টিক সমন্বয়ের উন্নয়ন এই সাফল্যের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বন্দর সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, কনটেইনার ও কার্গোর চাপ বাড়লেও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল কার্যক্রমের ফলে অপারেশনাল সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালে নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের কারণে জাহাজের অবস্থানকাল অনেক কমে এসেছে। কয়েকটি সময়ে জাহাজের গড় অপেক্ষার সময় প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসে, যা বন্দরের ইতিহাসে অন্যতম সেরা অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)-এর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের পর উৎপাদনশীলতা আরও বেড়েছে। চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড দায়িত্ব নেওয়ার পর কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে ইয়ার্ডের ধারণক্ষমতাও আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে।

কার্গো পরিবহনেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। বিশেষ করে বাল্ক কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে ১৩ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, যা শিল্প উৎপাদন ও আমদানি কার্যক্রমের সম্প্রসারণের ইঙ্গিত বহন করছে।

বিজ্ঞাপন

আর্থিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত সময়ে বন্দরের মোট আয় ছিল ৪ হাজার ৯৫২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। পরবর্তী অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার ৭৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে আয় প্রায় ২২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ায় একই সময়ে রাজস্ব উদ্বৃত্তও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কর, ভ্যাট ও অন্যান্য সরকারি দায় পরিশোধের পর নিট উদ্বৃত্ত হয়েছে ২ হাজার ২২৮ কোটি টাকা।

গত পাঁচ বছরের হিসাব বিশ্লেষণেও ধারাবাহিক অগ্রগতির চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৫ সালে বন্দরের রাজস্ব আয় ছিল ৫ হাজার ৪৬০ কোটি ১৮ লাখ টাকা এবং ব্যয় ছিল ২ হাজার ৩১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ওই বছর রাজস্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ৩ হাজার ১৪২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এর আগে ২০২৪ সালে উদ্বৃত্ত ছিল ২ হাজার ৯২৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা, ২০২৩ সালে ২ হাজার ১৪৩ কোটি ১১ লাখ, ২০২২ সালে ১ হাজার ৭৩৪ কোটি ২০ লাখ এবং ২০২১ সালে ১ হাজার ৬৩৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা।

বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলার কারণে গত দুই বছরে ব্যয় বৃদ্ধির হার এক অঙ্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে রাজস্ব আয় ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকায় আর্থিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সরকারি কোষাগারেও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে চট্টগ্রাম বন্দর। গত পাঁচ বছরে কর, ভ্যাট ও কর-বহির্ভূত আয় মিলিয়ে মোট ৭ হাজার ৫৮০ কোটি ২০ লাখ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বন্দরে ৩৪ লাখ ৯ হাজার ৬৯ টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১ লাখ ৩৩ হাজার ৪৪২ টিইইউস বেশি। প্রবৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ০৭ শতাংশ। এটিই বন্দরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের রেকর্ড।

বিজ্ঞাপন

একই বছরে মোট ১৩ কোটি ৮১ লাখ ৫১ হাজার ৮১২ মেট্রিক টন আমদানি-রপ্তানি কার্গো হ্যান্ডলিং করা হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১ কোটি ৪১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৯৮ মেট্রিক টন বেশি পণ্য পরিবহন হয়েছে, যা দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণের প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জাহাজ পরিচালনার ক্ষেত্রেও নতুন রেকর্ড গড়েছে বন্দরটি। ২০২৫ সালে মোট ৪ হাজার ২৭৩টি জাহাজ পরিচালিত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৪০৬টি বেশি। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির হার ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ।

ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। অনলাইন ই-মুট পাস, ই-পেমেন্ট এবং অনলাইন বিলিং ব্যবস্থা চালুর ফলে বন্দরের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও গতি বেড়েছে। ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর একদিনেই সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৭৬১টি ই-মুট পাস ইস্যুর মাধ্যমে নতুন রেকর্ড গড়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

বিজ্ঞাপন

নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হয়েছে বলে জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। ইউএস কোস্ট গার্ডের ইতিবাচক মূল্যায়নের পাশাপাশি ৭০ হাজার বর্গমিটার নতুন ইয়ার্ড নির্মাণ, আধুনিক হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং লজিস্টিক অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলমান রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর এবং প্রায় ১৩ হাজার ৫২৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন বে-টার্মিনাল প্রকল্প সম্পন্ন হলে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। তখন এটি শুধু বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবেই নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।

বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, সমন্বিত ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই এই সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে। জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড সময় কমানো, বার্থ ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার সম্প্রসারণ বন্দরের সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দেশের রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের সম্প্রসারণ বন্দরের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করেছে। বন্দর, কাস্টমস, শিপিং এজেন্ট, টার্মিনাল অপারেটর এবং পরিবহন সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগে চট্টগ্রাম বন্দর দক্ষতা ও সেবার মানে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।

অর্থনীতি ও বন্দর বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং চলমান অবকাঠামো প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ করা গেলে চট্টগ্রাম বন্দর ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে এবং আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD