চীন-ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি, সুযোগে লাভবান হতে পারে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো চীন ও ভারতের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দুই অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারিত হলেও আমদানিনির্ভরতার কারণে প্রতিবছর ঘাটতির পরিমাণ বাড়ছে।
বিজ্ঞাপন
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, পরিকল্পিত নীতি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো গেলে এই ঘাটতিই ভবিষ্যতে দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ১৭ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে ভারতের সঙ্গে ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৭ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার। ফলে দুই দেশের সঙ্গে মোট বাণিজ্য ঘাটতি ২৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ভারসাম্যে বড় প্রভাব ফেলছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিকে শুধু নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখলে চলবে না। বরং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, যৌথ উদ্যোগ এবং নতুন বাজার তৈরির মাধ্যমে এ পরিস্থিতিকে দেশের জন্য ইতিবাচক অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপ দেওয়া সম্ভব।
বিজ্ঞাপন
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড)-এর চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, শুধু শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলেই কোনো দেশের বাজারে রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে না। চীনের বাজারে সফল হতে হলে সেখানকার ভোক্তার চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি বাজারব্যবস্থা, সরবরাহ চেইন এবং বিতরণ নেটওয়ার্কের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত হতে হবে।
তার মতে, চীনের বড় খুচরা বিক্রয় নেটওয়ার্ক ও সোর্সিং ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের সংযোগ তৈরি না হলে দেশটির বিশাল বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করা কঠিন হবে। এজন্য চীনা কোম্পানির সঙ্গে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগ বা জয়েন্ট ভেঞ্চার গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
ড. রাজ্জাক আরও বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) দীর্ঘমেয়াদে শুল্ক সুবিধা ধরে রাখা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া এমন চুক্তি বাস্তবায়ন করলে দেশীয় শিল্প ও সরকারের রাজস্ব আয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
তিনি চীনের বাজারের জন্য সম্ভাবনাময় পণ্য নির্বাচন, আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা এবং দেশটির বড় শহরগুলোতে বাংলাদেশি পণ্যের স্থায়ী বাণিজ্যিক উপস্থিতি গড়ে তোলার পরামর্শ দেন।
চীনের বাজারে সুযোগ থাকলেও ব্যবহার সীমিত
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশি পণ্যের জন্য ২০২০ সালে ৯৭ শতাংশ এবং পরে ২০২৪ সালে প্রায় সব পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেয় চীন। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে এটি ছিল বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ। কিন্তু বাস্তবে এই সুবিধার পূর্ণ ব্যবহার এখনও সম্ভব হয়নি।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ ছিল মাত্র ৭৪২ মিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে একই সময়ে চীন থেকে আমদানির পরিমাণ ১৮ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। অর্থাৎ চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান আমদানি উৎস হলেও রপ্তানি বাজার হিসেবে এখনও কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অন্যতম কারণ বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামো। দেশের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। অথচ চীন নিজেই বিশ্বের বৃহত্তম পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ। ফলে প্রচলিত পণ্য দিয়ে সেখানে বড় ধরনের বাজার দখল করা কঠিন।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিআই) সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বার্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি দেশের জন্য বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হলেও শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধার পূর্ণ ব্যবহার এখনও সম্ভব হয়নি।
আরও পড়ুন: দেশের বাজারে আবারও বাড়ল স্বর্ণের দাম
তার মতে, চীনের বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশি পণ্যের স্থায়ী প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন, কারিগরি শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং যৌথ বিনিয়োগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে রপ্তানি আয় বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, শুধু নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে চীনা পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমানো সহজ হবে না। কারণ বিকল্প বাজারের তুলনায় চীনা পণ্য গড়ে প্রায় ২৮ শতাংশ কম দামে পাওয়া যায়। ফলে মূল্য প্রতিযোগিতায় চীন এখনও বাংলাদেশের শিল্প উদ্যোক্তাদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় সরবরাহকারী দেশ।
