Logo

মধ্যবিত্তদের জন্য সুখবর, করমুক্ত আয়সীমা হচ্ছে ৪ লাখ টাকা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৯ জুন, ২০২৬, ১৪:৫৯
মধ্যবিত্তদের জন্য সুখবর, করমুক্ত আয়সীমা হচ্ছে ৪ লাখ টাকা
ছবি: সংগৃহীত

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট চূড়ান্ত হওয়ার আগে কর ও শুল্ক কাঠামোয় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

বিজ্ঞাপন

ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আনা, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, মূল্যস্ফীতির প্রভাব কিছুটা কমানো এবং করব্যবস্থাকে আরও বাস্তবসম্মত করতে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, করপোরেট কর কমানো, বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের করহার হ্রাস, ব্যাংক হিসাব খুলতে ই-টিআইএনের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য প্রস্তাবিত একক ভ্যাট স্থগিতসহ বেশ কয়েকটি পরিবর্তনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অর্থবিল পাসের মাধ্যমে এসব সংশোধনী কার্যকর করা হতে পারে। সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে অর্থবিল পাস হওয়ার কথা রয়েছে।

করমুক্ত আয়সীমা বাড়ছে

বিজ্ঞাপন

সাধারণ করদাতাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের একটি হচ্ছে করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি। প্রাথমিক বাজেট প্রস্তাবে এ সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা অপরিবর্তিত রাখার কথা থাকলেও বিভিন্ন মহলের মতামত ও সমালোচনার পর তা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এতে করদাতারা আগের প্রস্তাবের তুলনায় অতিরিক্ত ২৫ হাজার টাকা নয়, বরং কার্যত আরও ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সুযোগ পাবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এনবিআরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বছরগুলোতেও ধাপে ধাপে এই সীমা আরও বাড়ানো হতে পারে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় ২০২৭-২৮ এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৪ লাখ টাকা এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।

তবে করমুক্ত আয়সীমা বাড়লেও করদাতাদের প্রকৃত করের বোঝা খুব বেশি কমবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ বিভিন্ন কর রেয়াত কমানোর পাশাপাশি সঞ্চয়পত্র, স্থায়ী আমানত (এফডিআর) ও সরকারি সিকিউরিটিজের সুদের ওপর কাটা উৎসে করকে আগের মতো চূড়ান্ত কর না ধরে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করার বিধান বহাল রাখা হচ্ছে।

করপোরেট কর কমানোর উদ্যোগ

বিজ্ঞাপন

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনতে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী কোম্পানিগুলোর জন্য আগামী পাঁচ অর্থবছরের জন্য করপোরেট কর আড়াই শতাংশ পর্যন্ত কমানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সাধারণ করহার ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। যেসব কোম্পানি পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার বাজারে ছাড়ে এবং ক্যাশলেস লেনদেনসহ নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে, তারা বর্তমানে ২০ শতাংশ কর সুবিধা পেয়ে থাকে।

নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, যেসব তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের বাজারে ছাড়কৃত শেয়ারের পরিমাণ ১০ শতাংশের কম, তাদের করহার ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ করা হতে পারে। তবে অন্যান্য করপোরেট করহার আপাতত অপরিবর্তিত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এনবিআরের এক কর্মকর্তা জানান, এসব সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য কেবল কর ছাড় দেওয়া নয়; বরং নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদে কর-জিডিপি অনুপাত উন্নত করা।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর কমতে পারে

উচ্চশিক্ষা খাতেও কর সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ, প্রকৌশল কলেজ এবং তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর ১০ শতাংশ আয়কর আরোপিত রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

চূড়ান্ত বাজেটে এই হার কমিয়ে ৫ শতাংশ করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। সরকারের ধারণা, কর কমানো হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অবকাঠামো উন্নয়ন, গবেষণা, ল্যাবরেটরি ও গ্রন্থাগারের মানোন্নয়নে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে পারবে।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অনুমোদিত ১১৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১০৩টি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এছাড়া দেশে ৬৬টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, ২৬টি ডেন্টাল কলেজ এবং ২০টি প্রকৌশল কলেজ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির পরিচালক বেলাল আহমেদ বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অবকাঠামো, প্রযুক্তি, গবেষণাগার, লাইব্রেরি এবং অন্যান্য সেবার জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কর ও ভ্যাট পরিশোধ করতে হয়। এর সঙ্গে আয়কর বহাল থাকলে উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ওপরও অতিরিক্ত আর্থিক চাপ পড়ে। তাই তিনি আয়কর পুরোপুরি প্রত্যাহারের দাবি জানান।

স্বর্ণ বিক্রিতে কর পুনর্বিবেচনা

বাজেটে স্বর্ণ বিক্রির ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ মূলধনি মুনাফা করও পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্যবসায়ী ও করদাতাদের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে এ হার কমিয়ে ৫ শতাংশ করার বিষয়ে আলোচনা চলছে।

বিজ্ঞাপন

এনবিআরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কিছু করদাতা অঘোষিত সম্পদ বৈধ করার উদ্দেশ্যে কর নথিতে অবাস্তব পরিমাণ স্বর্ণ প্রদর্শন করেন এবং পরে তা বিক্রির আয় হিসেবে দেখান। এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে মূলধনি মুনাফার ওপর কর আরোপের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য স্বস্তি

প্রস্তাবিত বাজেটে মুদি দোকান, প্রসাধনীর দোকান, মিষ্টির দোকান, রেস্তোরাঁসহ ১৬টি খুচরা ও সেবাখাতে নির্দিষ্ট হারে মাসিক ভ্যাট আরোপের পরিকল্পনা ছিল। বছরে বিক্রির পরিমাণ ৫০ লাখ টাকার কম হলেও ব্যবসায়ীদের মাসে এক হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভ্যাট দিতে হতো।

বিজ্ঞাপন

তবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর আপত্তির মুখে সরকার আপাতত এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন থেকে সরে আসছে। এনবিআর জানিয়েছে, এ বিষয়ে এখনই কোনো বিধিমালা জারি করা হচ্ছে না। ফলে বাজেট পাস হলেও এই ব্যবস্থা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে না।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, এ ধরনের ভ্যাট আরোপ করা হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ছোট ব্যবসায়ীরা। তাঁর মতে, দেশের মোট ভ্যাটের বড় অংশই অল্পসংখ্যক বড় প্রতিষ্ঠান পরিশোধ করে। তাই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর নতুন করের চাপ সৃষ্টি না করে রাজস্ব ব্যবস্থার অন্য দুর্বলতা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

বিজ্ঞাপন

শেয়ারবাজারেও পরিবর্তন

শেয়ারবাজারের স্বার্থ বিবেচনায় সরকার প্রস্তাবিত আরও একটি সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। প্রাথমিক বাজেটে কোম্পানির লভ্যাংশ আয়ের ওপর নিয়মিত করপোরেট করহার আরোপের প্রস্তাব থাকলেও চূড়ান্ত বাজেটে আগের মতো ২০ শতাংশ করহার বহাল রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

একই সঙ্গে অর্থবিলে অন্তর্ভুক্ত ‘স্বতঃপ্রণোদিত বিনিয়োগ প্রদর্শন’ নামে জমি ও ফ্ল্যাটের প্রকৃত মূল্য বিনা প্রশ্নে প্রদর্শনের বিশেষ সুবিধাও বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, বাজেটের সামগ্রিক আকার কিংবা সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যে কোনো পরিবর্তন আনা হচ্ছে না। তবে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, ব্যবসায়ীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং করব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও বাস্তবমুখী করতেই বাজেট পাসের আগে এসব সংশোধনী অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD