খেলাপি ঋণে বিশ্বে দ্বিতীয়, সার্কে শীর্ষে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে বেড়ে বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের পরই খেলাপি ঋণের হারে বাংলাদেশের অবস্থান। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক)-ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যেও সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের হার এখন বাংলাদেশের।
বিজ্ঞাপন
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিস্থিতি দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা।
সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমানোর কৌশল নিয়ে আয়োজিত একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালায় এ তথ্য তুলে ধরা হয়। অর্থ বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবস্থা, খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি এবং তা কমানোর বিভিন্ন উপায় নিয়ে আলোচনা হয়।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
উপস্থাপিত বৈশ্বিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের হার রয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনে। দেশটির ব্যাংক খাতে মোট ঋণের ৩৭ দশমিক ৩৫ শতাংশই খেলাপি। দীর্ঘদিন ধরে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, যার প্রতিফলন এই পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে।
এই তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। দেশের ব্যাংক খাতে মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ বর্তমানে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তালিকায় বাংলাদেশের পর রয়েছে চাদ, যেখানে খেলাপি ঋণের হার ৩১ দশমিক ৫১ শতাংশ। এরপর গিনিতে এ হার ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই তিন মাসেই দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩১ হাজার কোটি টাকার বেশি বেড়েছে। ফলে মার্চ প্রান্তিক শেষে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড ৫ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই অঙ্ক দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের সমান।
আঞ্চলিক তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও উদ্বেগজনক। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি। যেখানে বাংলাদেশে এই হার ৩২ শতাংশের বেশি, সেখানে ভারতের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ।
অন্যদিকে ভুটানে খেলাপি ঋণের হার ৪ দশমিক ৫ শতাংশ, মালদ্বীপে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ, নেপালে প্রায় ৫ দশমিক ৮ শতাংশ, পাকিস্তানেও প্রায় ৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং দীর্ঘ অর্থনৈতিক সংকটে থাকা শ্রীলঙ্কায় খেলাপি ঋণের হার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশের হার কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় বিষয়টি বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাপি ঋণের এই উচ্চ হার দেশের ঋণ ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক শৃঙ্খলার অবনতির স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। তারা মনে করেন, বছরের পর বছর ধরে অনিয়ম, দুর্বল তদারকি এবং যথাযথ জবাবদিহির অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে নিয়মবহির্ভূতভাবে ঋণ অনুমোদন, বেনামি প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট পক্ষকে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারির দুর্বলতা এবং ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার সংস্কৃতি খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ।
তাদের মতে, শুধু নতুন ঋণ বিতরণে কঠোর নীতিমালা গ্রহণ করলেই হবে না, বরং পুরোনো খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর উদ্যোগ, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি। অন্যথায় খেলাপি ঋণের চাপ দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের অভিমত, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা, দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়া, ঋণ পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ এবং ব্যাংক পরিচালনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং আর্থিক খাতকে আরও স্থিতিশীল করা সম্ভব হবে।