ভারতের সঙ্গেও বড় ঘাটতি
প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে পরিবহন ব্যয় তুলনামূলক কম এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগও সহজ হওয়ার কথা। ভারত ২০১১ সালেই প্রায় সব বাংলাদেশি পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধা চালু করে। তারপরও প্রত্যাশিত হারে রপ্তানি বাড়েনি।
বিজ্ঞাপন
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশ প্রায় ৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। বিপরীতে রপ্তানির পরিমাণ ছিল মাত্র ১ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, ভারতের বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা এখনও যথেষ্ট রয়েছে। তৈরি পোশাক, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ওষুধ, পাট ও পাটজাত পণ্য, সিরামিক, প্লাস্টিক এবং হালকা প্রকৌশল পণ্যের চাহিদা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কিছু বাংলাদেশি পণ্যের স্থলবন্দরভিত্তিক রপ্তানিতে ভারতের বিধিনিষেধ নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
কেন বাড়ছে বাণিজ্য ঘাটতি
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের শিল্প উৎপাদন ব্যাপকভাবে আমদানিকৃত কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভরশীল। তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহৃত সুতা, কাপড়, রাসায়নিক, যন্ত্রাংশ, শিল্প উপকরণ এবং মূলধনি যন্ত্রপাতির বড় অংশ আসে চীন ও ভারত থেকে।
অন্যদিকে দেশের রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য সীমিত থাকায় আমদানি দ্রুত বাড়লেও রপ্তানি একই গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে না। ফলে বাণিজ্য ঘাটতিও ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।
সব ঘাটতিই কি নেতিবাচক?
বিজ্ঞাপন
অর্থনীতিবিদদের মতে, সব ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর নয়। যদি আমদানিকৃত পণ্য উৎপাদন, শিল্পায়ন ও রপ্তানিমুখী খাতে ব্যবহৃত হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে।
বাংলাদেশ বর্তমানে চীন ও ভারত থেকে যে বিপুল পরিমাণ যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও শিল্প কাঁচামাল আমদানি করছে, তার বড় অংশ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার হচ্ছে। তাই মূল চ্যালেঞ্জ হলো এসব আমদানিকে কীভাবে আরও বেশি রপ্তানি, বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণে কাজে লাগানো যায়।
কীভাবে সুযোগে বদলানো সম্ভব
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রথমত, চীন ও ভারত থেকে আরও বেশি প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ করতে হবে। বিশেষ করে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো কার্যকরভাবে পরিচালনা করা গেলে উৎপাদন খাতে নতুন বিনিয়োগ আসতে পারে।
দ্বিতীয়ত, যৌথ উদ্যোগে শিল্প স্থাপন বাড়াতে হবে। এতে শুধু পুঁজি নয়, প্রযুক্তি, ব্র্যান্ডিং, বাজার-জ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক বিতরণ নেটওয়ার্কও পাওয়া সম্ভব হবে।
তৃতীয়ত, পোশাক খাতের বাইরে কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, প্লাস্টিক, সিরামিক, হালকা প্রকৌশল, পাটজাত পণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, সফটওয়্যার, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল এবং ইলেকট্রনিকস খাতে রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
চতুর্থত, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে লক্ষ্য করা যেতে পারে। ভৌগোলিক নৈকট্য এবং কম পরিবহন ব্যয়ের কারণে এসব অঞ্চলে বাংলাদেশি খাদ্যপণ্য, কৃষিপণ্য ও ভোগ্যপণ্যের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।
এছাড়া এলডিসি উত্তরণের পর শুল্ক সুবিধা ধরে রাখতে চীন, ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে কৌশলগত প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, দ্রুত কাস্টমস সেবা, স্থিতিশীল করনীতি, সহজ মুনাফা প্রত্যাবাসন এবং কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস নিশ্চিত করার ওপরও জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য, চীন বা ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি পুরোপুরি দূর করা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ এই দুই দেশই বাংলাদেশের শিল্পায়নের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল ও প্রযুক্তির প্রধান উৎস। তবে সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর নীতির মাধ্যমে একই বাণিজ্যিক সম্পর্ককে বিনিয়োগ, উৎপাদন এবং রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগে রূপান্তর করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে বর্তমানের বড় বাণিজ্য ঘাটতিই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান তৈরির ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।








